তোমার আজকের কাজ সব ঠিকমতো হয়েছে তো!
প্রতাপ আমাকে খুব বিপদে ফেলে দিয়েছে।
কোন প্রতাপ?
ওই যে আমাদের হাটখোলার প্রতাপ।
আমাদের সেই গড়পারের প্রতাপের কী খবর জয়?
সে এখন চুটিয়ে ব্যাবসা করছে। বাড়িগাড়ি করে ফেলেছে। প্রতাপ আমাকে যা প্যাঁচে ফেলেছে।
পিতা বললেন, সে তো তোমার প্রাণের বন্ধু ছিল হে।
ওই যে, ওই ব্যারিস্টার ভদ্রলোক এখন কলকাঠি নাড়ছেন। বড়মেয়ের সঙ্গে বিয়ে ফাঁইন্যালাইজড। এইসব বিষয়ী মানুষ যেখানে গিয়ে ঢুকবেন সেখানে একেবারে জ্বলেপুড়ে যাবে। টানতে টানতে কাছা কোঁচা খুলে ছেড়ে দেবে। প্রতাপ এমন বদলে গেছে, ভাবা যায় না। এক দিকে বাঘা শ্বশুর, আর এক দিকে সুন্দরী স্ত্রী। বেচারার মাথা ঘুরে গেছে। আমার নাম জয়নারায়ণ, আমি যা ধরি তা করে ছাড়ি। বড়লোক হবার জন্যে পৃথিবীতে আসিনি। আলুওয়ালাও বড়লোক হতে পারে। কয়লার গোলা করে আমাদের পাড়ার নবাবু তিনতলা বাড়ি করেছে। আমি কীটসের ভক্ত। আমার কাছে, আর্ট ফর আর্টস সেক।
নীচে খুব ধুমধাম শব্দ শুরু হয়ে গেছে। মাতুলের কথা বন্ধ হয়ে গেল। মুখ প্রশ্নবোধক। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, নীচে কী হচ্ছে বল তো? মহাদেবের তাণ্ডব নৃত্য?
একসঙ্গে গোটাকতক কাপডিশ ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল। প্রফুল্লকাকার গলা, বেশ কষকষে করে বলছেন, মারব মুখে জুতোর বাড়ি, মারব মুখে জুতোর বাড়ি। ওরে আমার কুচবিহারের মহারানি।
১.২৬ Death dances like a fire-fly
দশটা বাজতে এখনও প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাকি। পাছে দেরি হয়ে যায় সেই ভয়ে অনেক আগে এসে পড়েছি। বেশ ভয়ভয় করছে। জীবনের প্রথম ইন্টারভিউ। প্রথম যেদিন দাড়ি গোঁফ কামিয়েছিলুম সেদিন একরকম মনের অবস্থা হয়েছিল, অদ্ভুত এক বিষণ্ণ অনুভূতি, যাঃ বড় হয়ে গেলুম, বিদায় শৈশব, বিদায় কৈশোর!
স্বপ্ন দেখার নিশ্চিন্ত দিন শেষ হয়ে গেল!
আর কেউ খোকা বলবে না। বাস বা ট্রামের নারী-আসন থেকে ঠেলে তুলে দেবে। কোনও মহিলা বলবেন না, খোকা তুমি আমার কোলে বোসো। মলিমাসি বলবেন, পিন্টু, তুমি একটু বাইরে গিয়ে বোসো, আমি একটু সাজগোজ করে নিই।
আর আজ মনে হচ্ছে, আমি আমার বহু মূল্যবান স্বাধীনতা বিকিয়ে দিতে এসেছি। আমার দিন গেল, রাত গেল। পিতার চেয়ে বড় হয়ে উঠবে এই বিশাল বাড়ির কর্মদাতা প্রভুরা। প্রভু ‘আমি’ থেকে হয়ে যাব দাস ‘আমি’। মাস গেলে পাঁচশো টাকা। পাঁচশো টাকাও কি এঁরা দেবেন! এখন মনে হচ্ছে, ইয়ারকি না করে, আর একটু ভাল করে লেখাপড়া করলে হত। যদি আই সি এস হতে পারতুম, তা হলে ওরই মধ্যে একটু বড় দাস হতে পারতুম। গ্রেজ ইন থেকে যদি ব্যারিস্টার হয়ে আসতে পারতুম, কিংবা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তার। পিতা বহুবার বলেছিলেন। বললে কী হবে, মানুষ যে ভাগ্য নিয়ে আসে। কেউ রাজা হয়, কেউ খাজা।
সুটেড বুটেড, টাই পরা এক ভদ্রলোক বাড়িটার দিকে আমার মতোই সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছেন। পায়ের জুতো কালির বিজ্ঞাপনের মতোই জেল্লা ছাড়ছে। ইনি যদি চাকরির উমেদার হন, আমার আশাভরসা খুবই কম। এমন একটা স্মার্ট গাইকে ছেড়ে কে আর এই দিশি গাইকে বেছে নেবে। এ তো আর খাটাল নয়! বড় ঘাবড়ে গেলুম। ভদ্রলোক আমার প্রতিযোগী না-ও হতে পারেন। মশা মারার জন্য কেউ এমন কামান দাগতে আসবে না। ভদ্রলোক সিগারেট টানছিলেন। টুকরোটা রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গটগট করে গেটের দিকে এগিয়ে গেলেন। সাংঘাতিক ডাট। চরিত্রে এমন একটা প্রভু-প্রভু ভাব কীভাবে আনা যায়! খুব মাংস খেলে মনে হয় হতে পারে। বাঘ, যেমন বাঘ, ছাগল যেমন ছাগল।
দেউড়িতে চাপরাশ পরা প্রহরী। ভদ্রলোককে দেখে সট করে টুল ছেড়ে উঠে সেলাম বাজাল। যাক বাবা ইনি তা হলে আমার প্রতিযোগী নন। অন্য কেউ। বিগ বস গোছের কিছু একটা ব্যাপার! নীল জামা পরা আমার মতোই আর এক ন্যালাখ্যাবলা এসেছেন। এঁরা যা মাইনে দেবেন তাতে আমাদের মতো এইরকম ঝলঝলে খলখলে মালই জুটবে। নীলজামা কপালের দু’পাশে পাটিসাপটার মতো পেতে চুল আঁচড়েছেন। বেশ গুড বয় গুড বয় চেহারা হয়েছে। চোখদুটো বড় বড়। চশমাটা বেশ ভারিক্কি মানুষের মতো। বেশ কাশি হয়েছে। শব্দটাও বিদঘুঁটে। শুনলে মনে হবে ভেতরে আর কেউ ঢুকে কাশছে।
কাশতে কাশতে জিজ্ঞেস করলেন, ইন্টারভিউ দিতে এসেছেন?
হ্যাঁ, আপনি?
আমিও খ্যাঁক। কীরকম তৈরি হল, খ্যাঁক।
কী তৈরি?
আরে, প্রেপারেশন, ঘ্যাঁক ঘ্যাঁ। ইন্টারভিউয়ের ভ্যাঁচ প্রেপারেশন। উঃ মরে গেলুম। দাঁড়ান একটু যষ্টিমধু খাই, ফ্যাঁচাত, খাবেন নাকি!
না, আমার কিছু হয়নি।
না হলেও খাক ভাল।
উঃ সর্দি আর কাশিতে ভদ্রলোক নাস্তানাবুদ। ভালই হয়েছে, অনেক মাইনাস পয়েন্ট। প্রতি কথায় একটা করে হাঁচি বা কাশির পাংচুয়েশনে ইন্টারভিউয়ে খুব বেশি দূর এগোতে পারবেন না। যাঁরা নেবেন তারা বলবেন, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি।
দেউড়ির সেই গোপদাদা বললে, সামনেই সিঁড়ি, দোতলায় চলে যান।
দোতলায় একটা ঘরের বাইরে লেখা রয়েছে, ম্যানেজিং ডিরেক্টার। দরজাটা বেশ বাহারি। অর্ধেকটা কাঠ, অর্ধেকটা কাঁচ। কাঁচে মিছরির দানার মতো আলো আটকে আছে, যেন একটু আগে আলোর বৃষ্টি হয়ে গেছে। ঘরের বাইরে টানা বারান্দা, এপাশ থেকে ওপাশে ঘুরে গেছে। গোটাকতক চকচকে বেঞ্চ পাতা। দু’-চারজন বসে আছেন। প্রত্যেকেই প্রত্যেককে সন্দেহের চোখে দেখছেন। কটা পদ খালি জানা নেই, প্রার্থী অনেক। কার ভাগ্যে শিকে ছিড়বে বিধাতাই জানেন।
