ছেলে কী করে মানুষ করতে হয় আমাকে নাই বা শেখাতে এলে।
আজ্ঞে, অন্যায় হয়ে গেছে।
সেই চাপা-পড়া লোকটি আছে না গেছে?
আছে। চাপা পড়েনি। সাইকেল থেকে ছিটকে পড়েছিল। খুব গোলমাল হতে পারত। আমার। পাড়া তো, সব ঠান্ডা করে দিলুম, তারপর আমিও গেলুম ওদের সঙ্গে স্টুডিয়ো পাড়াতে। আপনার ছেলের আজ দিব্যজ্ঞান হয়েছে।
কোথায়? বাইজি পাড়ায়?
প্রফুল্লকাকা বললেন, নাচ দেখলে? কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে নাচ? অখাদ্য ভক্ষণ করেছ? যদি করে থাকো, আগে স্নান করে নাও।
পিতা বললেন, প্রফুল্ল, আমার মনে হয়, তোমার এখন নীচে যাওয়াই ভাল।
কেন বলো তো, কেন বলো তো? আমি তো আজ আর কাঁধকাটা গেঞ্জি পরে আসিনি। এই। দেখো ফতুয়া পরে এসেছি।
এলে কী হবে? তোমার অতীত দুধের মতো উথলে উঠছে। তুমি না কোন বাইজির সঙ্গে তবলা বাজাতে?
বাজাতে মানে? এখনও বাজাই, বিখ্যাত কমলী বাই।
তা হলে তুমি অবশ্যই নীচে যাবে।
এখানে তো বেশ লক্ষ্মীছেলের মতো বসে আছি। কেমন ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে!
নাই বা কথা বাড়ালে। জানোই তো আমার মেজাজ বিশেষ সুবিধার নয়।
প্রফুল্লকাকা উঠে পড়লেন। ফতুয়ার পকেটে দেশলাই আর বিড়ির কৌটো শব্দ করে উঠল।
প্রবীরদা বললেন, আজ্ঞে বাইজিজ্ঞান নয়, দিব্যজ্ঞান। আমরা আজ দু’জনে জয়ামাতার কাছে গিয়েছিলুম। আমার বোন ঊষাও গিয়েছিল। সে খুব ভাল গান গায় তো!
তিনি কার শিষ্যা?
আমার ঠিক জানা নেই। তবে সাংঘাতিক শক্তি। পিন্টুকে আজ চৈতন্য দিয়েছেন। একদিনেই অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছেন। বড় ভাগ্যবান ছেলে। সামান্য বিভূতিও পেয়েছে। মানুষের ভেতর দেখতে পাচ্ছে।
তাই নাকি? নিজের ভেতরটা দেখতে পাচ্ছে? কী হে, পাচ্ছ?
প্রবীরদার মতো বোকা মানুষ দেখা যায় না। কার কাছে কী কথা বলছেন! নিজের ভেতর যেদিন দেখতে পাব সেদিন কি আর সংসারে থাকব। ছার এ সংসার বলে বেরিয়ে পড়ব। আজ সেই অনন্তের সিংহদুয়ারের চৌকাঠ থেকে ফিরে এসেছি। একঝলক দেখেছি, এপারের ওপারে কী। আছে। সতীমা আমাকে ভবিষ্যৎ দেখিয়েছিলেন, ইনি আমাকে অনন্ত দেখিয়ে দুয়ারটি বন্ধ করে দিলেন। চাবি আমার কাছে নেই।
পিতা প্রবীরদাকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, তুমি কী জন্যে এসেছ?
ঈশ্বরের সন্ধানে।
ঈশ্বর! তিনি কে? কোথায় তাকে পাওয়া যায়?
অসহায়ের মতো, পড়া-না-পারা ছাত্রের মতো প্রবীরদা বললেন, আমি তো জানি না।
কেউ কি জানেন?
অনেকে যে বলেন!
বিকারের রোগীও তো অনেক কিছু বলে! তোমার কি ভোগ শেষ হয়েছে?
কী ভোগ?
দুর্ভোগ।
আজ্ঞে সে তো সেই তিন বছর বয়েস থেকে ভুগেই চলেছি।
আসক্তি গেছে?
কীসের আসক্তি?
কামিনী কাঞ্চন।
আমার নেই।
মিথ্যেবাদী, তুমি মিথ্যেবাদী, ড্যাম ল্যায়ার। জগৎ যাতে লাট খাচ্ছে, তুমি তার বাইরে? তা হলে তুমি কেন বাপু ঈশ্বর খুঁজছ! তুমিই তো ঈশ্বর।
আমি জানি না। বিশ্বাস করুন, আমি জানি না। আমার ভেতরটা ভীষণ ছটফট করে।
সেটা তোমার কামনা। তোমার ভেতরটা পুড়ছে। অঙ্ক জানো?
সামান্য।
তা হলে আমার কাছে আসা-যাওয়া করো। ঈশ্বর হলেন গণিত, ঈশ্বর বিজ্ঞান। কীর্তন নয়, নাক টেপা নয়, উপবাস নয়, সন্ন্যাস নয়, সাধক নয়, সাধিকা নয়, ঈশ্বর হলেন কর্ম, ঈশ্বর হলেন পারফেকশন।
আমি আপনার বড় ছেলে।
কেন?
আপনি আদর্শ পিতা, তাই।
হা হা করে পিতৃদেব হেসেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন। আমি হাসছি, একী আমি হাসছি! জানো আজ আমার কী হয়েছে, আমার পুত্রোপম ছাত্র মারা গেছে। তুমি জানো আজ কী সর্বনাশ হয়েছে?
কী হয়েছে?
পিতার গলা আবেগে রুদ্ধ, দীনু মারা গেছে।
সেকী?
হ্যাঁ, কে বলেছে ঈশ্বর আছে। ড্যাম লায়ার, চিট, এই কি ঈশ্বরের পৃথিবী, আই স্ট্যাম্প অন ইট, আই কিক দিস আর্থ, দিস ডাস্ট, ইটস লজ অ্যান্ড বাইলজ, এ ক্রুয়েল, আনোন ক্রিয়েটার, ফিয়ারড অ্যান্ড রেসপেক্টেড উইদাউট অ্যানি রিজন।
দীনু মারা গেছে। এই তো সেদিন দীনু বেঁচে ছিল। সুস্থ, সবল, প্রাণপ্রাচুর্যে টগবগে! বিশ্বাস করা যায় সে মারা গেছে! মৃত্যু এত সহজ!
কীভাবে মারা গেল?
নিয়তি। মানুষের নিয়তি। এর মাঝে কবে ও যেন মোটরসাইকেলে দুর্গাপুর গিয়েছিল। ওর সেই বন্ধু সুখেনের কাছে। ফেরার পথে বর্ধমানের কাছে জিটি রোডে দুর্ঘটনা। ছিটকে পথের পাশে মাঠে গিয়ে পড়েছিল। মাথাটা একেবারে চুরমার হয়ে গেছে। বর্ধমান পুলিশ ফোন করে জানিয়েছে এই কিছুক্ষণ আগে। দীনুর বাবা এখন বিলেতে। বাড়িতে এখন কেউ নেই। কে নিয়ে আসবে মৃতদেহ! আমি একবার যাই।
আপনি এখনও ভাল করে হাঁটতে পারছেন না, আপনি কোথায় যাবেন? আমি যাচ্ছি।
তুমি! তুমি কি কিছু করতে পারবে? তুমি তো নিজেকেই সামলাতে পারো না।
চেষ্টা করে দেখি। হয়তো পারব।
প্রবীরদা বললেন, ছেলেটি কে?
আমার বন্ধু, বাবার সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র।
চলো চলো, আমিও যাই তোমার সঙ্গে।
দীনুদের বাড়িটাকে বাগানবাড়িই বলা চলে। সিংহ দরজার দু’পাশে থাবা গেড়ে বসে আছে দুটো সিংহ। সারাবাড়ি এই সেদিন রং করা হয়েছে। সাদা সিংহ আলো-অন্ধকারে অদ্ভুত নিষ্ঠুরতায় হাসছে। যেন এইমাত্র দীনুকে মেরে এসে বিশ্রামে বসেছে। দু’পাশে বাগান। দু-একটা স্ট্যাচু আছে। সামনেই গাড়িবারান্দা। মৃদু আলোয় স্বপ্ন মায়া খেলছে।
বিশাল বৈঠকখানা। বার্মা কাঠের ঝকঝকে দরজার দুটো পাল্লা দু’পাশে হাট খোলা। কিছু নেই, বাধা দেবার কোনও ক্ষমতা কারুরই নেই। সবকিছু এ সংসারে বড়ই অবারিত। দরজা যত বড়ই হোক, যে যাবে, সে যাবে।
