ডলি বলে, শুনলাম তুমি লন্ডন হয়ে নিউ ইয়র্ক গেছো আর ফিরেছো, অথচ আমার কোনো খবর নাও নি?
আমি বলি, আপনি কে বলছেন?
ডলি বলে, তুমি কি মাতাল হয়ে আছো যে আমার গলা চিনতে পারছো না?
আমি বলি, হ্যাঁ, আমি একটু পান করছি, আপনি কে বলছেন?
ডলি বলে, আমি তোমার স্ত্রী, যদি তুমি তা মনে করো।
আমি বলি, না, জেনারেলের কাছে আমি আর কাউকে ইন্ট্রোডিউস করিয়ে দিতে পারবো না, তার সঙ্গে আমার আর সম্পর্ক ভালো নেই।
ডলি বলে, আমি জানি তুমি জেনারেলের পিম্প, কিন্তু আমি তা চাই না; আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাই।
আমি বলি, বলুন।
ডলি বলে, প্রথমে চিনে নাও যে আমি ডলি বলছি, আমি তোমার স্ত্রী।
আমি বলি, ওহ, ডলি, আমি চিনতে পারি নি।
ডলি বলে, তোমার কী হয়েছে? তোমাকে তো এমন কখনো দেখি নি।
আমি বলি, মিসেস হামিদউল্লাহকে একটু খেতে ডেকেছিলাম।
ডলি বলে, তোমার ডাকে বুড়ীরা ছাড়া আর কে আসবে, কিন্তু এতো মাতলামি করছো কেনো?
আমি বলি, না তো, আমি স্বাভাবিক আছি, খুবই স্বাভাবিক।
ডলি বলে, শুনলাম তুমি নিউ ইয়র্ক গিয়েছিলে, কিন্তু আমি যে লন্ডনে পড়ে আছি, তা কি তোমার মনে নেই?
আমি বলি, হ্যাঁ, মনে ছিলো, কিন্তু ফোন করতে ইচ্ছে করে নি।
ডলি বলে, শুধু ফোন? আমার সাথে তোমার দেখা করা উচিৎ ছিলো না? আমি বলি, দেখা করতে ইচ্ছে করে নি।
ডলি বলে, কিন্তু মনে রেখো তোমাকে আমি ছাড়ছি না, তোমাকে আমি ছাড়বো।
আমি বলি, ছাড়াছাড়ির কথা আমি কিছুই ভাবছি না, কিন্তু সত্যিই তোমার সাথে দেখা করতে ইচ্ছে করে নি।
ডলি বলে, তোমার সাথে দেখা করতে আমারও ইচ্ছে করে না, কিন্তু আমি তোমাকে ছাড়ছি না।
আমি বলি, তোমাকে আমি ছাড়তে বলি নি।
ডলি বলে, মিসেস হামিদউল্লাহকে নিয়েই তুমি থাকো, আগামীকাল আমি হাসান জায়গিরদারের সঙ্গে সিসিলি যাচ্ছি।
আমি বলি, একটু সাবধানে থেকো, মাফিয়ার সাথে ওর সম্পর্ক আছে বলে শুনেছি, তোমাকে ভূমধ্যসাগরে ফেলেও আসতে পারে।
ডলি বলে, তোমার থেকে মাফিয়া আর ভূমধ্যসাগরও আমার কাছে ভালো।
আমি বলি, তাহলে আমাকে আর কেনো কষ্ট করে টেলিফোন করলে?
ডলি বলে, জানিয়ে রাখলাম, যাতে তুমি জ্বলো।
আমি বলি, অনেক দিন ধরে আমি জ্বলি না, যদি একটু জ্বালাতে পারো কৃতজ্ঞ থাকবো।
ডলি বলে, তুমি জায়গিরদারের থেকেও পাষণ্ড।
আমি বলি, জায়গিরদারের সাথে তোমার সম্পর্ক কি খুবই ঘনিষ্ঠ?
ডলি বলে, ঘনিষ্ঠতার তুমি কী বোঝো, আর তোমাকে আমার ব্যক্তিগত কথা কেননা বলতে যাবো?
আমি বলি, আমার ভুল হয়ে গেছে, তোমার ব্যক্তিগত কথা জানতে চাওয়া আমার ঠিক হয় নি।
ডলি বলে, যদি বলি এখন আমি জায়গিরদারের সাথে শুয়ে আছি, তাহলে কি। তোমার জ্বালা লাগবে? আমি জানি তোমার সেই শক্তিও নেই।
আমি বলি, পান করার সময় আমি কোনো জ্বালা বোধ করি না; তখন কাউকে আমার খারাপ লাগে না, সবাইকে ভালো লাগে, সব দৃশ্য সুন্দর মনে হয়।
ডলি বলে, জায়গিরদারের সঙ্গে আমি শুয়ে আছি এটাও কি তোমার সুন্দর লাগবে? তুমি পাষণ্ড, তাই এ-দৃশ্যও তোমার সুন্দর লাগতে পারে।
ডলি ফোন রেখে দেয়।
আমি কোনো শূন্যতা বোধ করি না; জায়গিরদারের সাথে ডলি শুয়ে আছে, এ-দৃশ্যও দেখি না; ডলি নামের কেউ আছে, ছিলো, থাকবে, এ-নামের কেউ এইমাত্র ফোন। করেছিলো, তাও আমার মনে থাকে না। একের পর এক টেলিফোন বাজতে থাকে; টেলিফোনের শব্দ আমার মধুর মনে হয়, ওগুলো ধরে যে সাড়া দিতে হয়, তা আমার মনে হয় না; ওগুলো যে আমারই ঘরে বেজে চলছে, তাও মনে হয় না; হয়তো কোনো নক্ষত্রে, কোনো অরণ্যে পত্রপল্লবের ভেতরে বাজছে; কোনো নদীর ভেতরে, মেঘ বা পাখির বাসায় বাজছে, এমন মনে হয়। আমার কাজের লোকটি, কী যেনো তার নাম, এক সময় আসে; আমি তাকে ভেতরে ঢুকতে বলি; সে ভেতরে ঢুকে আমাকে দেখে বিব্রত হয়; ঢুকবে কি ঢুকবে না করতে থাকে, আমি তাকে ঢুকতে বলি, সে ভেতরে ঢুকলে তাকে পাশের চেয়ারে বসতে বলি। সে দাঁড়িয়েই থাকে, তাতে আমি খুব বিস্মিত হই; আবার তাকে আমি বসতে বলি, কিন্তু সে বসে না।
আমি বলি, আপনি বসুন।
লোকটি বলি, না, স্যার; না, স্যার, বসতে অইব না।
আমি বলি, আমার পাশে বসতে কি আপনার ঘেন্না লাগছে? আপনি কি আর্য ব্রাহ্মণ? আমি কি শূদ্র?
লোকটি আমার কথা বুঝতে পারে না।
সে বলে, স্যার, একটা লুঙ্গি আইন্যা দেই?
আমি বলি, আপনার কী নাম?
লোকটি বলে, আমার নাম দীন মুহাম্মদ, স্যার।
আমি বলি, আপনি কী চান?
লোকটি বলে, আমি কিছু চাই না, স্যার, থালবাসনগুলি নিতে আইছি।
আমি বলি, আপনি বসুন।
লোকটি দাঁড়িয়ে থাকে। আমার সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে দেখে আমার খারাপ লাগে।
লোকটি বলে, একটা লুঙ্গি আইন্যা দেই, স্যার?
আমি বলি, লুঙ্গির কী দরকার, এই তো আমি বেশ আছি।
লোকটি বলে, আপনে ভাল নাই, স্যার।
আমি বলি, আপনি আমাকে স্যার বলবেন না; শুনতে শুনতে আমার ঘেন্না ধরে গেছে। স্যার শুনলে মনে হয় কেউ আমাকে শালা বলে ডাকছে; আমি কারো স্যার নই, আমি কারো শালা নই।
লোকটির সঙ্গে আমার সারারাত কথা বলতে ইচ্ছে করে। লোকটি কি বলবে? লোকটির মুখের দিকে আমি আগে কখনো তাকাই নি; সুন্দর দাড়ি রেখেছে লোকটি,-আগে কি লোকটির দাড়ি ছিলো? মনে পড়ে না, তবে বেশ দাড়ি রেখেছে, দাড়ির বেশি ঝোঁপ নেই, বেশ হাল্কা পাতলা; মাথায় একটি টুপিও আছে, মুখটি ছোটো, গালে একটি ছোটো কাটা দাগ আছে বলে আমার মনে হয় তার লুঙ্গিটা গোড়ালির অনেক ওপরে ওঠানো। দক্ষিণের মসজিদটায় হয়তো নিয়মিত যায়, লোকটিকে বেশ লাগছে আমার।
