বেঁচে থাকতে আমার কেমন লাগছে? নিরর্থক? অর্থপূর্ণ? বিবর্ণ? চাঞ্চল্যকর? সফল? ব্যর্থ? সুখকর দুঃখভারাক্রান্ত? মধুময়? বিষাক্ত? কোনোটিই না। বেঁচে থাকতে আমার খারাপ লাগছে না; এমন মনে হচ্ছে না যে পৃথিবীটাকে বিদায় জানাই, কোনো নাইটিংগেলের লোকোত্তর গান শুনেও মনে হবে না মৃত্যুই এখন, যে-কোনো সময়ের থেকে, বেশি বরণীয়; আবার মরে যাওয়ার ভয়ে ভেতরটা হাহাকারও করছে না। ভেতরে আমি কোনো কান্না শুনি না। নিজেকে খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছে মনে কি হচ্ছে জীবনকে আমি আর বইতে পারছি না? না; এমন মনে হচ্ছে না। জীবনকে কি খুব চাঞ্চল্যকর মনে হচ্ছে? তাও নয়। আমার কি জীবনটাকে আবার শুরু থেকে শুরু করতে ইচ্ছে করছে, মনে কি হচ্ছে যে সুযোগ পেলে ভুলগুলোকে সুন্দরভাবে সংশোধন করে নিতাম? তাও মনে হচ্ছে না। কোনো ভুলকেই সুন্দর করতে আমার ইচ্ছে করছে না, ভুলগুলোকে আমি ভুলই রেখে যেতে চাই। নারী থেকে দূরে থেকে কেমন আছি? কারো সাথেই জড়িয়ে থাকতে আমার ইচ্ছে করছে না। কোনো নারী দিনরাত আমার সাথে আছে, আমার ঘরে আছে, আমার সাথে খাচ্ছে, ঘুমোচ্ছ, বাইরে যাচ্ছে, আমি ভাবতে পারছি না; কিন্তু কোনো নারীর সাথে যদি একবেলা, গভীরভাবে নিবিড়ভাবে কোমলভাবে প্রচণ্ডভাবে, কাটাতে পারতাম, খারাপ লাগতো না হয়তো। কিন্তু তাও আমি পারছি না। মিসেস হামিদউল্লাহর মুখটি আমার ভালো লাগে, আমি ডাকলে তিনি রাজি হবেন বলেই মনে হয়, এবং এক সন্ধ্যায় তাঁকে আমি ডাকি-খেতে ডাকি। খাওয়ার পর আমরা শোয়ার ঘরে গিয়ে বসি। আমি একটু পান করার প্রস্তাব দিলে তিনি আনন্দিত হন, তাঁর আনন্দটা দেখে আমি সুখ পাই। আমরা দুটি সুন্দর আসনে পাশাপাশি বসে, পান করতে থাকি; তার মুখটি আমার আরো ভালো লাগতে থাকে, তিনি একবার আমার হাতের ওপর হাত রাখেন, আমি তার হাত ধরে অনেকক্ষণ দেখি, আদর করি, আমার একটু কর্কশই লাগে; কিন্তু আমি আমার অনুভূতিটা প্রকাশ করি না; পান করতে করতে আমি তার মুখটি বাঁ-হাত দিয়ে ছুঁই, বারবার ছুঁই, তিনি তার মুখটি আমার কাঁধের ওপর রাখেন। আমি তার চুলে একবার মুখ রেখে ঘ্রাণ নিই; তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরেন। আমি তার ব্লাউজ আর অন্তর্বাস খুলি, এবং খোলা হলেই দুটি লম্বা তরল ঢোলা স্তন নাভি পর্যন্ত ঝুলে পড়ে। দেখে আমি ভয় পাই, আমার ঘেন্না লাগে, আমি হাত সরিয়ে আনি। তাকে আর ছুঁতে ইচ্ছে করে না; মনে হতে থাকে ছুঁলে আমার শরীর ভ’রে ঘা দগদগ ক’রে উঠবে, এখনই আমি কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হবো।
আমি বলি, আমি খুব দুঃখিত, এখনই আমার একটি মিটিং আছে।
আমি উঠে দাঁড়াই; মিসেস হামিদউল্লাহ খুব অসহায় বিব্রত বোধ করেন; স্তন দুটি গুটানোর চেষ্টা করে বারবার বিফল হতে থাকেন; আমার দিকে খুব করুণভাবে তাকান। আমি তাঁর স্তন দুটি ধরে গুটোতে সাহায্য করি; তিনি ও-দুটিকে বেঁধে ফেলে মাথা নিচু করে বসে থাকেন। আমি ড্রাইভারকে ডাকি। মিসেস হামিদউল্লাহ আমার দিকে না তাকিয়ে বেরিয়ে যান।
আমি আবার বলি, আমি খুব দুঃখিত।
মিসেস হামিদউল্লাহ কোনো কথা বলেন না। আমি বাথরুমে গিয়ে বারবার হাত ধুই। আমি সম্পূর্ণ নিষ্কাম হয়ে উঠি; যেনো আমি কখনো কামবোধ করি নি, ভবিষ্যতে কখনো করবো না।
মিসেস হামিদউল্লাহর কাছে আমি মনে মনে ক্ষমা চাইতে থাকি, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে থাকি;–তিনি অপমান করতে পারতেন আমাকে, গালে একটা শক্ত চড় কষিয়ে দিতে পারতেন, মুখে একদলা থুতু ছিটিয়ে দিতে পারতেন; বলতে পারতেন–আমার দু-দুটি স্বামী ছিলো, তারা আমার ভেতরে পাঁচটা ছেলেমেয়ে পয়দা করেছে, আমি কিশোরী নই যে তুমি একটা বুড়ো হাবড়া মুঠোর ভেতর দুটি কমলালেবু পাবে। কমলালেবুর কাল আমাদের সেই কবেই কেটে গেছে। আমি ক্ষমা চাইতে থাকি, এবং আবার বাথরুমে ঢুকি, ঝরনা খুলে দিই, দেয়ালে পানি ছিটোতে থাকি; মনে হয় মা, দরোজা ঠেলে বাথরুমে ঢুকে পড়বে, দু-হাত দিয়ে শিশ্ন ঢেকে আমি একবার বসে পড়ি। বসতে আমার কষ্ট হয়, বুঝতে পারি আমার উদর সেই আগের মতো নেই, ইচ্ছে করলেই আমি আর আগের মতো বসতে পারি না, উঠতেও পারি না। অনেক দিন ধরে আমি আমার শরীরটিকে ভালো করে দেখি নি; আয়নায় তাকিয়ে দেখি আমার গলকম্বল দেখা দিয়েছে, মাড়িতে হাত দিতেই তিন দাঁতের ডেনচারটি আঙুলের সাথে উঠে আসতে চায়। ঝুলে পড়া উদরটি আমাকে বেশ বিব্রত করে, পেশি টেনে সেটিকে আমি ঠিক করতে চাই, সেটি অনেকটা ভেতরে প্রবেশ করে, কিন্তু পেশির টান ছাড়তেই আবার ঝুলে পড়ে। মিসেস হামিদউল্লাহ যদি দেখতেন? তিনি খিলখিল করে হেসে উঠতেন না? লোমগুলো এমন শাদা হয়ে গেছে? মিসেস হামিদউল্লাহ যদি দেখতেন? আমি আমার দিকে তাকাতে সাহস করি না, হো হো করে হেসে উঠতে থাকি। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি, দাঁড়াতে পারি না। আমি অনেক বছর সোজা দাঁড়াই না? আমার মেরুদণ্ড নিচের দিকে এমনভাবে বেঁকে গেছে? কখন বাঁকলো? কীভাবে বাঁকলো? কেনো আমি টের পাই নি? আমি নগ্ন বাথরুম থেকে বেরোই, বেরিয়েই আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। এ-আয়নাটিতে পায়ের পাতা থেকে মাথার চুল পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এটা গলকম্বল? আমি গলার নিচের চামড়া নাড়তে থাকি, টেনে টানটান করি, ছেড়ে দিলেই চামড়া শিথিল হয়ে পড়ে। আমি দৌড়ে পাশের ঘরে যাই, আয়নার সামনে দাঁড়াই। এ-আয়নাটিতে আমাকে আরো বিকট লাগে, ধুলো জমে আছে ভেবে আমি আয়নাটি মুছতে থাকি, আমার গলার চামড়া ঝুলছে দেখে আমি ভয় পাই; আবার দৌড়ে পাশের ঘরে যাই। এ-ঘরের আয়নাটিতে আমার উদরটিকে ঠেলে বেরিয়ে আসা একটি পাথরের মতো দেখায়। আমি দুহাত দিয়ে উদর চেপে ধরে আমার ঘরে ফিরে আসি। আমি নগ্ন বসে পান করতে থাকি, এমন সময় টেলিফোন বেজে ওঠে।
