ফুলেল মহিলা কুঁক কুঁক করে হেসে উঠলেন।
প্রবীরদা ফিসফিস করে বললেন, কান মলে দিতে ইচ্ছে করছে।
কার? ওই মহিলার?
না রে বাবা, আমার নিজের। নিজের দোষেই বেইজ্জত। কপালটা দেখ তো?
একটু লাল হয়েছে। এ কপাল ঘেঁতো হবার জন্যেই জন্মেছে। যাক, তোর শরীর কেমন লাগছে? ঘোর কেটেছে? তা কেটেছে, তবে অদ্ভুত একটা ব্যাপার হচ্ছে। বড়কে ঘোট দেখছি, ছোটকে বড়। সে আবার কী? চোখ খারাপ হয়ে গেল নাকি?
না, চোখের ব্যাপার নয়। এ হল ভেতরের ব্যাপার। যেমন ধরুন, একেবারে সামনের আসনে ওই যে ভদ্রলোক বসে আছেন, বিশাল চেহারা, আসলে উনি খুব ক্ষুদ্র। জোরে একটা ধমক দিলে ঘাবড়ে যাবেন।
পরীক্ষা করে আসব?
যাঃ, লোকে আপনাকে পাগল ভাববে। আবার ওই যে মেয়েটি, কুক কুঁক করল, ও একেবারে শিশু।
তোর এরকম কেন হচ্ছে বল তো?
তা জানি না। আরও একটা ব্যাপার হচ্ছে।
সেটা আবার কী?
সকলের ভেতর দেখতে পাচ্ছি।
মানে সকলকে উলঙ্গ দেখছিস?
না গো, মন দেখতে পাচ্ছি। যেমন আমাদের সামনের আসনের ভদ্রলোক একটা অন্যায় কাজে চলেছেন।
কী হবে?
কিছুই হবে না। কাজটা করে আসবেন।
আমার মন দেখতে পাচ্ছিস?
হ্যাঁ, আপনি ওই মেয়েটির কথা ভাবছেন।
ওঃ ঠিক বলেছিস। তোর সামনে দাঁড়াতে ভয় করছে রে।
আর ওই মেয়েটিও আপনার কথা ভাবছে।
মরেছে, চল, তা হলে নেমে পড়ি।
দরকার নেই। হরেকরকম মনের মানুষ চারপাশে ঘুরছে, ঘুরবে।
হ্যাঁরে আমার ভেতর পাপ আছে?
না, হুজুগ আছে।
যাক বাবা খুব বাঁচান বাঁচিয়েছিস। তোর এই শক্তিটা কবে কাটবে?
ওই মা জানেন।
আমাদের পাড়ায় যখন ঢুকলুম, তখন ন’টা বেজে গেছে। চারপাশ কেমন যেন থমথমে। কিছু একটা হয়েছে। দোকানে দোকানে জটলা। দীনুর নামটা কানে আসছে। দীনু আবার কিছু করল নাকি?
পিতৃদেব গম্ভীর মুখে বারান্দায় বসে আছেন। পাশে একটি চেয়ারে প্রফুল্লকাকা। সিঁড়ির মুখে। পঁড়িয়ে প্রবীরদা ফিসফিস করে বলছেন, তুমি আগে।
আমি বলছি, আপনি আগে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে কাকিমা ডালে লঙ্কা ফোড়ন দিলেন, হ্যাঁ করে। সমস্ত ঝাঁঝ আমাদের নাকে। কোরাসে দুটি সশব্দ হচি। প্রফুল্লকাকা লাফিয়ে উঠলেন, কে, কে? কে ওখানে?
১.২৫ লে হুঁ মকতব-এ গম-এ দিল-মে সবক হুনূজ্
আত্মপ্রকাশ বলে একটা কথা আছে। হাঁচিতে আমাদের আত্মপ্রকাশ হল। দু’জনে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বললুম, আমরা।
আমার ভয় পাবার কারণ আছে। প্রবীরদা কেন যে ভয় পাচ্ছেন এত?
প্রবীরদা সোজা টর্পেডোর মতো পিতৃদেবের পায়ের ওপর পড়লেন। প্রফুল্লকাকা পিতার হয়ে বলতে লাগলেন, এসো বাবা, এসো, দীর্ঘজীবী হও, শতায়ু হও। চটাস করে নিজের পায়ে একটা চাটা মেরে বললেন, বড় মশা হয়েছে হে। ম্যালেরিয়া না হয়।
পিতৃদেব গম্ভীর গলায় বললেন, আপনি কে?
আজ্ঞে, আমি আপনার শিষ্য।
কবে থেকে এ অবস্থা হল?
প্রবীরদা ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, আজ্ঞে কী অবস্থা!
এই মস্তিষ্ক বিকৃতি, এই উন্মাদ অবস্থা।
আজ্ঞে, আমি তো উন্মাদ নই। আমাদের পাশের বাড়িতে এক পাগলি আছে। ওই যে ওর। কপালে ইট মেরেছে।
তার মানে?
পিতা গর্জন করে উঠলেন। প্রবীরদার কি কোনও বুদ্ধিসুদ্ধি নেই? দুম করে এই কথাটা বলা কি উচিত হল!
তুমি তা হলে তোমার মামার সঙ্গে সিনেমাপাড়ায় যাওনি।
আজ্ঞে হ্যাঁ গিয়েছিলুম।
তা হলে?
মামা অদৃশ্য হলেন।
কেন? সে কি পি সি সরকারের মতো ম্যাজিশিয়ান হয়েছে নাকি? দৃশ্য থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল!
আজ্ঞে না, তিনি আমাদের ফেলে রেখে কোন এক বড়লোকের বাড়ি মার্বেল পাথর খুলতে চলে গেলেন।
সে আবার কী? সকালে ছিল মিউজিক ডিরেক্টর, বিকেলে রাজমিস্ত্রি।
প্রফুল্লকাকা ফোড়ন কাটলেন, কত রঙ্গ জানো যাদু, কত রঙ্গ জানোনা, সর্প হয়ে দংশ তুমি ওঝা হয়ে ঝাড়ো। প্রবীরদা আবার বোস বলে ফেললেন, আজ্ঞে না, তা নয়, ওই মার্বেল পাথর বেচে বাইজিদের পাওনা মেটাবে।
সেকী? এত অধঃপতন। বলে গেল সিনেমা করছি, চলে গেল বাইজি বাড়ি?
প্রফুল্লকাকা বললেন, বয়েসের দোষ।
প্রবীরদা বললেন, আমাদের বলাটা ঠিক হচ্ছে না, তাই আপনাদের বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে।
তুমি কে বলো তো? তোমার পরিচয়টা আগে জানা দরকার।
আমি জয়ের ছাত্রজীবনের বন্ধু।
প্রফুল্লকাকা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, তার মানে তবলচি।
আজ্ঞে না, তবলচি নই। চিত্রশিল্পী। গান লিখি। তেমন গাইতে পারি না।
প্রফুল্লকাকা বললেন, রোজ সকালে ভাল করে গলা সাবধা। গান কি মুখের কথা। বিখ্যাত গাইয়ে ওমপ্রকাশ শর্মা কী করতেন জানো? রোজ ভোরবেলা কৃষ্ণা নদীর একগলা জলে…
পিতা বললেন, ভূগোলে তুই বড় কাঁচা প্রফুল্ল, উত্তরভারতে কৃষ্ণা আসবে কী করে! গঙ্গা নদী।
হ্যাঁ হ্যাঁ, গঙ্গানদীতে আর্লি মর্নিংয়ে, একগলা জলে দাঁড়িয়ে রেগুলার গলা সাধতেন, এ তানা। যোবানা পরমানানা।
পিতা হাত তুলে বললেন, থামো, বড় বেলাইনে চলে যাচ্ছ। তুমি তা হলে জয়ের বন্ধু।
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আমার ছেলেকে কোথায় পেলে?
ওই যে, বিডন স্ট্রিটের মুখে জয়ের গাড়ি একজনকে চাপা দেবার জোগাড় করেছিল।
বহত আচ্ছা।
আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কেন তোমাকে যেখানে-সেখানে যেতে দিই না দেখেছ?
প্রবীরদা বললেন, আজ্ঞে হুলো বেড়াল আর উঠতি বয়সের ছেলেকে কদিন ধরে রাখবেন?
থামো, তোমাকে আর মোড়লি করতে হবে না। তোমার ছেলে আছে?
আজ্ঞে না, আমিই তো ছেলে।
