হ্যাঁ, বুঝলুম বই কী। হীনবল ভারতীয়ের ভাগ্যের সঙ্গে সহজ রফা। পুরুষকারের অভাব। ওর সঙ্গে যোগ করুন তৃণাদপি সুনীচেন, তরুরোহপি সহিষ্ণুনা, নেংটি পরে লটকে বেড়াই, মুখে কেবল কথার বড়াই। যা বলেছি তাই হবে। নো ট্রাকস্টার অ্যান্ড হাকস্টার উইথ ফেট।
তুমি কথায় কথায় বড় ইংরেজি বলো সায়েববাচ্চার মতো। ওই ভাষাটা আমি আবার তেমন বুঝি না।
এ হল তাদের ভাষা যারা কর্মযোগে বিশ্বাস করে। যারা লেংচে চলে না। মার্চ করে।
সবই বুঝলুম হরিশঙ্কর, তবে কি নাতিটার পেট ভাল নেই, এতগুলো পদ রাঁধবে, আর আমরা খেলিয়ে খেলিয়ে খাব, সেটা কি ঠিক হবে?
ওর জন্যে আমি বেলের মোরব্বা তৈরি করব।
আহা বড় ভাল জিনিস! আমাকেও দিয়ো কিঞ্চিৎ, না কোরো বঞ্চিত। তা হলে এখন একটু চা হোক। চিনির বদলে আমাকে গুড় দিলেও চলবে।
কেন, চিনির অভাব আছে নাকি? আপনার মেয়ে নেই, ঠিক আছে। নেই তো নেই, আমি তো আছি!
অ্যাঁ, তুমি এত বড় কথা বললে? আমার পুত্র-পুত্রবধূ যে কখনও এমন কথা বলতে পারলে না। পায়ের নীচে এখনও তা হলে জমি আছে! হরিশঙ্কর, জমি তা হলে আছে?
আলবাত আছে। আপনার মেয়েকে আমি শ্রদ্ধা করি। আজ নেই বলে বলছি না, থাকলেও বলতুম। সে ছিল দেবী। আপনি তার কিসুই জানেন না। আনইয়ুজুয়াল ডটার অফ নট সো ওয়ার্দি এ ফাদার।
একটু বাংলা করে বলো হরিশঙ্কর। শুনতে বড় ভাল লাগছে। চোখে জল এসে যাচ্ছে।
বাংলা করলে শুনতে আর তেমন ভাল লাগবে না।
তা হলে ইংরিজিই থাক।
হ্যাঁ, সেই ভাল, হোয়ার ইগনোরেন্স ইজ ব্লিস দেয়ার।
উঃ, সব ভাল ভাল কথাই তুমি ম্লেচ্ছ ভাষায় বলছ, আচ্ছা তোমার সংস্কৃত আসে না?
আসে, তবে ইংরিজির মতো নয়। ইংরিজিতে বেশ মোলায়েম করে গালাগাল দেওয়া যায়।
তুমি কি তা হলে এতক্ষণ গালাগাল দিচ্ছিলে?
কুচো নিমকি আর চা দিয়ে স্টার্ট করা যাক। কী বলেন?
ওঃ ফাসক্লাস! কালোজিরে দেওয়া?
হ্যাঁ পূর্ণাঙ্গ জিনিস।
নাতিটা ডালবড়া।
পিতৃদেব ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। দাদু আমার দিকে তাকিয়ে ছেলেমানুষের মতো হেসে বললেন, কী বুঝছ পাস্তুরানি?
বেশ জমেছে।
এরকম জামাই তুমি ভূ-ভারতে পাবে না। আনন্দ, আনন্দ। আজ যেন আনন্দের হিল্লোল বইছে! বেটি কোন দিন যে কী করে দেয়! এই কাদাচ্ছে, এই হাসাচ্ছে! এই রাজবেশ, এই কৌপীন। এই মহাভোজ, এই উপবাস।
তবে সেই সে পরমানন্দ
যে জন পরমানন্দময়ীরে জানে
সে জন না যায় তীর্থ পর্যটনে।
খুব জোর গান ধরেছিলেন। বিভোর ভাব। গায়ে হাফহাতা পাঞ্জাবি। পইতেটি সামান্য বেরিয়ে আছে।
দরজায় পিতৃদেবের মুখ দেখা গেল, স্টপ স্টপ, পরমানন্দময়ী হরিমটর ছাড়া আর কিছুর ব্যবস্থা রাখেন না, উঠে পড়ুন। এখন আর মিউজিক নয়, মাসলসের খেলা চলবে। বাটনা বাটতে পারেন?
ভাবজগৎ থেকে দমাস করে বাস্তবজগতে আছাড় খেয়ে মাতামহ কেমন যেন হয়ে গেলেন। তবু হাসি-হাসি মুখে বললেন, ওই শিলে ফেলে নোড়া দিয়ে ঠুকে ঠুকে তারপর গড়াগড়ি করে। মাখামাখির ব্যাপার তো! জীবজগতে অহরহ যা চলছে? আহা, জাতা ঘুরতে দেখে কবীর দাস একদিন কেঁদে ফেলেছিলেন। তার দুটো ফাটার মধ্যে পড়লে কেউ কি অক্ষত থাকবে রে ভাই,
চলতি চক্তি দেখিকে দিয়া কবীরা রোয়
দুই পট ভিতর আয়কে সবিত গয়ান কোয়।
এ আপনার জাঁতাকলে জীবজগত নয়। হলুদের কথা হচ্ছে। চলে আসুন। চা ছাকতে পারেন?
তা আর পারব না! কিন্তু তুমি যে বললে সেই কালোজিরে দেওয়া কুচো নিমকির কথা! ভুলে গেলে নাকি?
আপনার ওই পরমানন্দময়ীর জগৎ ছেড়ে বেরোতে পারলেই সর্বপ্রকার জীবানন্দ পাবেন।
তুমি বড় নাস্তিক হে হরিশঙ্কর, কিছুতেই তোমার বিশ্বাস আসে না!
আমি কালাপাহাড়; বলে পিতাঠাকুর অদৃশ্য হলেন। মাতামহ গেলেন চা ছাঁকতে।
সেই কুচো নিমকি আছে আলমারিতে। আংটায় ঝুলছে সাত লিভারের থান্ডার লক। বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পারিনি। পিতার অফিসের বন্ধুর স্ত্রী এক জার আমের মোরব্বা করে পাঠিয়েছিলেন। ফিনকি ফিনকি করে কাটা, কিসমিস টিসমিস দেওয়া বড় সুস্বাদু বস্তু। রাতে একটু চাখার পর স্বভাবটা কেমন যেন বেড়ালের মতো হয়ে গেল। হেঁক ছোঁক করে মরি। কোনও কাজেই মন বসে না। ঘুরি ফিরি আমের মোরব্বা। সেই কথামৃতের কথা: ঘুরছে ফিরছে, রান্না করছে, চুল বাঁধছে, মন পড়ে আছে উপপতির দিকে। দুপুরের দিকে একবারই একটু নিয়েছিলুম। বেশি না, চামচে দু’-এক। ধরা পড়লুম রাতে। মোরব্বার ওপর তখন বিদিগিচ্ছিরি রুটি আর কুমড়োর ছক্কা চেপে বসেছে। মোরব্বার জারে কোথায় একটা কী চিহ্নফিহ্ন করা ছিল। খুলতেই তিনি স্থানচ্যুত হবেন। জাগতিক দিক থেকে ব্যাপারটা খুবই সামান্য; কিন্তু নৈতিক দিক থেকে অসামান্য।
তুমি নিয়েছ?
যথারীতি উত্তর, আজ্ঞে না তো।
আজ্ঞে না-তো-ও-ও!
আজ্ঞে হ্যাঁ। একটুখানি। এই এতটুকু।
মুখ যতদূর সম্ভব কাচুমাচু। সামনে আয়না থাকলে ছিঁচকে চোরের মতোই দেখাত। মাথায় বাবরি, অথচ চোর। সেই পাড়ার প্রসন্নদার মতো। গগলস পরে অফিসের টাইপরাইটার চুরি করেছিল। সুট আর ঝকঝকে জুতো, চোখে রঙিন চশমা, এদিকে কোমরে কাছি বাঁধা। শ্রীঘরে চলেছে বড় রাস্তা দিয়ে। সামনে পেছনে দুই সেপাই চলেছে হেলেদুলে, খইনি মলতে মলতে। একই তো ব্যাপার। বললে, কাঁপতেন চুরি করে মরেছে। পিতৃদেব বলবেন, ব্যাটার মাথায় চাচরঅ চিকুরঅ এদিকে মোরব্বা চুরি করে মরেছে। কদমছাট কি ন্যাড়া চোরে সহ্য হয়। ননিচোরা কৃষ্ণকে দেবতা বলে রেসপেক্ট করা চলে, বস্ত্রহরণ, বাঁশি বাজন, রাধাভিসার, ক্ষমণীয় অপরাধ কারণ তিনি এক গীতাতেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে চিতপাত করে দিয়েছেন। তুমি বাছা কী করেছ! কিন্তু কেমন করে। ধরলেন?
