ঘরের সবকটা ঝাড় জ্বলছে। বিশাল বিশাল সোফায় এ পাড়ার অনেক গণ্যমান্য মানুষ বসে আছেন। গাড়িবারান্দার একপাশে কালো রঙের একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে। পেট্রলের মৃদু গন্ধ। গাড়িটা মনে হয় দীনুর মেসোর। কলকাতা পুলিশের দুটো গাড়ি আমি চিনি। একটা নীল আর একটার রং চকোলেট।
ভেতরে যারা বসে আছেন, তাদের দেখলেই মনে হতে পারে এ বাড়ির কোনও উৎসবে নিমন্ত্রণ রাখতে এসেছেন। একটা ব্যাচ বসেছে। উঠলেই এঁদের ডাক পড়বে। অনেকে আবার সিগারেট ধরিয়েছেন। মৃদু মৃদু টান মারছেন। অনেকের চোখ বেশ ঘুমঘুম। বহুক্ষণ বসে থাকার ক্লান্তি।
প্রবীরদা বললেন, এঁরা যে খুব বড়লোক গো। এখানে আমরা কী করব?
সত্যিই তাই। পিতৃদেব দূর থেকে বুঝতে পারেননি। তিনি এলে বড় অস্বস্তি পেতেন। দীনুর মাকে আমি দু’-একবার সামনাসামনি দেখেছি। বেশ অহংকারী। দুই দাদা বাইরে থাকেন। কাল তাঁরা নিশ্চয়ই এসে পড়বেন। আজও এসে পড়তে পারেন। দিল্লি আর বম্বে প্লেনে বর্ধমানের চেয়েও কাছে।
প্রবীরদা বললেন, চলো, সরে পড়ি।
হ্যাঁ, তাই চলুন। বড়লোককে বড়লোকরাই সাহায্য করতে পারেন। এখানে আমাদের বোকাবোকা লাগছে।
সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছি। ঝাউগাছের অন্ধকার থেকে ভারী গলায় কে যেন প্রশ্ন করলেন, কী চাই?
সিগারেটের আগুন বড় হচ্ছে, ছোট হচ্ছে। সেই দিকে তাকিয়ে বললুম, কিছু চাই না।
মজা দেখতে এসেছ?
আজ্ঞে না, দীনু আমার বন্ধু ছিল।
অ, বন্ধু ছিল, যত র্যাজাটে বন্ধুর পাল্লায় পড়ে ছেলেটা শেষ হয়ে গেল। যাও, সরে পড়ো।
গেটের কাছে এসে প্রবীরদা জিজ্ঞেস করলেন, লোকটি কে বল তো?
মনে হয় এ পরিবারের কোনও হিতৈষী।
বাব্বা, বিপদেও মানুষের অহংকার যায় না।
রাস্তায় এসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম। মন ক্রমশই বিষণ্ণ হয়ে উঠছে। দীনু আর দীনুর পিতা সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। দীনুর মা বিরাট বড়লোকের মেয়ে। তার কাছাকাছি একবার যেতে পারলে হত। কিন্তু কী করে যাই।
প্রবীরদা বললেন, আমি তা হলে যাই। আর একদিন আসব। তোমার বাবা আজ খুবই চঞ্চল হয়ে রয়েছেন। পারো তো তুমি একবার কাল এসো না! অনেক কথা আছে। কাজের কথা।
চেষ্টা করব, যদি ছাড়া পাই।
ধুলো উড়িয়ে আমাদের সামনে দিয়ে একটা গাড়ি চলে গেল। পেছনের আসনে কে বসে?
প্রবীরদা ঠিক দেখেছেন, বললেন, জয় না? মরেছে, আমাদের খুঁজতে এসেছে।
গাড়ির ন্যাজ তখনও দেখা যাচ্ছে। রাস্তার বাঁক ঘুরছে। প্রবীরদা, জয় জয় বলে ছুটতে আরম্ভ করলেন। রাস্তার পাশে একটা নেড়ি নিশ্চিন্ত আরামে শুয়ে ছিল। প্রবীরদার দৌড় দেখে তারও খুব ছুটতে ইচ্ছে করল। তড়াক করে লাফিয়ে উঠে পেছন পেছন ছুটল, ঘেউ ঘেউ করে।
গাড়ির পেছনে কেউ ওভাবে ছুটে পারে! সামনের বাঁক ঘুরে গাড়ি তো সোজা চলে যাবে। পরিষ্কার কঁকা রাস্তা। মাঝখান থেকে কুকুরের কামড় না খান।
বাড়ির সামনে গাড়ি থেমেছে। মাতুল ওপরে উঠেছেন। প্রবীরদা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন বিষণ্ণ বদনে। প্রফুল্লকাকা নীচের তলায় দড়ি পাকাচ্ছেন। কাকিমা একটা দিক ধরে আছেন। পাক যত পেকে উঠছে কাকা কেবলই সাবধান করছেন, দেখো ছেড়ে দিয়ো না যেন, ছেড়ে দিয়ো না সুন্দরী।
প্রবীরদা বললেন, ধরতে পারলুম না, ওপরে উঠে গেল।
গেছেন, যান না, তাতে আমাদের কী?
আরে বুঝছ না কেন? ধরতে পারলে তোমার বকুনিটা একটু কম হত।
আমি বকুনি-প্রুফ। আমার জন্যে ভাববেন না। চলুন ওপরে চলুন।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে পাকের টানে কাকিমা দড়ি ফসকেছেন। কাকা লাফাচ্ছেন, আরে মাগি, সবই কি তোর ফসকা গেরো! মারব মুখে জুতোর বাড়ি। খাচ্ছে দাচ্ছে গতর বাগাচ্ছে, কুচবিহারের মহারানি।
কাকিমা বলছেন, তুমি টানলে কেন, না বলে?
ওরে আমার কুইন ভিক্টোরিয়া রে; বলে টানতে হবে, বলে টানতে হবে। তখন থেকে আমি জপে যাচ্ছি, ওরে ছাড়িসনি, ওরে ছাড়িসনি।
স্বামী-স্ত্রীর সোহাগ দেখে প্রবীরদা হা হয়ে গেছেন। দাম্পত্য জীবনের এক চাকলা দড়ির পাকে পাকে ক্রমশই রসস্থ হচ্ছে। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, এঁরা কারা?
পরে বলব, এখন ওপরে চলুন।
পিতার সামনে একটা চেয়ারে গম্ভীর মুখে মাতুল বসে আছেন। আমরা দুজনে চোরের মতো, ন্যাজ গুটোনো দুটো কুকুরের মতো পায়ে পায়ে পাশে সরছি। জানলার পাশে দাঁড়াতে পারলে, রাস্তা দেখা যাবে। জীবনের মিছিল চলেছে যেখানে বকুনি খেলেও তেমন দুঃসহ লাগবে না। বাইরে কিছু উড়িয়ে দেওয়া যাবে।
মাতুল কিন্তু বকলেন না, শান্তগলায় জিজ্ঞেস করলেন, কী দেখে এলে? ডেডবডি আনার ব্যবস্থা হয়েছে?
ঠিক বোঝা গেল না।
কেন?
বহু বড় বড় লোক এসেছেন। দীনুর মেসোমশাই এসেছেন, যিনি লালবাজারে আছেন।
যাক, তা হলে আর কোনও চিন্তা নেই।
পিতা হাসলেন শব্দ করে। মুখে আলোর ছায়া পড়েছে। মাতুলের কথার উত্তরে বললেন, বেশ বলেছ, আর কোনও চিন্তা নেই। মৃত এবার ফিরে আসবে মায়ের কোলে।
মাতুল বললেন, তোমরা খুব অন্যায় করেছ। আমাকে না বলে চলে এলে কেন?
প্রবীরদা বললেন, তুমি ছিলে না, তাই ওকে নিয়ে চলে এলুম আমাদের বাড়িতে, সেখান থেকে আমরা গেলুম জয়ামাতার কাছে। এটা তুমি স্বীকার করবে জয়, তোমার ওই সিনেমা পাড়ার চেয়ে মহাগিরি আশ্রম ঢের ভাল। ওখানে গেলে মানুষের দিব্যজ্ঞান হয়।
হ্যাঁ, তা হয়। তবে তোমাদের না দেখে বড় দুশ্চিন্তায় ছিলুম, আমার একটা দায়িত্ব আছে তো।
