ঊষাদি, আমি দোব?
প্রবীরদা বললেন, তুই পারবি না পিন্টু। বড় শক্ত কাজ। জ্যামিতির জ্ঞান থাকা চাই।
চ্যালেঞ্জ।
চ্যালেঞ্জ।
তা হলে হয়ে যাক।
বেশ মজা! যেন চড়ুইভাতি হচ্ছে, নদীর ধারের পোড়ো বাড়িতে! লুচি বেশ গোলাকারই হতে লাগল।
প্রবীরদা বললেন, শিখলি কোথা থেকে?
এই ভো আমার কাজ।
কেন, তোর বাড়িতে কেউ নেই?
আমি আর আমার পিতা, আর সাবেক কালের বিশাল এক বাড়ি!
বলিস কী? তুই তো মহাভাগ্যবান রে! যার কেহ নাই, তুমি আছ তার। আর সংসার ফংসারে ঢুকে ন্যাজেগোবরে হয়ো না। সন্ন্যাসী হয়ে বেরিয়ে পড়ো। শালা, সংসারের নিকুচি করেছে।
সন্ন্যাসী হবার আগে তোরা দু’জনে হালুহকর হয়ে যা। দু’পয়সা রোজগার হবে, হরিদ্বার যাবার গাড়িভাড়াটা উঠে যাবে।
সন্ন্যাসীর আবার গাড়িভাড়া কী রে! সবই তো ফ্রি।
লুচি, লাল লাল আলুভাজা, চা। পেটটা ঠান্ডা হল। প্রবীরদা বললেন, তুমিও চলো আমাদের সঙ্গে। খুব ভাল লাগবে। দেখবে উষী কেমন গান গায়!
ফিরতে দেরি হলে বাবা বকবেন।
আঃ এক ছেলে হওয়ার এই বিপদ। আমি তোমাকে আটটার মধ্যে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসব। যদি বকেন, আমাকে বকবেন।
যেতে তো খুব ইচ্ছে করছে, কিন্তু ভয় লাগছে।
আরে দুর, লজ্জা, ঘৃণা, ভয় তিন থাকতে নয়। আজ একজন সাধিকা দেখবে। তোমার মাথায় একবার শুধু হাত রাখবেন, সারাশরীর জুড়িয়ে যাবে। কী সংসারে পড়ে আছ? গোদা রোটি খাও, হরি কা গুণ গাও। দুটো কাঠ খত্তাল হাতে তুলে নিয়ে প্রবীরদা বাজাতে লাগলেন, আর সারা ঘরময় নেচে নেচে গাইতে লাগলেন, গোদা রোটি খাও, হরিকে গুণ গাও। আমাকে বললেন ধর, ধর। নেচে নেচে গা। দেখবি তোর ভেতর থেকে কী যেন একটা বেরিয়ে আসছে।
আমি যে নাচতে পারি না প্রবীরদা। লজ্জা করে।
আরে ধ্যার ব্যাটা, ছাগলেও নাচতে পারে। তুই মানুষ হয়ে নাচতে পারবি না?
ঊষাদি এসে পড়ায় বেঁচে গেলুম। ঘরের বাইরে আমরা দু’জনেই নির্বাসিত। ঊষাদি একটু সাজগোজ করবেন।
দাদা, ধেই ধেই করে না নেচে, জামাকাপড় পরে নে। দুটো রিকশা ডাক।
ঘরের দরজা ভেজিয়ে দিলেন। প্রবীরদার দু’জোড়া খরগোশ। সবক’টাকে কান ধরে ধরে বাক্সে পুরে দিলেন। চারজন চারটে ফুটো দিয়ে মুখ বের করে সংসারের বিচিত্র হালচাল দেখছে। প্রবীরদা গায়ে সেই সকালের জামাটা চাপিয়ে, চুলে দু’বার আঙুল চালিয়ে বললেন, পিন্টু, তুই বোস, আমি মোড়ের মাথা থেকে দুটো রিকশা ধরে আনি।
রান্নাঘরের সামনে ছোট্ট একফালি ছাদ। ছাদে একটি নিখুঁত তুলসীমঞ্চ। নিকোনো তকতকে। এঁরা মনে হয় বৈষ্ণব। আমরা শাক্ত। চারপাশেই খাড়া খাড়া প্রাচীন বাড়ি। ভাঙাভাঙা বারান্দা। হেলে-পড়া জানলা। একেবারে লাগোয়া একটি বাড়ি বেশ নতুন। হালে রং পড়েছে। ভেতরে। কোথাও রেডিয়ো বাজছে। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য গাইছেন, বাঁকা ভুরু মাঝে আঁকা টিপখানি। জানলায়। জানলায় পরদা ঝুলছে।
হঠাৎ পায়ের কাছে ছোট্ট একটা ইটের টুকরো পড়ল। চারপাশে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেলুম না। আবার একটা ইটের টুকরো এসে কপালে লাগল। বেশ চমকে দেবার মতো লাগা। এবার ওপর দিকে তাকালুম। তিনতলার ছাদের আলসেতে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বয়েস মনে হল যোলো-সতেরো হবে। একমাথা চুল হাওয়ায় উড়ছে। তাকাতেই মেয়েটি হেসে বললে, প্রিয়তমা।
সামান্য একটা শব্দ মানুষকে কীরকম গতিবেগ দিতে পারে। দৌড়ে একেবারে ভেতরে চলে। এলুম। আর ঠিক তখনই ঊষাদি ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন।
কী হয়েছে পিন্টু! তোমার কপালটা কাটল কী করে!
তিনতলার ছাদে মেয়েটি হা হা করে হাসছে প্রেতিনীর মতো।
সেই হাসি শুনে ঊষাদি বললেন, তুমি বুঝি ওই ছোট ছাদটায় গিয়েছিলে?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
মেয়েটি পাগলি। কখনও ভাল থাকে, কখনও উন্মাদ হয়ে যায়। এখন উন্মাদ অবস্থা। এসো দেখি। ইট মেরেছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
তোমাকে আমার বারণ করে দেওয়া উচিত ছিল। দোষটা আমারই। এসো ওষুধ লাগিয়ে দিই। অত বড়লোক, মেয়েটাকে কেন যে উন্মাদ আশ্রমে পাঠাচ্ছে না!
সামান্য একটু কেটে গেছে, ও আর ওষুধ লাগাতে হবে না।
দেখো পিন্টু, আমার অবাধ্য হবে না। অবাধ্য ছেলেদের আমি পছন্দ করি না।
ঊষাদির দৃপ্ত শাসনের ভঙ্গিতে বেশ ভয় পেয়ে গেলুম। ছিপছিপে বেতের মতো লম্বা চেহারা। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। ধারালো মুখ, চোখ, নাক। জোড়া ভুরু। সাদা শাড়ি, সাদা ব্লাউজ। হাতদুটো কী লম্বা, যেন শালুক ফুলের উঁটা। হাত তুলে খপ করে যখন আমার একটা হাত ধরলেন, মনে হল সাপে ছোবল মারতে আসছে।
এদিকে আয়, আমার হাত ছাড়িয়ে যাবার ক্ষমতা কারুর নেই। বৃথা চেষ্টা করিসনি।
সত্যিই তাই। মেয়েদের আঙুলে এত জোর হয় আমার জানা ছিল না। যেন লোহার বেড়িতে হাত বাঁধা পড়েছে। আমি অবাক হয়ে ঊষাদির মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। জ্বলজ্বলে দুটো চোখ। ধনুকের মতো বাঁকা ভুরু। কপালে ছোট্ট একটা সাদা টিপ। শুদ্ধ আত্মার জ্যোতির মতো দুই ভুরুর মাঝখানে ভাসছে। চূর্ণ চুল কপালের প্রান্তরেখায় সামান্য অবাধ্য। পৃথিবী এত সুন্দর? ঈশ্বর তোমার আয়োজন এত পূর্ণ? আবেগে আমার চোখে জল এসে গেল। একইনারীর কত বিচিত্র, বিভিন্ন রূপ। ওদিকে একজন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঢিল ছুঁড়ে কপাল ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। এদিকে একজন পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় চেপে ধরে শাসন করছে।
