আমার মনে হল, একটা বরফের ছুরি আমার কপাল ভেদ করে চলে গেল। একটা শীতল অনুভূতিতে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন হয়ে আসছে। স্থান, কাল, পাত্র সব হারিয়ে যাচ্ছে। চোখ বুজে আছি তবুস্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, এতক্ষণ যা দেখছিলুম তা নয়, অন্য কিছু, অন্য এক জগৎ। জ্যোৎস্নার মতো নীল আলো, গাছের পাতা যেন রুপোর তবক। অগাধ জলাশয় যেন তরল কাঁচ।
তিনি ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন, মা বল, মা বল, মা বল।
আমি মা বলছি, আর যতবার বলছি, চোখের সামনে একটি করে সোনার কদম ফুল ফুটে উঠছে।
জোরে নিশ্বাস নে, খুব জোরে। মনে কর, প্রাণবায়ু মেরুদণ্ড দিয়ে পিঠ বেয়ে ধীরে ধীরে উঠছে। মাথার দিকে। সেখানে একটি সোনার কমল ফুটে আছে। নিশ্বাস জোরে ফেল। মনে কর একঝলক কালো বাতাস বেরিয়ে যাচ্ছে।
মা বল, মা বল, মা বল।
সাধিকা নিজেই গাইতে লাগলেন। তেমন সুর, তেমন উচ্চারণ সহসা শোনা যায় না।
অধরং মধুরং বদনং মধুরং নয়নং মধুরং হসিতং মধুরম্।
হৃদয়ং মধুরং গমনং মধুরং মধুরাধিপতেরখিলং মধুরম্ ॥
প্রবীরদার হাতে কাঠ খত্তাল, ভক্তদের হাতে খঞ্জনি। প্রত্যেক চরণের শেষ লাইনটি সকলে সমস্বরে গেয়ে গেয়ে উঠছেন: চলিতং মধুরং ভ্ৰমিতং মধুরং মধুরাধিপতেরখিলং মধুর।
সুরে আর ছন্দে আমাদের শরীর দুলে দুলে উঠছে। কেউ কেউ হাঁটু গেড়ে বসছেন।
গীতং মধুরং পীতং মধুরং ভুক্তং মধুরং সুপ্তং মধুর
ক্রমে সকলে পঁড়িয়ে উঠলেন, দক্ষিণে বামে দুলতে দুলতে গাইতে লাগলেন, সলিলং মধুরং কমলং মধুরং মধুরাধিপতেরখিলং মধুর ॥
এক একটি চরণ ঘুরে ঘুরে আসছে, করণং মধুরং তরণং মধুরং হরণং মধুরং রমণং মধুর।
আমি কিন্তু থেবড়েই বসে আছি। ভক্তেরা যখন গাইছেন, সাধিকা তখন কানের কাছে মুখ এনে বলছেন, মা বল, মা বল। আমার ভুরুর মাঝখানে বৃত্তাকারে আলোর ঢেউ খেলছে। ঘোট, ক্রমশ বড় হতে হতে অসীমে মিলিয়ে যাচ্ছে। এক একটি বৃত্তের এক এক রং। রামধনুর মতো পরপর সাজানো।
ঢং ঢং করে আটটা বাজল। চিত্রপটের দুপাশে মোমবাতির মতো আলো দুটি ছাড়া ঘরের সব আলো একে একে নিবে গেল। সংগীত থেমে গেল। চারপাশে অখণ্ড নীরবতা। অগাধ জলে ডুবে বসে থাকার মতো অনুভূতি।
ঊষাদি ধীরে ধীরে আমার পাশে এসে হাঁটু গেড়ে বসলেন, চলো, এবার বাড়ি চলো।
সাধিকা বললেন, দাঁড়া। বুকের কাছে জামার বোতাম খোল।
নেশাচ্ছন্নের মতো বোতাম খুলোম। তিনি কড়ে আঙুল দিয়ে একটি ব এঁকে, তিনবার ফুঁ দিলেন।
যা, তোর হবে। ঊষা!
মা!
তুমি আজ এত চঞ্চল কেন?
কই না তো!
আমি যে দেখতে পাচ্ছি। যাও তোমরা প্রসাদ নাও।
প্রণাম করে উঠে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, তোর সঙ্গে আমার আবার দেখা হবে ছ’বছর পরে, তার আগে নয়। একটা বীজ ফেলে রাখলুম, অঙ্কুর থেকে গাছ, গাছ থেকে মহীরুহ। তোর জীবনটা আমি নষ্ট করে দিলুম।
নষ্ট করে দিলেন?
হ্যাঁ বাবা। সংসারটংসার তোর দ্বারা হবে না। চেষ্টাও করিস না। বড় চাকরি, গোলদারি ব্যাবসা, ধন, ঐশ্বর্য, যশ, খ্যাতি, প্রতিপত্তি সবই পড়ে থাকবে তোর এলাকার বাইরে। তবে আনন্দে থাকবি, বড় আনন্দে। ভরপুর আনন্দ। কেন এমন করলুম?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
যে-মাটিতে যা হবে তাই তো করতে হবে। এখানে এলি কেন?
তা তো জানি না মা!
আসতে হবে বলে।
তা হলে ছ’বছর পরে কেন দেখা হবে? কেন তার আগে হবে না?
একটু ঘুরেফিরে আয়, জগৎটাকে একটু দেখেশুনে বাজিয়ে নে। ডাব বুনো না হলে তার আঁশ ছাড়ানো যায় না। দেয়ালে মাথা না ঠুকলে মাথা শক্ত হয় না, খালি পায়ে না হাঁটলে পায়ের। তলা শক্ত হয় না। আঙুলে কড়া না পড়লে সেতার বাজানো যায় না। আয়, আয়, জয়ী হয়ে ফিরে আয়।
আমি কি যুদ্ধে চলেছি মা?
তুই সাঁতরে একটা নদী পার হবি। জলে হাঙর আর কামট। ওপার থেকে এপারে আয় অক্ষত শরীরে। ছ’বছর সময়।
তখন আপনি থাকবেন?
তিনি জানেন।
তিনি কে?
যিনি নিজে ধরা না দিলে ধরা যায় না, যিনি নিজে দেখা না দিলে দেখা যায় না। তাই যোগী ধ্যান ধরে হয়ে গিরি গুহাবাসী। নিবিড় আঁধারে মা তোর চমকে অরূপরাশি। যে জানে সে জানে, যে। দেখে সে দেখে।
রিকশা করে আবার আমরা ফিরে এলুম প্রবীরদার বাড়িতে। এইবার বেশ ভয়ভয় করছে। রাত ক্রমশই বেড়ে চলেছে। আজ বরাতে নির্ঘাত তিরস্কার।
প্রবীরদা, আর রাত করিয়ে দেবেন না।
ঊষাদি বললেন, আবার আসবি তো?
খুব ইচ্ছে করবে।
তা হলে আসবি। তোকে আমি গান শেখাব।
প্রবীরদা বললেন, আমরা একটা গানের দল করব।
ঊষাদি বললেন, পঁড়া, তোকে এক শিশি আমের মোরব্বা দিই। দুপুরে খাবি।
ট্রাম চলেছে ঠ্যাং ঠ্যাং করে, ঘণ্টা বাজিয়ে। আমি জানলার ধারে, প্রবীরদা আমার পাশে। কলকাতার রাতের নেশা বেশ জমে উঠেছে। একটি মেয়ে বসে আছে, খোঁপায় গোড়ের মালা। বেলফুলের সুবাসে ট্রামের মন কেমন করছে।
সামনের সিটে দু’হাঁটুর ঠেকনা দিয়ে, শরীরটাকে পেছনে ঠেলে প্রবীরদা বেশ আরামে বসে ছিলেন। ট্রাম একবার থেমে যেই চলতে শুরু করেছে, হাঁটু খুলে প্রবীরদার পা দুটো ধপাস করে নীচে পড়ে গেল। চটিটা ড্যাংগুলির মতো ছিটকে লাফিয়ে উঠে ডিগবাজি খেয়ে উপুড় হয়ে গেল।
প্রবীরদা সামনে টাল খেয়ে ঝুঁকে পড়লেন। সামনের আসনে কপাল ঠুকে গেল। কপালে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, বাপস, পৃথিবীর কোনও কিছুই কি সহজ নয়?
সামনের আসনের ভদ্রলোক ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, কী করছেন মশাই, কুস্তি নাকি?
