প্রবীরবাবু থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে পেছন ফিরে তাকালেন, কী হে, পেছিয়ে পড়লে কেন?
পা চালিয়ে পাশাপাশি আসতেই আমার কাঁধে হাত রাখলেন পরম বন্ধুর মতো। রাস্তা ক্রমশই দু’পাশে চেপে আসছে। ক্রমশই যেন কলকাতার জঠরে প্রবেশ করছি। আলো-বাতাস কমে আসছে। এই শহরে মানুষ কীভাবেই না বাস করে। প্রবীরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, কী, খুব কষ্ট হচ্ছে?
আজ্ঞে না, আমার হাঁটা অভ্যাস আছে।
হ্যাঁ, পুরুষমানুষ, সবরকম অভ্যাস রাখবে। জীবন তা হলে দেখবে, তোমার কাছে হেরে গেছে। যত ব্যথা পাই, তত গান গাই, গাঁথি যে সুরের মালা, ওগো সুন্দর নয়নে তোমার নীল কাজলের মায়া। শরীরটাকে একেবারে পাথরের মতো লোহার মতো করে ফেলবে। কোনও কিছুর প্রত্যাশা রাখবে না। দুঃখ পেলে হেসে উঠবে, সুখ দেখলে সরে আসবে। শূন্য সংখ্যাটার কিছু নেই, একেবারেই শূন্য, অথচ সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। শূন্য না হলে দর্শক হবে না, শতক হবে না, সহস্র হবে, অযুত, নিযুত কিছুই হবে না। আমি সেই শূন্য রে ভাই। মহাশূন্যে ভাসছে জগৎ, ঘুরছে তারা, ঘুরছে চন্দ্র, শূন্য আছে সৃষ্টি আছে, গোলেমালে মাল রয়েছে, গোল ছেড়ে মাল বেছে নে।
এই গলির মধ্যেও ছোট্ট একটা মুদিখানা মতো রয়েছে। প্রবীরবাবু থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, দাঁড়াও দু’পাতা চা কিনে নিই। বাড়িতে আছে কি না কে জানে? চা না খেলে আচ্ছা ঠিক জমবে না।
প্রবীরবাবু যে-চা কিনলেন, আমি জানি সে চা খাওয়া ভীষণ শক্ত। কেমন একটা বুনো বুনো গন্ধ বেরোয়। আবার আমার কাঁধে হাত রেখে হাঁটা শুরু হল। রাস্তা বর্শার ফলার মতো ক্রমশই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠছে। অবশেষে আমরা একটা ভাঙাভাঙা দরজার সামনে এসে দাঁড়ালুম। আমালাগা ইটের দোতলা হুমড়ি খেয়ে রাস্তায় নেমে আসতে চাইছে। বাড়িটা এমনই বসে গেছে। ওপর দিকে তাকালেই দোতলার জানলা। খয়া খয়া কাঠের পিঞ্জর। সারা বাড়িটার যেন যক্ষ্মা হয়েছে। সারা দিন রাত নীরবে কেশে চলেছে।
দরজায় বিরাট বড় একটা কড়া। নিজের ভারে হেলে পড়েছে। কোনদিন উপড়ে চলে আসবে। প্রায় অসংলগ্ন সেই কড়া ধরে প্রবীরবাবু ঠকাস ঠাস করে তিনবার শব্দ করলেন। এ কড়া তেমন মুখরা স্ত্রীর মতো বাজে না, উদাসী বৃদ্ধার মতো হরি দিন তো গেল’র সুরে জরাজীর্ণ বিদায়ী ব্যথায় বাজে থেমে থেমে।
প্রবীরবাবু ডাকলেন, ঊষা, ঊষা।
সেই ডাক চারপাশের নোনা-লাগা বাড়িতে ধাক্কা খেয়ে ধ্বনিতে, প্রতিধ্বনিতে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। বহু ওপরে এক টুকরো আকাশে আলোর পাখনা উড়ছে। হড়াস, একটা শব্দ হল। দরজার হুড়কো সরল। ইনিই কি ঊষা! প্রথমে নজরেই প্রেমে পড়ে যাবার মতো অবস্থা। কদর্য প্রেম নয়, শুদ্ধ, সাত্ত্বিক প্রেম। ঊষা না হয়ে, আমার মায়ের তুলসী নামটা যদি এঁকে দেওয়া যেত! অবশ্যই আমার পিতৃদেবের অনুমতি নিয়ে।
প্রবীরবাবু একগাল হেসে বললেন, দেখ ঊষা, কাকে এনেছি!
প্রবীরবাবু এখনও আমার কাঁধে হাত রেখে পঁড়িয়ে আছেন। আমরা যেন দুই মানিকজোড় মাঝরাতে মাল খেয়ে বাড়ি ফিরছি। কর্পোরেশনের হেলথ অফিসার আমাদের পরিদর্শন করছেন। প্রবীরবাবুকে আমার আর মামা বলতে ইচ্ছে করছে না, দাদা বলতে ইচ্ছে করছে।
ঊষাদেবীর ঘাড়ের কাছে এলো খোঁপা। আয়তন দেখলেই বোঝা যায়, খুলে দিলেই পাহাড়ি নদীর মতো কোমর ছাপিয়ে লাফিয়ে পড়বে। সাদা শাড়ি, চওড়া নীল পাড়। হালকা নীল ব্লাউজ। দেহ আর মুখের গড়ন দেখার মতো। এ যেন নালন্দা আবিষ্কার। কোনারকের মন্দির থেকে অপরাহু বেলায় নেমে এসেছেন অপরূপা। কলকাতা ছুঁড়লে এমনি সব বিস্ময় কত যে পাওয়া যেতে পারে, কেউ জানে না।
প্রবীরবাবু কাঁধ থেকে হাত নামিয়ে বললেন, আমার একমাত্র বোন ঊষা। পৃথিবীতে আমার আর কেউ নেই। আমি আর ঊষা। ঊষী, এ হল আমার বাল্যবন্ধু জয়নারায়ণের ভাগনে। ছেলেটা বড় ভাল, ঠিক তোর মতো।
আগে তোমরা ভেতরে এসো তো। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কী করছ?
প্রবীরবাবু ঢুকতে ঢুকতে বললেন, ঊষী, আমাদের খুব খিদে পেয়েছে, জল-তেষ্টা, চা-তেষ্টা সব একসঙ্গে পেয়েছে। এই নে চা।
এঃ দাদা, তুমি এই চা নিয়ে এলে। এ চা খেতে পারবে না তোমার–কী নাম? নামটা তো জানা হল না।
প্রবীরবাবু বললেন, তোমার নাম?
পিন্টু।
বাঃ, ফাসক্লাস নাম। খুব পারবে, খুব পারবে, ও তো আর বর্ধমানের মহারাজার বাড়িতে আসেনি। আমরা যখন খেতে পারি, ও-ও পারবে।
বাড়ির নীচের তলাটা একেবারেই জখম হয়ে গেছে। আহত অন্ধকার যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত সৈনিকের মতো তালগোল পাকিয়ে পড়ে আছে। ভাঙা উঠোন থেকে একটা নড়বড়ে কাঠের সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে। বারান্দায় ঝলঝল করছে কাঠের রেলিং। কিচ কিচ করে কোথায় একগাদা পাখি ডাকছে।
দোতলায় উঠতেই প্রাণটা ভরে গেল। দেবালয়ের মতো পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন। ভারী মিষ্টি একটা গন্ধ। নাকে এল। ধূপ হতে পারে। বারান্দার শেষকোণে মাঝারি আকারের একটা তারের খাঁচা। খাঁচায় গোটা দশেক ছোট ছোট রঙিন পাখি, উড়ছে, দোল খাচ্ছে। এদেরই বোধহয় ক্যানারি বলে। একটা ফুটফুটে সাদা খরগোশ, থেবড়ে বসে আছে আপন মনে। মাঝে মাঝে মুখ তুলে পাখি দেখছে।
ঊষা বললেন, তুমি জুতোটা এইখানে খুলে রাখো। দাদা, তোমরা ঘরে গিয়ে বোসো।
ঘরে খাটফাট কিছুই নেই। অনাবশ্যক কোনও ফার্নিচার নেই। একপাশে সুন্দর একটা মাদুর সমান করে পাতা। তার ওপর ঝকঝকে একটা জলচৌকি। পাশেই নকশা করা ফুলদানিতে ছোট বড় অসংখ্য তুলি। গোটাকতক পরিষ্কার প্যালেট। দেয়ালে স্মরি সারি ছবি ঝুলছে, জল রং, তেল রং। আর একপাশে, আর একটা ছোট মাদুর। তার ওপর একটা হারমোনিয়ম, পাশেই একটা তানপুরা ঝুলছে। ঘরের আর এক কোণে বেশ বড় আকারের ফুলদানিতে রজনীগন্ধার গুচ্ছ গোঁজা। ফুলের গন্ধ সারাঘরে প্রজাপতির মতো ভাসছে।
