বকেছি বলে তুই কঁদছিস! পাগল ছেলে। ঠিক ধরেছি, তুই এখনও শিশু। চিরকালই তুই শিশু থেকে যাবি। তোকে না চালালে চলতে পারবি না।
ঊষাদি আমার মুখটা বুকে চেপে ধরলেন। আবেগ এমন একটা জিনিস, যখন হঠাৎ আসে তখন মত্ত হাতির মতো ভেতরটা একেবারে তছনছ করে দিয়ে যায়। রোখা যায় না। আমার ভেতরটা ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করতে লাগলুম, তোর হলটা কী! কেন এমন করছিস! মানুষ কেন যে কী করে মানুষ যদি জানত। বুকের ওপর ঊষাদি মুখটা চেপে ধরে আছেন। আমার মনে হচ্ছে।
সে বহুদিন আগের এক অভিজ্ঞতা। সাত দিন নাগাড়ে বৃষ্টি হবার পর খুব রোদ উঠেছে। খাল বিল সব ভেসে মাঠ ময়দান একাকার। আমাদের বাড়ির পাশের ঘাসে-ঢাকা একটা মাঠ ভেসে গেছে। চারপাশে পায়ের পাতা ডোবা জল। মাগুর আর শিঙি ভেসে ভেসে চলেছে। সেই জলে পা ডুবিয়ে খপাত খপাত করে চলেছি। জলের ওপরটা গরম, নরম ঘাসে পা পড়লেই ঠান্ডা জল কী এক নাতিশীতোষ্ণ স্নেহে পা জড়িয়ে ধরছে।
এখন এই অবস্থায় আমার মনে হচ্ছে আমি সেই নরম সিক্ত ঘাসে মুখ থুবড়ে পড়ে আছি। ঊষাদির ভরাট বুক থেকে একটা শীতল স্পর্শ উঠে আসছে, একটা পূর্ণতার অনুভূতি। সমস্ত শরীর শিথিল হয়ে আসছে। এই মহিলার নিশ্চয়ই কোনও ঐশী শক্তি আছে।
ঊষাদি আমার মুখটা উঁচু করে তুলে ধরে ঠোঁটে একটা চুমু খেয়ে বললেন, তোর মুখটা কী মিষ্টি রে! এই বয়সের ছেলেদের মুখ কেমন যেন চোয়াড়ে হয়।
কপালের কাটা জায়গাটা মুছিয়ে দিয়ে এক ফোঁটা আইডিন লাগিয়ে দিলেন। হাতে একটা চিরুনি দিয়ে বললেন, নে, চুলটা আঁচড়ে নে।
হঠাৎ আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে এল একটা প্রশ্ন, আপনি কে?
আমি? আমি ঊষা। পৃথিবীর প্রথম আলো।
হেঁট হয়ে ঝপ করে একটা প্রণাম করে নিলুম।
করিস কী, করিস কী?
আর করিস কী! আমার মন বলছে, তুই এঁকে ধরে থাক। কী পেতে কী পেয়ে যাস, তার ঠিক নেই। পরশপাথর ছুঁইয়ে নে সোনা হয়ে যাবি।
প্রবীরদা নীচে থেকে হাঁক মারলেন, ওরে নেমে আয়।
রিকশা চলেছে ঠুনঠুন করে। একটায় আমি আর ঊষাদি। আর একটায় প্রবীরদা আর হারমোনিয়ম। আজ কী বাতাস ছেড়েছে! সন্ধের কলকাতা যেন পাগল হয়ে গেছে। চারপাশ ভিজেভিজে। কোথা থেকে নীলচে আলো নেমে এসেছে। দোকানের হলদে বাতি সব সবুজ বর্ণ। লোকজন, পথঘাট সব যেন স্বপ্নের ভেতর দিয়ে চলেছে।
ঊষাদির মুখ অসম্ভব গম্ভীর। একটাও কথা বলছেন না। একবার শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, গান জানিস?
আমরা কোথায় যে চলেছি, কিছুই জানি না। শুধু চলেছি। ছায়াছায়া পৃথিবীর পথ দিয়ে তরতর করে বয়ে চলেছি। সামনে একটা বলিষ্ঠ পিঠ, ডাইনে বাঁয়ে ছন্দে দুলছে। দুটো পা একই লয়ে নেচে চলেছে। মাঝে মাঝে ঠুং ঠুং শব্দে বাতাস যেন ঝিমিয়ে পড়ছে।
গোটা তিনেক বাঁক নিয়ে রিকশা একটা পরিচ্ছন্ন রাস্তায় ঢুকে পড়ল। দু’পাশের বাড়িতে বেশ একটা শ্ৰী আছে। নিয়মমতো রং পড়ে। তেমন ভাঙাচোরা নয়। একটা গেরুয়া রঙের বাড়ির সামনে আমরা নেমে পড়লুম। বিশাল গেট। গেটের মাথায় কেয়ারি করা বাগান বিলাস উত্তেজনায় লাল হয়ে আছে। ভেতরে সবুজ ঘাসে ঢাকা বাগান। বাড়িটা ভেতর দিকে লম্বা হয়ে পড়ে আছে। কোনও আড়ম্বর নেই। পরিচ্ছন্নতায় মন ভরে যায়।
ভেতরের হলঘরে বেশ বড় রকমের আয়োজন। একেবারে শেষ মাথায় মার্বেল পাথরে বাঁধানো একটি বেদি। তার ওপর বিশাল একটা চিত্রপট। কোনও সাধিকার। আসন করে বসে আছেন। একটি পায়ের ওপর আড়াআড়ি করে রাখা আর একটি পা। একেই বলে সিদ্ধাসন। বজ্রের মতো চেহারা। মাথায় নটরাজের মতো চুল একপাশে চুড়ো করে বাঁধা। গেরুয়া রঙের শাড়ি। বসে আছেন বাঘছালে। চারপাশে মোমবাতির মতো উঁচু উঁচু চারটে বিজলি বাতি জ্বলছে। বড় বড় পদ্মফুল পায়ের কাছে ছড়ানো। ধূপের ধোঁয়া উঠছে পাকিয়ে পাকিয়ে।
ঘরে আলোর ব্যবস্থা এমনভাবে করা, যেন সবে ভোর হল। বড় বড় কার্পেট টানটান করে পাতা। এরই মধ্যে বেশ ভাল জমায়েত হয়েছে। বৃদ্ধ আর বৃদ্ধার সংখ্যাই বেশি। তরুণ, তরুণী এমনকী বালক বালিকাও রয়েছে। কেউ এতটুকু শব্দ করছেন না, একেবারে ধ্যানস্থ। কে যেন বলছেন চুপ, সব নীরব হয়ে গেছেন। সমুদ্রে ঢেউ উঠেছিল, জাদুদণ্ড ঘুরিয়ে সেই মুহূর্তে স্থির করে দেওয়া হয়েছে।
কে সেই জাদুকর!
সেই চিত্রপটের একপাশে বসে আছেন এক সন্ন্যাসিনী৷ এঁকেই বলা যায় যৌবনে যোগিনী। সিল্কের গেরুয়া। রুক্ষ্ম, এলোচুল। কপালে এত বড় একটা লাল টিপ, ঘষা লেগে ছড়িয়ে পড়েছে। নিমীলিত চোখ। কোথায় কোন জগতে আছে? দেহ যেখানে রয়েছে, মন সেখানে নেই। দেখলেই বোঝা যায়।
ঊষাদি ফিসফিস করে বললেন, পা টিপে টিপে এক পাশ দিয়ে সামনে এগিয়ে চলল। পায়ের গাঁট ভাঙার শব্দ যেন না হয়।
প্রবীরদার হাতে ধরা হারমোনিয়মের আংটায় খটাস করে বিশ্রী শব্দ হল। নিস্তব্ধতায় যেন চিল পড়ল।
ঊষাদি হাঁটু মুড়ে প্রণাম করলেন।
তিনি নিমীলিত দৃষ্টি মেলে দেখলেন। খুব রোদের দিনে জানলার পাখি একটু ফাঁক করলে যেমন একঝলক রোদ আসে, চোখের ফাঁক দিয়ে সেইরকম একঝলক তেজ বেরিয়ে এল। সাধন-ভজন করলে মানুষের কী যে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন হয়!
প্রবীরদার প্রণাম শেষ হতেই আমি নিচু হলুম। আমার মনে হল অনন্তের সামনে মাথা নিচু করছি। নাকে দেবালয়ের গন্ধ। গায়ে কেমন যেন কাঁটা দিচ্ছে। শক্তিশালী চুম্বকের সামনে লোহার টুকরো পড়লে যেমন কাঁপতে থাকে, আমার শরীর সেইরকম কাঁপতে থাকল। মনে হল, আমি যেন বরফের মতো গলতে শুরু করেছি। তিনি একটি আঙুল তুললেন। আমার সমস্ত শরীর সঙ্গে সঙ্গে স্থির হয়ে গেল। কেন জানি না, তার ঠোঁটের কোণে বিদ্যুৎচমকের মতো একঝিলিক হাসিও খেলে গেল।
