পিঠে আঙুলের স্পর্শ পড়ল। ঊষাদি ইশারায় বলছেন, উঠে এসো।
যেকার্পেটটিতে এতক্ষণ কেউ বসেননি, আমরা সেই আসনে সাবধানে বসে পড়লুম। ডান পাশে চিত্রপট। কোনাকুনি বসে আছেন ধ্যানস্থ সাধিকা। সামনে ভক্তমণ্ডলী। করুণাধারার মতো আলো নেমে আসছে। বাইরে উতলা বাতাসে, জানলায় জানলায় ফুলন্ত যুঁই কেঁপে কেঁপে গন্ধ ছড়াচ্ছে। ধূপের ধোয়া মৃতের আত্মার মতো ঘুরে ঘুরে ওপরে উঠছে।
সাধিকা একটি হাত তুলে ইশারায় জানালেন, শুরু করো। এ বেশ ভাল ব্যবস্থা! অনর্থক কোনও বাগাড়ম্বর নেই। ঈশ্বর এই, ঈশ্বর ওই। ধর্ম, ধর্ম। নীরব ধ্যানে তোমরা যে পারো তাকে খুঁজে নাও।
হারমোনিয়মে সুর খেলতে লাগল। তবলা নেই। তাই তেওঁটে তালের টক্করে সুর হোঁচট খাচ্ছে। না। ঊষাদি ধরলেন,
ন তাতো, ন মাতা ন বন্ধুর্ণ নপ্তা,
ন পুত্রো ন পুত্রী ন ভূতত্যা ন ভর্তা।
ন জায়া ন বিদ্যা ন বৃত্তিৰ্মমৈব,
গতিস্তং গতিস্তং ত্বমেকা ভবানী ॥
শ্রোতারা শেষ লাইনটি কণ্ঠে তুলে নিলেন, গতিস্তং গতিস্তং ত্বমেকা ভবানী।
আশ্চর্য এই স্তোত্রটি আমি পুরো জানি, হে ভবানী! আমার পিতা নেই, মাতা নেই, বন্ধু, পৌত্র, পুত্র, কন্যা, ভৃত্য, ভর্তা, জায়া কেউ নেই, আমার বিদ্যা নেই, জীবিকা নেই, তুমি গতি, তুমিই আমার একমাত্র গতি।
ঊষাদির গলা এত সুন্দর! এত সুন্দর! এত স্পষ্ট উচ্চারণ। আমি নেহাতই একটা মেড়া। কিছুই নেই আমার। বিদ্যা নেই, বুদ্ধি নেই, স্বাস্থ্য নেই, পুরুষকার নেই। কে কোথায় কতদূর এগিয়ে বসে আছে, কিছুই জানি না।
ঊষাদি এবার গাইলেন:
ওহে রাজ রাজেশ্বর দেখা দাও,
করুণা-ভিখারি আমি করুণা কটাক্ষে চাও।।
চরণে উৎসর্গ দান করিতেছি এই প্রাণ,
সংসার-অনলকুণ্ডে ঝলসি গিয়াছে তাও।।
বেহাগে এমন একটা গান ধরেছেন, কারুর আর নড়বার চড়বার উপায় নেই। বাইরেটা যত অন্ধকার হচ্ছে ভেতরটা তত উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। চিত্রপটে দেবী হাসছেন। চোখের ভুল কি না জানি না, সাধিকাকে দেখাচ্ছে, আগুনের পুতুল যেন!
১.২৪ তুমি নাহি দিলে দেখা
চারপাশ কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। পুঁতির জালির মধ্যে দিয়ে তাকালে যেমন দেখায় সেইরকম দেখাচ্ছে। কিংবা তারের জালির ওপর বৃষ্টি পড়লে যেমন হয়। এপাশে আমি ওপাশে দৃশ্য। সুর ফোঁটাফেঁটা হয়ে জমে গেছে। ঝিলঝিল করে ঝুলছে, দুলছে বাতাসে।
গান থেমে গেছে। আর একটি গানের সুর খেলছে হারমোনিয়ামে।
স্থির সাধিকা ধীরে ধীরে একটা আঙুল তুললেন। নিমীলিত দৃষ্টি। সুর সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। তিনি খুব মৃদু অথচ ইস্পাতকঠিন কণ্ঠে বললেন, একেবারে শেষের সারিতে বসে যিনি পাপ চিন্তা করছেন, তিনি অবিলম্বে স্থান ত্যাগ করুন।
আমি ছাড়া আর কেউ ফিরে তাকালেন না। আমার এখনও শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়নি। অহেতুক কৌতূহল মনের মাঝে বসে আছে ফুলঝাড়ু হাতে নিয়ে। থেকে থেকেই খোঁচা মারে, দেখ কী হচ্ছে, আশেপাশে তুচ্ছ তুচ্ছ কী হচ্ছে গোল্লা গোল্লা চোখ বের করে তাকিয়ে দেখ। পড়েছিলুম, বৌদ্ধভিক্ষুরা পায়ের বুড়ো আঙুলের দিকে দৃষ্টি রেখে পথ হাঁটেন। দিনকতক সেই চেষ্টা করতে গিয়ে একদিন কেলেমতো ভুসকো একটা ষাঁড়ের পিঠে উঠে পড়েছিলুম। ষাঁড়টা পথের পাশে শুয়ে ছিল। বুদ্ধদেবের কৃপায় রক্ষে পেয়ে গিয়েছিলুম। সাধনার যুগ কীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে!
শেষ সারি থেকে ধুতি পাঞ্জাবি পরা এক ভদ্রলোক মাথা নিচু করে উঠে গেলেন। আশ্চর্য, এই আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা তার হল না। সাধিকাই বা কীভাবে তার মনের কথা পড়ে ফেললেন। সাধনজগতের রহস্য সাধক ছাড়া বুঝবে কে!
পদ্মফুলে এতক্ষণ কোনও সুবাস ছিল না। সাধারণত থাকেও না। হঠাৎ প্রচণ্ড সুবাস ছড়াতে লাগল। সাধিকা আপনমনে মৃদু হাসলেন।
ঊষাদি হারমোনিয়ামে সুর তুলতেই, তিনি আবার আঙুল তুললেন। সুর বন্ধ হল। তিনি মৃদু সুরে বললেন, ওই ছেলেটিকে একটা গান গাইতে বলল।
আমি গান গাইব! গলা ভয়ে শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে।
তিনি বললেন, কোনও ভয় নেই। হারমোনিয়াম টেনে নাও।
আমি বেশ বুঝতে পারছি, মনের ওপর আমার আর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। মন্ত্রে না হোক অন্য কিছুতে বশীভূত। মাতামহের কাছে শেখা সেই গানটি চোখ কান বুজিয়ে ধরে ফেললুম,
বিফল জনম, বিফল জীবন
জীবনের জীবনে না হেরে।
আমি খুঁজি সব ঠাঁই
কোথা তারে পাই,
কে হরে নিল মম মনচোরে ॥
একেবারে পুরো টপ্পা, ভৈরবীতে বসানো। কে বলেছে ভৈরবী সকাল ছাড়া গাওয়া যায় না। রাতেও তো দেখছি বেশ জমে। চোখ বুজিয়েই গাইছি। চাইলেই লজ্জা এসে যাবে। হারমোনিয়ামে হাত ফসকাবে আর বেসুরে গলা খেলবে। একবার ন্যাজেগোবরে হলে, সেন্যাজ আর নাড়ানো যাবে না। মাঝে মাঝে চোখ পিটপিট করে শ্রোতাদের মুখ দেখে নিচ্ছি। না, কারুর মুখে ব্যঙ্গের রেখা পড়েনি। জয় ঠাকুর, উতরে দাও। বিশ্বাসে কী না হয়। মিলায় বস্তু, তর্কে বহু দূর।
গান শেষ করে ভয়ে ভয়ে চোখ মেলে তাকালুম। সাধিকা স্থির, অচঞ্চল। ধ্যানস্থ। সারাঘর নিস্তব্ধ। হঠাৎ তিনি তাকালেন। এমন চোখ আমি কখনও দেখিনি। এই দৃষ্টিতে হিংস্র বাঘকেও বশীভূত করে ফেলা যায়। এক লক্ষ মানুষকে স্থির করে রাখা যায়। আমি যদি অমন দৃষ্টি পেতুম!
সাধিকা আমার দিকে তাকিয়ে ইশারায় কাছে ডাকলেন।
দূরত্ব বেশি না, কার্পেটের ওপর দিয়ে হামা টেনে বেড়ালের মতো সামনে গিয়ে থাবা গেড়ে বসলুম। গোলাপের গন্ধ বেরোচ্ছে। যে-আঙুল তুলে তিনি নির্দেশ দেন, সেই আঙুলটি দুই ভুরুর মাঝে কপালে রেখে বললেন, এইখানে, এইখানে, এইখানে।
