দীনু আসবে কী করে? দীনু তো আর আসবে না। দীনুর শরীর এসেছে। ধবধবে সাদা একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। পেছনের দরজা খোলা। বরফের চাঙড়ার ওপর সাদা চাদর ঢাকা মৃতদেহ। ফিনফিনে নীল কুয়াশায় মৃত্যুর প্রেয়সী-আলিঙ্গন।
১.২৭ আমার যেমন বেণী তেমনি রবে
ভীষণ মেঘ করেছে। দুপুরে রাত নেমেছে। প্রকৃতি থমকে আছে। বৃষ্টি এল বলে। ঝক ঝক চিল উড়ছে মন্দিরের মাথায়। সারা আকাশ ছেয়ে গেছে। দিগন্তের এক হাত ওপরে কালো মেঘের পুরু। রুটি ভাসছে। বছরের প্রথম বড় ধরনের বৃষ্টি আসছে খুব তোড়জোড় করে। একটা চাতক করুণ। সুরে ডাকছে– জল দাও, জল দাও।
এমন দিনে একটা কাজই করা চলে, বেশ আয়েশ করে শুয়ে শুয়ে বই পড়া। সুখেন নেই যে জ্বালাতে আসবে। দীনু চিরকালের জন্য চলে গেছে। দীনুর পিতা বিলেত থেকে ফিরে এসেছেন। দীনুর সেই খুনি মোটরসাইকেলটার কিচ্ছু হয়নি। আরোহীকে ছিটকে ফেলে দিয়ে যন্ত্রদানব এখন বেশ বহাল তবিয়তে গ্যারেজের একপাশে দু’পা ফেলে পঁড়িয়ে আছে।
মানুষ কত কী যে রটাতে পারে! আজকাল মাঝরাতে একটা মোটরসাইকেলের আওয়াজ পাওয়া যায়। হয়তো থানার অফিসার ইনচার্জ রোদে বেরোন। বেরোতেই পারেন। সেইটাই স্বাভাবিক। বিশেপাগলা মুদির দোকানের রকে শুয়ে থাকে। পাগলাদের কল্পনাশক্তি মনে হয় প্রবল। কেমন রটিয়ে দিয়েছে! লাল আগুনের মতো মোটরসাইকেল চেপে, জ্বলন্ত দীনু ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে যাচ্ছে নীল ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে। সোনার চামরের মতো মাথার চুল উড়ছে। টকটকে পেতলের মতো গায়ের রং। সে তোমরা না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবে না। আওয়াজ শুনে একদিন তাড়াতাড়ি উঠে জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলুম। দেখেছিলুম, তবে মোটরসাইকেল আরোহী দীনুকে নয়, একঝলক বাতাস চলে গেল ছেঁড়া কাগজ আর শালপাতা টানতে টানতে।
সকালে যা হয় একটা কিছু রাঁধলেই চলে। নীচে থেকে প্রফুল্ল কাকিমা একটা না একটা কিছু দিয়ে যান। পিতৃদেব স্পর্শ করেন না। বলেন স্বপাকই বেস্ট পাক। সবটা একলা আমাকেই সাবড়াতে হয়। রাধেন ভাল তবে ঝালের হাতটা একটু বেশি। আজ করেছিলেন নারকেল কোরা দিয়ে মোচার ঘন্ট। ছোলাটোলা ছিল। বেশ তরিবাদি ব্যাপার। ঝালের চোটে পেট এখনও জ্বলছে।
মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে কত কথাই মনে আসছে। মাতামহ অনেকদিন আসেননি। আজ। বিকেলের দিকে একবার খবর নিতে পারলে ভাল হত। আকাশের যা ঘনঘটা আয়োজন, বিকেলের দিকে মেঘমল্লার জলসা শুরু হবেই। মেঘের পাখোয়াজ শুরু হয়ে গেছে।
কনকটা আচ্ছা ঘোটলোক। না, কনকের আর দোষ কী! মেসোমশাই যেমন চালাবেন, তেমনই তো চলবে। মেয়েরা হল গাড়ির মতো। চালক যেভাবে চালাবে, সেইভাবে, সেই দিকেই চলতে হবে। প্রতাপ রায় একজন মালদার লোক। ফকিরে কি আর সংসার করতে পারে! উপন্যাসেই প্রেমের জয়জয়কার। জীবনে শুধু লাভ-ক্ষতি, দেনা-পাওনা।
বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামল। ঘর অন্ধকার। আলো জ্বালতে পারলে ভাল হয়। পাতলা চাদর মুড়ি দিয়ে এবার দিবানিদ্রা। সামনের বাড়ির টিনের চালে বৃষ্টি নাচছে। দরজার বাইরে ক্ষীণ চুড়ির শব্দ। হল। কনক এল নাকি! কাকিমা দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
বাঃ বেশ মজা করে শুয়ে আছ! লেখাপড়া নেই?
থাকলেও করা যাবে না। বর্ষায় ঘুম।
কাকিমা ঘরে ঢুকে পড়লেন। বিছানার একপাশে বসে বললেন, আমার সব গুল ভিজে গেল।
তুলে ফেলুন।
তোলার উপায় নেই, একেবারে ভিজে।
বেশ বড় করে একটা হাই তুললেন। একে দুপুর, তায় বর্ষা। আলসে লেগেছে। বর্ষায় আমাদের নীচেটা যক্ষপুরীর মতো হয়ে ওঠে। অন্ধকার, ড্যাম্প, নোনা ধরা দেয়াল। ওপরে এসেছেন বেশ করেছেন, তবে খাটে না বসলেই পারতেন! বিছানায় বসা উচিত নয়। চেয়ার রয়েছে, সোফা রয়েছে। চক্ষুলজ্জায় কিছু বলতেও পারছি না।
পিন্টু, তোমার বাবার কাছে তো অনেক ওষুধ থাকে!
কী ওষুধ বলুন? হোমিওপ্যাথিক!
এই ধরো কেটেকুটে গেলে লাগাবার মতো কিছু।
হ্যাঁ আছে। দিচ্ছি দাঁড়ান। হাত কেটেছে বুঝি!
সেই উঠতে হল। শোবার উপায় কি ভগবান রেখেছেন! আয়োডিনের শিশিটা নিয়ে এলুম।
বলুন, কোথায় লাগাতে হবে?
কাকিমার ঠোঁটে লাজুক হাসি, তুমি একটু লাগিয়ে দেবে!
কেন দেব না।
কিছু মনে করবে না?
মনে করব কেন?
ধীরে ধীরে পিঠের আঁচল সরালেন। গায়ে যে জামা ছিল না, এতক্ষণ লক্ষ করিনি। মেয়েদের পিঠ, ফরসা ধবধবে। তেলা টানটান চামড়ার ওপর এপাশ থেকে ওপাশে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে গেছে একটা লাল দাগ। দেখলেই গা শিউরে ওঠে। চামড়া ফেটে দুফাঁক হয়ে গেছে।
ভয়ে, আতঙ্কে আর একটু হলেই হাত থেকে আয়োডিনের শিশি পড়ে যাচ্ছিল। কাকিমা সামনে ঝুঁকে বসে আছেন। এই ক্ষতের ওপর আয়োডিন পড়লে অসম্ভব জ্বলবে। সে জ্বালা আমি সহ্য করতে পারব না। কে এমন করলে! মানুষে না জানোয়ারে!
কাকিমা বললেন, কী হল, লাগিয়ে দাও।
এ আমি পারব না কাকিমা। অসম্ভব জ্বলবে।
এমনিই তো জ্বলছে, ওষুধে না হয় আর একটু জ্বলবে। তুমি নির্ভয়ে লাগিয়ে যাও।
কী করে এমন হল?
ও আমার মাঝে মাঝেই হয়। বরাতে হয়। কেন হয়, সে আর তোমাকে আমি বলতে পারব না।
সুখেনকে হেডমাস্টার মশাই একবার সপাসপ বেত মেরেছিলেন। সারাপিঠ এইভাবে ফেটে ফেটে, দাগড়া দাগড়া হয়ে গিয়েছিল। রেড়ির তেল লাগিয়ে সুখেন সেরেছিল। আয়োডিনের বদলে রেডির তেল লাগাতে পারলে, হয়তো আরাম পেতেন। পাব কোথায়!
