প্রবীরবাবু প্রথমেই পাঞ্জাবিটা খুলে ফেললেন। একটা দেখার মতো স্বাস্থ্য। দু-চারবার হাতের গুলি ভেঁজে নিয়ে আমাকে বললেন, তুমি ব্যায়াম করো?
আজ্ঞে না, আমার বাবা করেন।
হা হা করে ঘর-ফাটানো হাসি হেসে বললেন, এ যে দেখি সতীর পুণ্যে পতির পুণ্য। ওসব চালাকি চলবে না, বোজ ব্যায়াম করবে।
আমার বাবার ব্যায়ামে খুব বিশ্বাস। উনি বলেন, যখনই দেখবে শরীর ম্যাজম্যাজ করছে, মন ঝিমিয়ে পড়ছে, তখনই মারবে পঁচিশটা ডন, পঞ্চাশটা বৈঠক।
ঠিক বলেন, ঠিক বলেন। আমি ওঁকেই আমার গুরু করব। জীবনে গুরু চাই পিন্টু, গুরু চাই। সাধন করনা চাহি রে মনুয়া, ভজন করনা চাই। উষী-ই, কোথায় গেলি রে!
প্রবীরবাবু নাচতে নাচতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তখনও গান চলছে, সাধন করনা চাহি রে মনুয়া। জলরঙে আঁকা একটা নিসর্গ দৃশ্য তখন থেকেই বড় টানছে। অমন একটা জায়গায় এখুনি যদি দৌড়ে চলে যাওয়া যেত।
প্রবীরবাবু ওপাশ থেকে ডাকলেন, পিন্টু, চলে আয়।
ডাকটা বড় ভাল লাগল। হঠাৎ যেন খুব কাছাকাছি করে নিলেন। উঁচু ডালে ফল ঝুলছে। কোনওরকমে সেই ফলের নাগাল পেয়ে গেলে যেমন আনন্দ হয়, সেইরকম একটা আনন্দের অনুভূতি হল।
» ১.২৩ গোদা রোটি খাও হরিকে গুণ গাও
পাখির খাঁচার সামনে প্রবীরবাবু থেবড়ে বসে পড়েছেন। আদুড় গা। কোলে একটা খরগোশ, দুটো লেংচে বেড়াচ্ছে পাশে। পাখিরা প্রভুকে দেখে আনন্দে আটখানা হয়ে খুব নাচানাচি করছে। কিছু দূরেই একটা ঘুপচি মতো জায়গায় রান্নাঘর। সেখানে স্টোভ জ্বেলে ঊষাদেবী লাল লাল করে আলু ভাজছেন। কনুই দিয়ে কপালের ওপর ঝরে পড়া চুল সরাতে সরাতে বললেন, পিন্টু, হাত মুখ ধুয়ে নাও। দাদা, তুই ওকে বাথরুমে নিয়ে যা। তুই হাত পা ধুয়েছিস!
দাঁড়া না ধুচ্ছি। তাড়া কীসের?
এই বললি নাড়িভুড়ি জ্বলে যাচ্ছে রে, ঊষী।
আজকে পাখিরা খুব লাট খাচ্ছে রে!
প্রবীরমামা, ওগুলো কী পাখি?
তুমি আমাকে মামা না বলে, দাদা বললে কেমন হয়?
দারুণ হয়।
তাই বলিস। মামা-ভাগনে সম্পর্কটা তেমন ভাল নয়। ঊষা তোর দিদি। দিদিটা কেমন বল?
একেবারে দিদির মতো।
ওঃ টেরিফিক বলেছিস। আমার যদি ওইরকম একটা দিদি থাকত রে!
দিদি নেই বলে তোর কোনও অসুবিধে হচ্ছে রে দাদা?
একটাই অসুবিধে, দিদি রে বলে ডাকতে পারছি না।
আমি দিদি হলে, তোর মতো দাদা পেতুম কোথায়!
প্রবীরদা, কী পাখি?
এ হল মনপাখি রে ভাই, ছটফটানি দেখে বুঝতে পারছিস না। সব যেন ফিল্মস্টার হবার জন্যে লাফালাফি করছে।
ঊষাদি বললেন, ওগুলো হল বদরি পাখি। দুটো থেকে অতগুলো হয়েছে। আরও হবে, তুমি নেবে?
ইচ্ছে থাকলেও নেওয়া যাবে না। বাবা রাগ করবেন।
কেন?
বনের পাখি বনে থাকবে। খাঁচায় থাকবে কেন? একবার না জিজ্ঞেস করে একটা টিয়া পাখি কিনেছিলুম। আমাকে বললেন, এখুনি উড়িয়ে দাও। আমি একটু বায়নামতো করেছিলুম, না ছাড়ব না। আমাকে একটা ঘরে ছ’ঘণ্টা বন্ধ করে রেখেছিলেন। ঘণ্টায় ঘণ্টায় দরজার বাইরে এসে দাঁড়ান। আর জিজ্ঞেস করেন, কী, কেমন লাগছে? প্রথম ঘণ্টা দুয়েক জেদের বসে বলেছিলুম, বাঃ, বেশ লাগছে! তোফা লাগছে। তা হলে সারাজীবন থেকে যাও। এই নাও খানদুয়েক বিস্কুট। কিছু পরে জানলা দিয়ে ছুঁড়ে দিলেন কাগজে মোড়া দুটো লজেন্স। হঠাৎ ছোটবাইরে পেয়ে গেল। চিৎকার করে জানান দিলুম। বললেন, ঘরের কোণে নর্দমা আছে করে ফেলল, কিংবা যেখানে দাঁড়িয়ে আছ সেইখানেই করো। বন্দি-পাখির আবার বাথরুম কীসের! খাঁচার দেড়হাত জায়গাতেই তার ওঠা-বসা, আহার-নিদ্রা, প্রকৃতির কর্ম। তোমাকে তো তোমার মাপ অনুযায়ী বেশি জায়গাই দেওয়া হয়েছে। বড়বাইরে, ছোটবাইরে সব ওইখানেই সারো। সকালে একবার পরিষ্কার করা হবে।
শেষে কী হল? তোমার মা এসে মুক্তি দিলেন!
মা কোথায়? মা তো তার অনেক আগেই স্বর্গে চলে গেছেন।
তা হলে?
তা হলে আর কী, বেলা তিনটের সময় কুঁইকুই করে জানালুম, আমি আর পারছি না। বেলা তিনটে পনেরো মিনিটের সময় মুক্ত পাখি উড়ে চলে গেল উদার আকাশে।
শাবাশ, তোর বাবা তো একটা সাংঘাতিক ক্যারেক্টার। নমস্য মানুষ! কবে যাই বল তো, একবার। প্রণাম করে আসি। উষী, যাবি তুই?
আমি গেলে রাগ করবেন। এসব মানুষ মেয়েদের দু’চক্ষে দেখতে পারেন না।
হ্যাঃ, তুই একেবারে সবজান্তা বাবা। চ না একদিন যাই।
আচ্ছা, সে দেখা যাবে। তুই বোধহয় ভুলে গেছিস দাদা, আজ সাড়ে ছ’টার সময় আশ্রমে গান আছে।
হ্যাঁ রে, তাই তো! সেধেছিস! নে নে তাড়াতাড়ি হাত চালা।
প্রবীরদা উঠতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন, এতক্ষণ পেছন দিকে গা ঘেঁষে যে-খরগোশটি বসে ছিল, সেটি বিনা কাজে বসে ছিল না। চিবিয়ে চিবিয়ে কাপড়ের কাছাটি শেষ করে দিয়েছে।
এই দেখ ঊষী, তোর বিক্রম কী করেছে! কী বলতে ইচ্ছে করে বল! বাড়ির একটা জিনিসও আর আস্ত থাকবে না।
তোকে সকাল থেকে বলছি, ওদের ঘাস ফুরিয়েছে।
তা বলে, ও ব্যাটা আমার কাছাটা ঘাস ভেবে চিবোবে!
ওর সে বিচার থাকলে খরগোশ হবে কেন বল! রেখে দে, আমি কেটে বাদ দিয়ে সেলাই করে দেব।
হ্যাঁ, ওই তো তুই শিখেছিস। কেটে বাদ দোব। আমার সমস্ত ধুতি এইভাবে দশ থেকে আট, আট থেকে সাত, শেষে কৌপিন হয়ে যাবে।
ভালই তো, তুই না বলিস সন্ন্যাসী হয়ে যাবি! লুচিগুলো বেশ গোল করে বেলে দে তো।
