আমি বলি, আপনি কি বিয়ে করেছেন?
লোকটি বলে, জি, স্যার; পরথম স্ত্রীর মিরতুর পর তিন বছর আগে আবার বিবাহ করছি।
আমি বলি, আপনার স্ত্রী কার সাথে ঘুমায়?
লোকটি বলে, নাউজুবিল্লা, আমার ইস্তিরি আর কার লগে ঘুমাইব, আমার লগেই ঘুমায়।
আমি বলি, কিন্তু আপনি তো এখানেই থাকেন, আপনার স্ত্রী কোথায় থাকে?
লোকটি বলে, দিনাজপুরের বীরগঞ্জের রহমতপুরে।
আমি বলি, সেখানে সে কার সঙ্গে ঘুমোয় আপনি জানেন?
লোকটি বলে, আল্লা জানে, স্যার।
আমি বলি, আল্লা জানলেই চলবে, আপনার জানতে হবে না?
লোকটি বলে, হের আরও চাইরখানা বিয়া অইছিল, স্যার, হের লগে আর কে ঘুমাইতে চাইব?
আমি হাসতে থাকি।
লোকটি বলে, আমি একটা কথা কইতে চাইছিলাম, স্যার, সাহস অয় নাই।
আমি বলি, বলুন।
লোকটি বলে, আমার আগের ঘরে একটা মাইয়া আছিল, স্যার, টেনে পড়ে।
আমি বলি, ঠিক আছে, বইপত্র লাগলে আমি কিনে দেবো।
লোকটি বলে, আমার মাইয়াটা খুব ভাল, স্যার, ফাস্ট অইছে ক্যালাশে, কিন্তু মাইয়াটার একটা অসুখ হইছে।
আমি বলি, দীন মুহাম্মদ সাহেব, কারো অসুখের কথা শুনতে আমার ইচ্ছে করে না, কোনো সুখের কথা থাকলে বলুন।
লোকটি বলে, গরিবগো কোন সুখের কথা নাই, স্যার।
আমি বলি, তাহলে আপনি যান, গরিবদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
লোকটি ভয় পেয়ে বেরিয়ে যায়। লোকটি তো ভয় নাও পেতে পারতো, কিছু কথা শুনিয়ে দিতে পারতো আমাকে, সিনেমায় যেমন গরিবরা কথা শুনিয়ে দেয়; আমি ওর এমন কী করতে পারতাম? ওকে বরখাস্ত করতে পারতাম না। লোকটি হয়তো ভাবে ওকে আমি বরখাস্ত করতে পারি, কিন্তু আসলে আমি পারি না। তবে লোকটি যে ভয় পেয়েছে দেখতে আমার ভালো লাগে। মানুষ ভয় পেয়ে কীভাবে বেরোয় আমি তা দেখতে থাকি, ভয় পেয়ে বেরোনোর দৃশ্য দেখতে আমার ভালো লাগে; আমার ইচ্ছে করে লোকটির মতো ভয় পেয়ে প্রত্যেক ঘর থেকে বেরোতে। দেখতে পাই আমি আমার কেরানিদের ঘরে গেছি, তারা আমার দিকে তাকাচ্ছে না, আমি স্যার, স্যার করে তাদের ডাকছি, কেউ আমার দিকে তাকাচ্ছে না, শেষে একজন আমার দিকে তাকিয়ে বলছে, পরে আইসেন, এখন সময় নাই; তার কথা শুনে আমি ভয় পাই, ভয় পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসি, বেরোনোর সময় আমি ভুল জায়গায় পা ফেলি, পা থেকে আমার স্যান্ডল খুলে পড়ে যায়। এখন আমি যদি নিচে দীন মুহাম্মদের ঘরে যাই, ঘরে গিয়ে বলি, আমি ভালো নেই, আর দীন মুহাম্মদ বলে কারো ভালো না থাকার কথা শুনতে তার ভালো লাগে না, সে যদি আমাকে ঘর থেকে চলে যেতে বলে, তাহলে কি আমি ভয় পাবো, ভয়ে ভয়ে তার ঘর থেকে বেরিয়ে আসবো? আমার ভয় পেতে ইচ্ছে করে, আমার ভয় পাওয়ার সুখ পেতে ইচ্ছে করে; আমার দীন মুহাম্মদ হ’তে ইচ্ছে করে।
আমি কি একটু বেশি পান করেছি? আগে কখনো এতোটা পান করি নি পান করলেই ভেতর থেকে এভাবে ঠেলে বেরিয়ে আসতে হবে? ভেতরে একটা প্রচণ্ড আলোড়ন চলছে, মনে হচ্ছে ভেতরের সব কিছু ঠেলে বেরিয়ে আসছে; কিন্তু আমি বেরোতে দেবো না বলে ঠিক করি, তবে চাপ তীব্র হয়ে উঠতে থাকে। প্রচণ্ডভাবে বমি আসছে ভেতর থেকে; আমি কি বাথরুমে গিয়ে সিং ধরে বমি করতে শুরু করবো? কতো বছর আমাকে সিংক ধরে গো গো গলগল করে বমি করতে হবে? আজ রাতে যদি বমি শেষ না হয়? যদি আগামীকাল, পরশু, আর পরের রাত ও দিনগুলো, দুপুর ও মধ্যরাতগুলো, মাসগুলো, বছরগুলো ধরে আমার ভেতর থেকে বমি উৎসারিত হতে থাকে? আমি বাথরুমে যাই না; টলতে টলতে বিছানায় গিয়ে শুই, অমনি ভেতর থেকে বমির ধারা বেরিয়ে আসতে থাকে। গলগল করে বেরোনো বমিতে বালিশ ঢেকে যায়, বিছানা প্লাবিত হয়ে যায়; আমি দেখতে থাকি আমার বমিতে শহরের সমস্ত পথ প্রাবিত হয়ে যাচ্ছে, সব যানবাহন ভাঙা বাস আর পতাকাশোভিত মার্সিডিজ, রিকশা আর ঠেলাগাড়ি-ডুবে যাচ্ছে; সচিবালয় আর শহর ডুবে যাচ্ছে, ছোট্ট একটি দেশ ডুবে যাচ্ছে, পাখির ডাক আর বাঁশির সুর আর ঘাসফুল আর কবিতার পংক্তিগুলো ডুবে যাচ্ছে, একটির পর একটি মহাদেশ ডুবে যাচ্ছে। আমি বমির নিচে হারিয়ে যেতে থাকি।
কাজির, স্বরাষ্ট্রের হাজি কাজি আহমদ সালেকিনের, সাথে দেখা হলেই ধর্মের পুণ্যকথা শুনতে হচ্ছে আজকাল, পুণ্যকথায় ও সব কিছু প্লাবিত করে দেবে মনে হচ্ছে; ওর না কি মারাত্মক ভুল হয়ে গেছে, আগে জানলে অর্থনীতি পড়তো না, সিভিল সার্ভিস অফ পাকিস্তানে যোগ দিতো না, ইসলামিয়াত পড়তো, আর কোন একটি বাদশার কথা যেনো ও বলে, সেটির নাম আমি মনে রাখতে পারি না, যেমন দীন মুহাম্মদের নাম মনে রাখতে পারি না, যদিও সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার সময় অজস্র বাজে বিদ্যার সাথে ওই নামটিও মুখস্থ করেছিলাম, ও তার মতো আলকুরআন নকল করে জীবিকা নির্বাহ করতো (বইটির নাম আমি প্রথম বুঝতে পারি নি, এর উচ্চারণ আর বানান যে বদলে গেছে আমার জানা ছিলো না, বাঙলা ভাষা আর আমার স্বরতন্ত্রির কষ্ট হয় বলে আমি ছেলেবেলায় যা বলতাম সেই কোরান বলেই শান্তি পাই), তাতেই ও শান্তি পেতো। আলকুরআন নকল করে জীবিকা নির্বাহ করা কাজি আজো শুরু করে নি, শিগগির শুরু করবে, অবসর নেয়ার পর কোনো অসরকারি সংস্থা খুলে শুধু আলকুরআন নকল করবে হয়তো, এখন বছর বছর হাজি হচ্ছে, ডান দিক থেকে পেঁচিয়ে আসা অক্ষরগুলো শিখছে, অক্ষরের ফাঁকে ফাঁকে বেহেশত আর হুরি দেখছে, টুপি নিয়ে খুব দৌড়োচ্ছ, টুপিদৌড়ে কাজি ফার্স্ট হচ্ছে, আর মাজারটাজার দেখলেই নেমে দোয়া পড়ছে। দোয়াটোয়া পড়তে আমি জানি না, আমাকে দোয়ার বই কয়েকটি ও দিয়েছে, আমি খুলে দেখি নি, না কি খুলে দেখে ভয় পেয়েছি, না কি খুলে দেখে হেসে উঠেছি। একটি মাজারে কাজি বছরে চারবার করে যাচ্ছে, কাজির বুক সুখে ভরে উঠছে; আমি তাকে তার আইনশৃঙ্খলারক্ষীদের একটু ধর্মটর্ম শেখাতে বলি, তাদের ধর্ষণ করতে একটু নিষেধ করতে বলি (অবশ্য মনে মনে আমি তাদের ঈর্ষা করি, তারা যখন তখন শক্ত হয় কীভাবে? তাদের কি বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়?); কাজি সেদিকে কান দেয় না; যেনো তার আইনশৃঙ্খলারক্ষীরা ধার্মিক হয়ে উঠলে, ধর্ষণ কমিয়ে দিলে, তার পুণ্য কমে যাবে, বেহেশত মানুষে গিজগিজ করবে, কাজি তা পছন্দ করে না; সে একাই বেহেশতে থাকতে চায়। কাজির শেষ বউ মাঝেমাঝেই আমাকে টেলিফোন করছেন, কাজি তার ওপর যে ধর্মাত্যাচার করছে, তা কমানোর জন্যে চাপ দিতে অনুরোধ করছেন। আমি বুঝে উঠতে পারছি না কী অত্যাচার করতে পারে কাজি, যাকে ধর্মত্যাচার বলা যায়? কাজির সাথে কয়েকদিন আগে ওর বাসায় যেতে হয় আমাকে, গিয়েই ব্যাপারটি বোঝা সহজ হয়ে ওঠে আমার পক্ষে। কাজির বউ বোরখা পরেই ড্রয়িংরুমে আসেন, এসে আমাকে খাঁটি একটি আসোলামুআলাইকুম দেন, আমি ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে যাই।
