কী দেখছ?
আপনাকে।
প্রণাম করার জন্যে নিচু হতেই হাত ধরে সোজা করে দিলেন, আমি কারুর প্রণাম গ্রহণ করি না।
নে মহারাজ?
অনেক দেরি আছে রে ভাই। আগে বিশুদ্ধির শেষ ধাপে পৌঁছেই তারপর প্রণাম। তুমি কে?
আমি, আমি এখানে ইন্টারভিউ দিতে এসেছি। শুরু হতে দেরি আছে দেখে একটু ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছি।
অমন অবাক হয়ে কী দেখছিলে?
আমার ভীষণ সন্ন্যাসী হতে ইচ্ছে করে। হিমালয়ের কোনও এক গুহায় নির্জনে একা একা।
হিমালয়ে গেছ?
আজ্ঞে না, হরিদ্বারে গেছি, আর একটু এগোতে পারলেই হিমালয়।
দেহে না মনে?
প্রশ্নটা ঠিক বুঝতে পারলুম না!
মন না রাঙায়ে কাপড় রাঙালে যোগী, গানটা শুনেছ?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আমি এখন কোথায় ঘুরছি?
এইখানে।
কেন ঘুরছি? কর্ম, কর্ম! ধ্যানের স্বাধীনতা কোথায়! যতদিন শ্বাসপ্রশ্বাস ততদিন কর্ম। মনে বৈরাগ্যের বাতিটি জ্বালিয়ে রাখো, হিমালয়কে কলকাতায় নামিয়ে আনো। সাধুসঙ্গ করো?
তেমনভাবে নয়।
শাস্ত্রটাস্ত্র কিছু পড়ো?
মাঝেমধ্যে।
তা হলে শোনো, দুর্লভং এয়মেবৈত দ্দৈবানুগ্রহ হেতুকম। মনুষ্যত্বং মু্মূক্ষুত্বং মহাপুরুষ সংশ্রয় ॥ কিছু বুঝলে?
আজ্ঞে হ্যাঁ। মনুষ্যত্ব, মুমূক্ষুত্ব ও মহাপুরুষের আশ্রয় প্রাপ্তি এই তিনটেই সংসারে দুর্লভ। ঈশ্বরের দয়া ছাড়া হয় না।
বাঃ, খুব সুন্দর। যে কাজে এসেছ জয়ী হও। জীবন, সন্ন্যাস, কোনও কিছু সম্পর্কেই রোজি আইডিয়া রেখো না। পোড়াতে জানো?
একটু বুঝিয়ে বলুন।
রসায়নে একটা শব্দ আছে, দহন, কম্বাসন। ধিকিধিকি একটা আগুন জ্বালাও ভেতরে, বাইরে নয়, ভেতরে হোম। একদিন আশ্রমে এসো, তোমাকে একটু বাজিয়ে দেখব।
এইবার একবার প্রণাম করি।
না, প্রণাম নেবার অধিকার আমার জন্মায়নি। যদি কোনওদিন আসো, সন্ন্যাসাশ্রমে আমার নামটা মনে রাখো ধীরানন্দ। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।
মহারাজ পথের বাঁকে হারিয়ে গেলেন। মনে বেশ একটা বল এসে গেল। ইন্টারভিউ! কীসের ইন্টারভিউ! আমার কে আছে যে চাকরির পরোয়া করব! ইন্টারভিউ না দিলেই বা কী হয়! না, দোব, একবার পরীক্ষা করে নোব ‘আপ সাচ্চা তো জগৎ সাচ্চা’ কত সত্য। সৎ, যাকে বলে মজ্জায় মজ্জায় সৎ, সাহসী। হাসি পাচ্ছে, নারকেলের ছোট্ট খোলে সমুদ্রের আলোড়ন। কী কী আছে আমার, কী কী নেই? যেতে যেতে হিসেব করি। হিংসে আছে? হয়তো আছে। ভাইবোন থাকলে বোঝা যেত। উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে? হয়তো আছে। ক্ষমতা নেই তাই ‘দ্রাক্ষা ফল টক’ বলে পালিয়ে আসি। ভোগের ইচ্ছে? কে না ভোগ করতে চায়? ভোগ না হলে ত্যাগের গর্ব থাকে! গর্ব? হয়তো আছে! নিজেকে বিশ্লেষণ করা কি অতই সহজ।
পলাশ চট্টোপাধ্যায়। নকিব ফুকারে।
যাক, দ্বিতীয়ার্ধে প্রথমেই আমার নাম ডাকা হল। বুক সামান্য কাপল। স্বামী ধীরানন্দের মতো ধীর পায়ে আধাকাঁচের দরজা ঠেলে ম্যানেজিং ডিরেক্টারের ঘরে ঢুকে পড়লুম। অর্ধচন্দ্রাকার টেবিলে চারজন বসে আছেন দরজার দিকে মুখ করে অর্ধচন্দ্র দেবার জন্যে। ঘরটি বেশ মনোরম। সব অনুষঙ্গই আছে। কার্পেট। ঝকঝকে ফার্নিচার। পেলমেট থেকে ঝোলা ভারী পরদা। ফুলও আছে। দুর্বল বুকে চেপে বসার মতো আবহাওয়া। ঘর বলছে, দাস হবি আয়, দাস হবি আয়। মাঝের আসনে সৌম্য চেহারার এক বৃদ্ধ। মাঝখানে সিঁথি। সোনার ফ্রেমের চশমা। দুগ্ধশুভ্র ধুতি পাঞ্জাবি। কবজিতে সোনার ঘড়ি। সেই সুটেড বুটেড ভদ্রলোকও বসে আছেন। মুখ অসম্ভব গম্ভীর। মনে হয়। বেশ ভয় পেয়েছেন। হয়তো আমাকে দেখে। ছাগলের যেমন ভয় থাকে, বাঘেরও তো সেইরকম ভয় থাকতে পারে। টেবিলের এদিক আর ওদিক। ওদিকের ভয়ে এদিক তটস্থ। কারণ ওঁরা দেবেন। ওঁরা না দিলে এদিক পাবে না। কিন্তু এদিক যদি কিছুই না চায়। ছাগল যদি বাঘ হয়ে যায়। বাঘে বাঘে লড়াই। দেখা যাক কী হয়।
ইয়োর নেম প্লিজ? সুটেড-এর প্রশ্ন।
তা প্রথম রাতেই বেড়াল কাটা যাক। দু’জনেই বাঙালি, তা হলে কেন এই ইংরিজিতে কেরানি। আমার পালটা প্রশ্ন, ইয়োর নেম প্লিজ?
চারজন ভদ্রলোকের মধ্যে তিনজনের মুখ যেন কেমন হয়ে গেল। সামনে ঈষৎ ঝুঁকে বসে থাকা বৃদ্ধ ভদ্রলোকের মুখেই কেবল একটু হাসি খেলে গেল। উপভোগের হাসি। টেবিলের কোণে আঙুলের ট্যাপ ট্যাপ শব্দ করলেন।
হরিদাস ব্যানার্জি। ভদ্রলোক কোনওরকমে বললেন।
থ্যাঙ্ক ইউ মি. ব্যানার্জি, মে আই টেক মাই সিট?
ইয়েস।
নাও, লেট আস গেট আওয়ারসেলভস ইন্ট্রোডিউসড। আই অ্যাম পলাশ চ্যাটার্জি, ইয়োর নেম প্লিজ, দি জেন্টলম্যান সিটিং বাই ইয়োর সাইড, চিউইং বিটল লিফ।
থলথলে কালো মোটা ভদ্রলোক থতমত খেয়ে গেলেন, আমার নাম, মাই নেম?
ইয়েস ইয়োর নেম?
মি? মাই নেম ইজ রমেশ সেন।
হোয়াট ইউ আর প্লিজ?
হোয়াট?
ইয়েস, হোয়াট ইউ আর প্লিজ?
আই অ্যাম এ জেন্টলম্যান।
এইবার আমার হাসার পালা। একটু বিলিতি কায়দায় ওয়ারেন হেস্টিংসের মতো হাসি। তাড়িয়ে তো দেবে নিশ্চয়ই। পাগল ছাড়া এরকম বিদঘুঁটে সাহস কার হবে, ইয়েস, ইও আর এ জেন্টলম্যান, বাট, আই আসকড অ্যাবাউট ইয়োর প্রফেশন, ইয়োর পজিশন ইন দিস কোম্পানি। আমরা সবাই যখন বাঙালি তখন বাংলা বলতে আপত্তি কীসের? দেশ তো অনেকদিন হল স্বাধীন হয়েছে। আপনারা করবেটের মাই ইন্ডিয়া’ পড়েছেন?
সেই সুটেড ভদ্রলোক বললেন, হি ইজ কোয়াইট হোসটাইল, প্রবেবলি ইনসেন, উই ক্যান টার্ন হিম আউট।
