মিসেস কাজি বলেন, আনিছ ভাই, যখন ড্রাইবারের বউ আছিলাম, তখনও এমন জ্বালা সইহ্য করতে হইতো না।
কাজি বলে, হালিমা বেগম, পরপুরুষের সামনে আপনার আসা ঠিক হয় নি।
মিসেস কাজি বলেন, আমার মন চায় আমি আবার রহিম ড্রাইবারের বউ হইয়া যাই, সেকরেটারির ইস্তিরি থাকতে আমার আর ইচ্ছা করে না।
আমি জিজ্ঞেস করি, ভাবী, আপনার অসুবিধা কী?
হালিমা চিৎকার করে ওঠেন, দ্যাখছেন না, বাইরতেও আমার এই বোরকা পইর্যা থাকতে অয়, আর ভিতরে পরতে অয় হিরোইনগো ড্রেস।
হালিমা বেগমকে আগে আমি দেখি নি, এখনো দেখতে পাচ্ছি না; তিনি বোরখার ভেতরেই আছেন, কিন্তু ওই ঝলমলে কালো বস্ত্রটির ভেতর যে-ঢেউ খেলছে, ঢেউ যেভাবে উঠছে আর ভাঙছে, তাতে তাকে আমার দেখা হয়ে যায়। আমি অনেকটা উত্তেজিতই বোধ করি-অনেকদিন পর বোধ করি এই আবেগটি, মনে হয় আমি হয়তো কাজির আইনশৃঙ্খলার একজন হয়ে উঠবো। নিজেকে আমি দমন করি, দমন ক’রে, শান্তি পাই না। আমি ভয় পেতে থাকি হালিমা বেগম কোনো নাটকীয় কাণ্ড করে বসবেন, আমি তাতে করতালি দিয়ে উঠবো। হালিমা বেগম অনেকটা তাই করেন; তিনি বোরখাঁটি খুলে ছুঁড়ে মারেন, কালো বাদুড়ের মতো উড়ে গিয়ে সেটি কাজির মুখ ঢেকে ফেলে; কাজি বেরাখা চেপে ধরে বসে থাকে, আমি চোখের সামনে দেখতে পাই ঝলমলে টলটলে জ্বলজ্বলে হালিমা বেগমকে। হালিমা বেগমের শরীরটি তাজা ও তন্বী, বোরখার ভেতর থেকে বেরিয়ে শ্যামল জমাট বিদ্যুতের মতো সেটি ঝলসে ওঠে আমার চোখের সামনে, আমি চারপাশে শুধু তার দেহ দেখতে পাই। হালিমা বেগম খুবই হ্রস্ব ব্লাউজ পরেছেন, বক্ষবন্ধনির থেকেও হ্রস্ব, শাড়ি পরেছেন নাভির অনেক নিচে; তার শরীরটিকে স্তব্ধ বিদ্যুৎপুঞ্জ মনে হয়। আমার ইচ্ছে করে আবার একবার উত্তেজিত বোধ করতে, আমি নিজেকে সংযত করি। হালিমা বেগম একবার আমার দিকে হেঁটে আসতে থাকেন, আবার আমার দিক থেকে বিপরীত দিকে যেতে থাকেন; আবার আরেক দিকে হাঁটতে থাকেন; আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকি। হালিমা বেগমের এমন কোনো অঙ্গ নেই, যা দোলে না, দোলায় না।
হালিমা বেগম বলেন, আনিছ ভাই, আপনে আমার শরীলটা দ্যাকতে পাইতেছেন ত?
আমি বলি, দেখতে পাচ্ছি, ভাবী।
হালিমা বেগম বলেন, দেইক্যা কি আপনার মনে হয় এই শরীল দিনরাইত কালা বোরকায় ঢাইক্যা রাখনের মতন?
আমি বলি, না, ভাবী।
হালিমা বেগম বলেন, আমি কি বুড়ী পেত্নী যে বোরকায় নিজেরে ঢাইক্যা রাখুম?
আমি বলি, আপনাকে পরী বলাই ভালো।
হালিমা বেগম বলেন, দ্যাকেন, রহিম ড্রাইবর সেকরেটারির গাড়ি চালাইতো, আমি তারে ছাইরা আইছি, অহন সেকরেটারি আমারে কয় সব সোম বোরকা পরবা আর ভিতরে হিরোইনের ড্রেস পরবা; বিছনায় কিছু পারে না, আমারে খালি দোয়াকলমা শিকায়, নিজে জায়নমজেই পইর্যা থাকে, আমার লিগাও ভেলভেটের জায়নমজ কিনছে।
আমি বলি, জায়নামাজ খুব ভালো জায়গা, ভাবী।
হালিমা বেগম বলেন, জায়নমজে পইর্যা থাকনের বয়স আমার হয় নাই, সেকরেটারি যুদি জায়নমজে পইরা থাকতে চায় তাইলে আল্লারে পাইব, আমারে পাইব না, আমি কইয়া দিলাম।
আমি বলি, আপনিও কাজির সাথে বেহেশতে যেতে পারবেন, ভাবী।
হালিমা বেগম বলেন, ভেস্তে যাইয়া আমার কাম নাই, আমি খাডের ওপরই ভেস্ত পাইতে চাই, রহিম ড্রাইবার আমারে ভাঙা চকির উপরই ভেস্ত দিতো, আর সেকরেটারি আমারে দোয়া শিকায়।
আমি বলি, দোয়াকলমা শেখানোই এখন আমাদের কাজ, ভাবী, সবাইকে আমরা বেহেশত দিতে চাই, এটা আমাদের সরকারি দায়িত্ব। আমরা সবাইকে ভাত দিতে পারবো না আমরা জানি, কিন্তু বেহেশত দিতে পারবো, ইনশাল্লা। তাই আমরা ট্রাক ভরে জনগণের কাছে দোয়াদরুদ পৌঁছে দিচ্ছি আজকাল।
হালিমা বেগম বলেন, আনিছ ভাই, আপনের সামনে সেকরেটারিরে কইয়া দিলাম এমুন করলে আমি সেকরেটারির মাইঝ্যা পোলার লগে ভাইগ্যা যামু, সেকরেটারি আফিসে গ্যালেই মাইঝ্যা পোলা আমার লগে দ্যাকা করতে আহে, আম্মাগো বইল্যা জরাইয়া ধরে, আর ছারতে চায় না।
কাজি চিৎকার করে ওঠে, আমার ছেলের কথা আপনি বলবেন না হালিমা বেগম, আপনার পায়ে পড়ি। আমার ছেলেকে আমি আমেরিকা পাঠিয়ে দেবো।
হালিমা বেগম বলেন, পোলাটা আমারে আধাঘণ্টা জরাইয়া ধইর্যা রাকে, তারপর কাঁপতে কাঁপতে পইরা যায়, পোলাটা আমারে যতুক্ষুন ধইর্যা রাকে ততুক্ষুনই আমি শান্তি পাই। আমি চাইলে হেই আমারে আমেরিকা লইয়া যাইব।
কাজি বলে, হালিমা বেগম, আপনার ওপর শয়তান আছর করেছে, আপনাকে আমার পীরের মাজারে নিয়ে যেতে হবে, আপনি শয়তানের হাত থেকে মুক্তি পাবেন।
হালিমা বেগম বলেন, শয়তানেরে আমি হাজার দোয়া করি, শয়তানের আছর য্যান আমার উপর সব সোম থাকে, কিন্তু তোমার মত সেকরেটারির লগে আমি থাকতে পারুম না।
কাজি দোয়া পড়তে থাকে, আর কাঁদতে থাকে; কাজি কাঁদতে থাকে, আর দোয়া পড়তে থাকে।
হালিমা বেগম বলেন, এই বোরকা আমি ফেইল্যা দিলাম, আইজ থিকা তুমি নিজে ফিন্দো, নাইলে তোমার মারে ফিন্দাইও।
কাজি বলে, আপনি এমন কথা কীভাবে বলেন, হালিমা বেগম, আপনার কি দোজখের ভয় নেই?
হালিমা বেগম বলেন, তোমার লগে থাকনের থিকা দোজগে থাকতেও বেশি শান্তি পামু আমি। রহিম ড্রাইবরের লগে আমি ভেস্তে আছিলাম, সেই ভেস্তরে পায় ঠেইল্লা আমি দোজগ বাইচ্ছা নিছি, হায় আল্লা।
