তাও তো বটে। তা হলে তুমি থাকো, আমি যাই।
আমি যাই মানে?
আমি চলে যাই। এ জগৎটা আর আমার ভাল লাগছে না। এ যেন সব সঁাড়ে বসা টিয়া। রাধেকৃষ্ণ বলো পাখি, কৃষ্ণ কথা বলো। এখানে আমার কিছু করার নেই। বুঝলে ভাগনে। এ হল গিলটি সোনার জগৎ। আর জয়! জয়কে আমি চিনি। কল্পলোকের মানুষ। ওর কথায় যে নাচবে তার ভরাডুবি হবে। যখন যা নিয়ে মাতবে তখন একেবারে চূড়ান্ত করে ছেড়ে দেবে। তারপরে নেতিয়ে পড়বে। ভোরের ফুলের মতো। ফুটল যখন, বাগান মাত, তারপরেই ন্যাতা। তুমি এখানে ঘুরেফিরে বেড়াও। খেয়াল হলে ডেকে পাঠাবে। ঘুরে ঘুরে ভুইতারা দেখো।
আমারও আর ভাল লাগছে না। চলুন পালাই।
তা হলে তো কোনও কথাই নেই। তোমাকে আমার বাড়িতে নিয়ে যাব। আমার বোন বড় সুন্দর গান গায়। কিন্তু আগেই বলে রাখছি, আমরা বড়লোক নই। ভাঙাচোরা বাড়ি। অন্ধকার। তেমন বাতাস খেলে না।
প্রবীরমামা, আমরাও বড়লোক নই। যাবার আগে মামাকে কোনওভাবে জানিয়ে যেতে পারলে শান্তি পাওয়া যেত।
দাঁড়াও, ওই দেখো দামুবাবু আসছে।
দৈত্য দামু চাবি ঘঘারাতে ঘোরাতে, শিস দিতে দিতে আসছেন। প্রবীরবাবু বললেন, এই যে স্যার, শুনছেন?
দামুবাবু থেমে পড়ে, ভুরু কুঁচকে, টেরিয়ে তাকালেন। আর্টের চাহুনি। বলুন।
আজ্ঞে, জয়বাবুর সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই।
কেন? আর কোনও একা নেওয়া হবে না।
আমরা একা নই। আমি জয়ের বন্ধু, আর এ হল ভাগনে।
সিনেমা লাইনে অনেক ভাগনে-ভাগনি ঘোরে। ও কায়দায় সুবিধে হবে না।
আরে কী আশ্চর্য, আচ্ছা বেহেড মানুষ, আমরা তো একসঙ্গে জয়ের গাড়িতে এলুম, আপনি এরই মধ্যে ভুলে গেলেন। ব্রাহ্মী শাক খান।
আরে খুব লম্বা চওড়া বাত বলছ ছোকরা। গলা টিপে তোমার দুধ বের করে দেব।
প্রবীরবাবু বললেন, তা তুমি পারো। তোমার যা চেহারা। আমি তো ছারপোকা।
তবে, শালা অত ফুটুনি কীসের?
তোমার শ্যালক হবার ইচ্ছে নেই গো ভীম ভবানী। আমার ভগিনী তো তোমার কোলের শিশু।
টেম্পার যা চড়েছে থামাতে না পারলে প্রবীরমামা ছাতু। কিছু না, দামুবাবু একবার ওপর দিয়ে গড়িয়ে গেলেই রোড রোলারের কাজ হবে। আমি খুব আদুরে গলায় বললুম, দামুমামা, আমার মামা সত্যিই মামা। তাঁকে বলবেন, আমরা চলে গেছি।
কথাটায় বেশ কাজ হল। এতগুলো মামা একসঙ্গে ছেড়েছি। অনেকটা ‘রবিমামা দেয় হামা গায়ে রাঙা জামা ঐ’র মতো। সবেতেই মা। মা দিয়ে মাত।
দামুবাবু নরম হয়ে বললেন, তোমাকে প্রথম থেকেই আমার চেনাচেনা মনে হচ্ছে।
আজ্ঞে তা তো হবেই। আমার আর মামার মুখ প্রায় একই রকম।
আই সি, আই সি। তা গুরুজি তো এইমাত্র বেরিয়ে গেলেন।
প্রবীরবাবু আঁতকে উঠলেন, অ্যাঁ, কোথায় বেরোলেন?
টাকার খোঁজে। সিক্স পাওনাদার ঘুরঘুর করে ঘুরছে, হ্যান্ডসরা সব বসে আছে, আগাম টাকা না। দিলে কেউ পা করবে না। যে-বন্ধুর টাকা দেবার কথা ছিল, সে বলছে, সিনেমা করবে না। এ সব
ভেতরের কথা। বাইরে যেন লিক না করে। মালুম!
হাঁ মালুম, কিন্তু গেল কোথায়?
এক মহারাজের বাড়ি। টাকা না পান, কিছু মার্বেল পাথর তো পাবেন। একটা মেঝেতে ছবি দশ হাত এগোবে। লাঃ লা ট্রালা, ট্রালা। দামুবাবু গুরুজির রেস্ত ফুরিয়ে যাবার আনন্দে গান গাইতে গাইতে এগিয়ে চললেন।
প্রবীরবাবু বললেন, তোমায় বলেছিলুম না, জয় বড় বিচিত্র চরিত্রের ছেলে। শিল্পী, তাই লোকে। বলে আত্মভোলা, তা না হলে বলত স্বার্থপর। সময়ে ও সবকিছু ভুলে যেতে পারে, স্ত্রী, পুত্র,
পরিবার, এমনকী নিজের মঙ্গল অমঙ্গল।
প্রবীরমামা, আমরা তা হলে এখন কী করব?
এ জগৎ থেকে পালিয়ে চলো। এ আমাদের জায়গা নয়। নাম-পাগলদের আখড়া। চলো তোমাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যাই। মুখ দেখে মনে হচ্ছে তোমার খুব খিদে পেয়েছে।
তা পেয়েছে।
আমার পকেটে পয়সা থাকলে তোমাকে দোকানে খাওয়াতুম। না না খাওয়াতুম না। দোকানে খাওয়া খুব খারাপ। বাইরে খাওয়া উচিত নয়। শরীর খারাপ হয়। আমাদের বাড়িতে চলো।
উনি যদি ফিরে এসে আমাদের খোঁজ করেন।
তুমিও যেমন! তোমার মামাকে তোমার চেয়ে আমি ভাল চিনি। চলে এসো, চলে এসো।
ডান দিকে একটা খড়ের গাদায় আগুন লাগিয়ে কোমরে গামছা বাঁধা একদল লোক আগুন আগুন বলে চিৎকার করছে। নকল দাড়িগোঁফ লাগানো এক ভদ্রলোক নাচতে নাচতে বলছেন, সব জ্বলে যাক, পুড়ে যাক, শ্মশান হয়ে যাক। আহা তোমার কী রূপ, আহা তোমার কী রূপ, লকলক করছে, লকলক করছে।
এ আবার কী ব্যাপার!
প্রবীরবাবু বললেন, শুটিং হচ্ছে শুটিং।
আগুন লাগলে এইভাবে কেউ নাচে।
বাস্তবে না নাচলেও সিনেমায় নাচতে হয়।
একটা ঠ্যালাগাড়ির ওপর ক্যামেরা। খড়খড় করে ফিল্ম ঘোরার আওয়াজ হচ্ছে। দু’জন মানুষ গাড়িটাকে ধীরে ধীরে ঠেলে নিয়ে চলেছেন। আগুনের হলকায় উত্যক্ত হয়ে একগাদা পাখি গাছের ডালে ডালে উড়ছে আর ডাকছে।
আমরা রাস্তায় এসে পড়লুম। চারপাশে বড় বড় গাছ। রাস্তাটা বেশ ছায়াছায়া, নির্জন। হাঁটতে হাঁটতে আমরা ট্রাম ডিপোর কাছে চলে এলুম। প্রবীরবাবু বীরের মতো হাঁটছেন। গুনগুন গাইছেন, মুক্তির মন্দির সোপান তলে, কত প্রাণ হল বলিদান।
আবার আমরা সকালবেলার সেই দুধ পড়ে যাবার জায়গায় চলে এলুম। ইতিমধ্যে সময় সরে গেছে। দীর্ঘ ছায়া নেমেছে। চারপাশের জেল্লা অনেক কমে গেছে। বড় রাস্তা ছেড়ে আমরা একটা ছোট রাস্তায় পড়েছি। হঠাৎ মনে হল, আমি কী কারণে বোকার মতো প্রবীরবাবুর বাড়ি চলেছি। চেনা নেই, জানা নেই। ভদ্রলোক শিল্পী, দু’-একটা ছবি দেখা যাবে। একসময় আমার খুব শিল্পী হবার ইচ্ছে ছিল। আর্ট কলেজে ভরতি হবার জন্যে পাগল হয়েছিলুম। পিতা বলেছিলেন, তোমাকে বড়লোকি নেশায় পেয়েছে। গরিবের ঘোড়া রোগ। না খেয়ে মরার ফিকির।
