ইয়েস ইউ ক্যান, কিন্তু তার আগে করবেট সাহেবের মন্তব্যটা শুনে নিন, তা হলে আর সায়েব হতে ইচ্ছে করবে না, মাইকেলের মতো বাঙালি হয়ে যাবেন। করবেট লিখছেন, ভারতীয়দের ইংরেজি শুনে সায়েবরা ভয়ে পাততাড়ি গুটিয়ে পালালেন। ভাবলেন, আর বেশিদিন থাকলে কুইনস ইংলিশের বারোটা বেজে যাবে। কুইট ইন্ডিয়া টু সেভ আওয়ার ল্যাঙ্গোয়েজ। আচ্ছা, আমি তা হলে আসি, নমস্কার।
বৃদ্ধ ভদ্রলোক হাসিহাসি মুখে তাকালেন, বোসো বোসো৷ তোমাকে আমি তুমি বলতে পারি? পারি তো? আমার অনেক বয়স হয়েছে।
আজ্ঞে হ্যাঁ, তুমি বলতে পারেন।
ইংরিজির ওপর তোমার এত ছেলেমানুষি রাগ কেন?
কই, না তো। ইংরিজির ওপর রাগ নয়, রাগ ইংরেজিয়ানার ওপর।
বাঃ, ছোকরা ভাল বলেছে, তোমরা শুনলে?
শুনেছি, ওর অ্যাটিচিউড বড় ইনসালটিং।
এবার আমার প্রতিবাদের পালা, বাংলায়, সর্বনামে একটা চন্দ্রবিন্দু যোগ না করলে অভদ্রতা হয়। আমি তো এখনও চাকরিতে বহাল হইনি, এখনও অপরিচিত, খাস ইংরেজ হলে সেই শব্দই ব্যবহার করতেন, যাতে ‘ওঁর’ বোঝায়।
তুমি আমাদের চেয়ে বয়েসে অনেক ছোট।
বয়সে ছোট হলেই সম্মানে ছোট হয়ে যায় না, অতএব তুমি নয় আপনি।
সুটেড ভদ্রলোক বললেন, এই ভেরি রেসপেক্টেবল পার্সনটিকে আমি শূন্য দিলুম।
বাকি দু’জন বললেন, আমরাও শূন্য দিলুম।
সৌম্য বৃদ্ধ বললেন, কীসের ভিত্তিতে দিলে? কোনও প্রশ্নই তো ওকে করা হল না।
প্রশ্নের প্রয়োজন নেই, ওই এঁড়ে স্বভাবের ছেলে কোথাও চাকরি করতে পারবে না। হি ইজ অ্যাবসোলিউটলি এ মিসফিট। এ রেবেলিয়াস স্পিরিট।
সৌম্য বৃদ্ধ বললেন, তা হলে ওকে আমি পুরো নম্বর দিলুম। মিনমিনে বাঙালি আমি চাই না।
সুটেড বললেন, হি ইজ ইনসেন, আনকালচার্ড।
আমি পাগলদের ভীষণ ভালবাসি, নিজে পাগল তো, আর কালচার? ঈশ্বর ওকে বাঁচিয়েছেন, তোমাদের কালচার ভাগ্যিস রপ্ত করে বসেনি! তা হলে এঁড়ের সঙ্গে ইংরিজি মিশিয়ে কেলেঙ্কারি করে বসে থাকত। তোমাদের কালচার হল সেরিকালচার। চকচকে রেশমের গুটি, ভেতরে কিলবিল পোকা। গরম জলে সেদ্ধ না হলে সিল্ক বেরোবে না।
হৃষ্টপুষ্ট ভদ্রলোক বললেন, বেশ, এই যদি আপনার সিদ্ধান্ত হয়, তা হলে আমাদের আর অপমান করবেন না। আপনিই বাজিয়ে নিন।
হ্যাঁ, আমিই একটু বাজাই, তবে তোমাদের অফিসের কেরানিগিরির জন্যে নয়, আমার ল্যাবরেটরির জন্যে। ছেলেটি যখন সায়েন্স গ্রাজুয়েট তখন একটু তালিম দিলেই কেমিস্ট হতে পারবে। প্রদ্যোতের হাতে ফেলে দিলেই মানুষ করে দেবে। তোমার অ্যানালিসিসের হাতটি কেমন বাবা?
আজ্ঞে, খুব একটা খারাপ নয়।
শোনো, পিপেট আর ব্যুরেট হল অ্যানালিস্টের দুই সহধর্মিণী, ওই দুটিকে যে কন্ট্রোল করতে পারে তার আর মার নেই, হ্যাঁ তার সঙ্গে চোখও থাকা চাই, সদা জাগ্রত দুটি আঁখি। এই অ্যাপ্লিকেশনটা কি তোমার হাতে লেখা?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
বাঃ, ভারী পরিচ্ছন্ন হাতের লেখা হে তোমার। দু’পাশে সমান মার্জিন, সমান্তরাল অক্ষরের সারি। ওহে তোমরা দেখো, ছেলেটি কত অরগ্যানাইজড তার প্রমাণ এই দরখাস্ত। তোমরা অমন অভিমানী স্ত্রীলোকের মতো মুখ গোমড়া করে বসে আছ কেন?
আপনার ব্যাপার আপনি বুঝুন।
তা না হয় বুঝলুম, পরে আবার শত্রুতা করবে না তো? আমার সঙ্গে নয়। আমাকে তোমরা পারবে না। এর সঙ্গে?
সেই স্বাস্থ্যবান ভদ্রলোক বললেন, শত্রুতা করব কেন?
কেনর কি কোনও জবাব আছে হে। আমরা যে বাঙালি। আচ্ছা, তুমি এখন এসো। তোমার পরিচয় আমার এই ফাঁইলে আছে, সেইটাই যথেষ্ট। হরিশঙ্কর কেমন আছে?
চমকে উঠলুম। মরেছে, ইনিই বোধহয় সেই পিতৃবন্ধু। আজ্ঞে, ভাল আছেন।
বড় ভাল ছেলে, বড় ভাল ছেলে। তোমার রক্তে হরিশঙ্কর আছে। ওর কেমিস্ট্রি কেমন চলছে?
খুব জোর চলছে।
বড় ভাল ছেলে, বড় ভাল ছেলে। বাপকো বেটা, সিপাহি কো ঘোড়া, কুছ নেহি হায় তো হোড়া থোড়া।
বিদায়ের সময় সায়েবা বলেন, গুডবাই, সুটেড ভদ্রলোক ছোট্ট একটি চাট ছুড়লেন, এ আমাদের আর এক দাদাঠাকুর। ভেঁপো দি গ্রেট।
সাংঘাতিক কিছু একটা বলার ইচ্ছে হচ্ছিল, মেজাজ থিতিয়ে গেছে। এইটুকুই বলতে পারলুম, আশীর্বাদ করুন তাই যেন হতে পারি।
অফিসের বাইরে রাস্তায় পা রেখে মনে হল, বুদ্ধিসুদ্ধি এখনও তেমন পরিপক্ক হয়নি। অকারণে বাহাদুরি দেখাবার লোভ স্বভাবে প্রবল। কোনও প্রয়োজন ছিল না ছেলেমানুষের মতো পাকাঁপাকা কথা বলার। চাকরিটা যদি হয় নিজের কৃতিত্বে হবে না, হবে পিতার পরিচয়ে।
শরীরকে এবার একটু কষ্ট দেওয়া যাক। দক্ষিণ থেকে উত্তরে হেঁটে হেঁটে যত দূর যাওয়া যায় যাওয়া যাক। যখন আর পারব না তখন একটা কিছুতে উঠে পড়ব। বেলা বেশ পড়ে আসছে। লিন্ডসে স্ট্রিটের কাছে ট্রাফিক সিগন্যালে একটা গাড়ি থেমেছিল, কাছাকাছি আসার আগেই, সবুজ পেয়ে কঁকি মেরে এগিয়ে গেল। মনে হল প্রতাপ রায় চালাচ্ছেন। পেছনে বসে আছেন দু’জন মহিলা একজন পুরুষ। ঠিকই দেখেছি। মেসোমশাই হবু জামাইকে নিয়ে মার্কেটিংয়ে বেরিয়েছিলেন।
ধুঁকতে ধুঁকতে পাড়ায় ঢুলুম। শহর পড়ে আছে বহুদূরে। কালীবাড়িতে আরতির কাসর ঘন্টা বাজছে। শীতলাতলায় মায়ার পিসি ঠুংঠুং ঘণ্টা নাড়ছে। মায়ার সঙ্গে বহুদিন দেখা হয়নি। কোথাও একটা কিছু হয়েছে। লোক চলেছে নেচে নেচে। কে বললে, দীনু এসেছে।
