কোম্পানির এক কর্মচারী এসে আমাদের হাত থেকে ছোঁ মেরে মেরে ইন্টারভিউয়ের চিঠিগুলো নিয়ে গেলেন। এইবার নম্বর মিলিয়ে একে একে ডাক আসবে। আমার পাশে যিনি বসেছিলেন তিনি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে?
স্বাস্থ্যমন্ত্রী? স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে কী হবে?
প্রশ্ন করবেন না। যদি জানা থাকে বলুন।
আজ্ঞে জানা নেই। প্রধানমন্ত্রী জানা আছে। স্বাস্থ্য এমন কিছু ইমপর্ট্যান্ট পোর্টফোলিয়ো নয়।
বুঝবেন ঠ্যালা, যখন জিজ্ঞেস করবে। এঁরা ওষুধবিষুধ তৈরি করেন, স্বাস্থ্যটাই আগে ধরবেন।
ধরলে বলব জানি না।
আপনি জানেন, তবু বলবেন না। মুখ দেখেই বুঝেছি ভীষণ স্বার্থপর। কাল মাসির ছেলের অন্নপ্রাশন ছিল, তাই জেনারেল নলেজটা ভাল করে আর একবার দেখা হল না। চাকরিটা পেয়ে গেলে বড় ভাল হত। বাবা পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে আজ দেড় বছর পড়ে আছেন।
আমার এ পাশের ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কি ব্যাকিং আছে?
আজ্ঞে না।
আমি এত চেষ্টা করলুম একটাও শালা ব্যাকিং জোগাড় করতে পারলুম না। ব্যাকিং ছাড়া চাকরি হয়!
কোম্পানির কর্মচারী হাঁকলেন, শেখর সামন্ত।
সেই নীলজামা-পরা কেশো ছেলেটি বলির পাঁঠার মতো দরজা ঠেলে ম্যানেজিং ডিরেক্টারের ঘরে ঢুকে গেলেন। এত ভয়ের কী আছে কে জানে। আমরা তো আর সত্যিই পাঁঠা নই যে কাবাব করে খেয়ে নেবে! এখানে না হয় অন্য কোথাও হবে।
সেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী আবার এক ফ্যাচাং বের করলেন, আচ্ছা কোন পাখি আকাশে ডিম পাড়ে?
আকাশে ডিম পাড়ে? লাইফে শুনিনি।
তা শুনবেন কেন? শুনলে যে আমার একটু সুবিধে হত। তিন-তিনটে বোন মাথায় মাথায়, বিয়ে দিতে হবে। আপনার বোন আছে?
না।
আপনার বাবাকে ধন্যবাদ। ভাই আছে?
না।
এমন মানুষের পায়ের ধুলো রোজ সকালে উঠে নিতে হয়। মা আছেন?
না।
তাই বলুন। আমাদের এ বেলা সাতটা পাত, ও বেলা সাতটা পাত। ছাত্র ঠেঙিয়ে ঠেঙিয়ে লাইফ হেল হয়ে গেল। আপনার কে কে আছে?
আমি আর আমার পিতা।
আপনি কেন দাদা চাকরির খোঁজে এসেছেন?
এ পাশের ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, আপনার ব্যাকিং আছে?
একটু আগেই যে বললুম, নেই।
ও, বলেছিলেন, যাক, তা হলে ফেয়ার কম্পিটিশন হবে।
নীলরতন হালদার, হাক পড়ল। শেষমাথা থেকে বেঁটে, গাঁটাগোট্টা এক ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন। জিভ দিয়ে টুকটুক করে ওপর আর নীচের ঠোঁট চেটে নিলেন। নীলজামা-পরা ভদ্রলোক একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। আমাদের দিকে আর ঘেঁষলেন না। সোজা চলে গেলেন সিঁড়ির দিকে। এদিকে এলে দু-চার কথা জিজ্ঞেস করা যেত। যাক গে আমার অত দুশ্চিন্তা নেই। হলে হবে, না হলে হবে না।
হোমা পাখি! যিনি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি এমন আচমকা চিৎকার করে উঠলেন।
কী হোমা পাখি?
আরে মশাই যে-পাখি আকাশে ডিম পাড়ে। কিছুতেই মনে পড়ছিল না। তখন থেকে মনে মনে অ এ অজগর, আ এ আম করতে করতে হ-এ এসে হদিশ মিলল। হাতি হাতি করতে করতে, হোম হোম সুইট হোম, হাতি, হোম, হোম, হোম, হাতি, পেয়ে গেলুম হোমা। স্মৃতি এমনই জিনিস, না চালালে চলে না।
এসব প্রশ্ন কি ওঁরা করবেন?
করলেই হল। ইন্টারভিউ মানে জামাই-ঠকানো প্রশ্ন। দাঁড়ান ওই কায়দায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীটা বের করে ফেলি। ভদ্রলোক চোখ বুজিয়ে ধ্যানস্থ হলেন।
গৌর মল্লিক। আবার পেয়াদার হাঁক। ভদ্রলোকের ধ্যান ভঙ্গ হল। তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন।
কী মশাই পেলেন?
না, যা হয় হবে, ভগবানই ভরসা।
ভদ্রলোক বাঘের খাঁচার দিকে গুটিগুটি এগিয়ে গেলেন।
পরপর সাতজন চলে গেলেন। আমার ডাক আর আসেই না। বোঝাই গেছে সব শেষে যাকে ডাকা হয় তার সম্ভাবনা খুবই কম। বেঞ্চ প্রায় কঁকা। আমরা আর মাত্র তিনজন, চুপসে বসে আছি। পারের ডাক কখন আসে!
যিনি হাঁকডাক করছিলেন, তিনি জানালেন, এখন লাঞ্চের সময়। আবার এক ঘণ্টা পরে বুলফাইট শুরু হবে। ইচ্ছে করলে আমরাও ঘুরে আসতে পারি। যো হুকুম জাঁহাপনা।
বেপাড়ার অফিস। অফিস আর কারখানা একসঙ্গে। বেশ নামী প্রতিষ্ঠান। ওষুধ, সাবান, পেস্ট নানারকম জিনিস তৈরি হয়। কারখানা পেছন দিকে। বিশাল একটা চিমনি আকাশ ফুঁড়ে উঠে গেছে। চারপাশের বাতাসে রকম রকম গন্ধ ভাসছে। আশেপাশে তেমন দোকানপাট নেই। বসতবাড়িই বেশি। উচ্চমধ্যবিত্তের পাড়া। রাস্তায় বেরিয়ে এলে মনেই হবে না চাকরি করতে এসেছি। মনে হবে পাড়া বেড়াতে এসেছি। দোতলা তিনতলার বারান্দায় মেয়েরা দুপুরের মতো গা এলিয়ে দিয়ে গল্প করছেন। দুপুরের গান বাজছে রেডিয়োতে। এ পাড়ার ডাকসাইটে পুরুষরা এখন এসপ্ল্যানেডে, ড্যাবহাউসিতে, বড়বাজারে। এখানে মেয়েদের আধিপত্য চলেছে। বারান্দায় বারান্দায় কথা ছোঁড়াছুড়ি চলছে। কোনও কোনও বারান্দায় শাড়ির বদলে চুল ঝুলছে। বৃদ্ধরা পুরুষের দলে পড়েন না। মানুষ বৃদ্ধ হইলেই বিড়াল হইয়া যান। এ পাড়ার বৃদ্ধদের সম্বল দেখছি তিনটি। একটি ইজিচেয়ার, একখানি খবরের কাগজ, আর হয় একটি পুতুল-পুতুল নাতি না হয় নাতনি। বাইরের ঘরেই তাদের আস্তানা।
মোড়ের মাথায় একটি ঘুমঘুম মিষ্টির দোকান। নীল কাপড় ঢাকা শো-কেসের আড়ালে সেই থোড়বড়িখাড়া মিষ্টি। চায়ের দোকান চোখেই পড়ল না। পড়লে এক কাপ চা খাওয়া যেত। ট্যাকে তেমন পয়সার জোর নেই যে গোটাকতক রসগোল্লা চালিয়ে দোব। হাঁটতে হাঁটতে একটা নির্জন পার্কে এসে পৌঁছেলুম। ভবঘুরে চেহারার দু-একজন চেত্তা খেয়ে এখানে-ওখানে পড়ে আছেন। বেশ মজা, কোনও কাজকর্ম নেই। আকাঙ্ক্ষা নেই। যা হল, হল। যা হল না, হল না। টকটকে গেরুয়া পরে এক সন্ন্যাসী চলেছেন রাজার মতো। মাথায় মহারাজদের মতো করে বাঁধা গেরুয়া। পাগড়ি। দশাসই চেহারা, খাড়া নাক, টানা চোখ, গৌর বর্ণ। রাস্তা কাপিয়ে হেঁটে চলেছেন। পোশাকের ধরন দেখে মনে হচ্ছে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি দেখে, মৃদু হেসে ইশারায় আমাকে কাছে ডাকলেন।
