আমি বলি, খুব মনে আছে।
বেলা বলে, এক বছরেরও বেশি হলে তুমি আমাদের দেখতে আসো নি, হয়তো এখন আমাদের চিনতেও পারবে না।
আমি বলি, একশো বছর পরে দেখলেও তোমাদের দুজনকে চিনতে পারবো।
বেলা বলে, চিনতে পারবে, তবে আমরা তোমার কী হই, তা মনে করতে পারবে না।
আমি বলি, তাও পারবো।
বেলা বলে, আমি তোমার সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই, আজই, খুব দরকার।
আমি বলি, তারচেয়ে এখনই দরকারটা কী বলে ফেল।
বেলা বলে, দাদা, আমি তোমার ছোটো বোন, একমাত্র বোন, আমার দরকারের কথাটা কি আমি তোমার বাসায় এসে বলতে পারি না?
এমন সময় লাইনটা কেটে যায়, একের পর এক জরুরি ফোন আসতে থাকে; বেলা নিশ্চয়ই ফোন করে চলছে, আমি জরুরি ফোনে কথা বলতে বলতে বেলার কথা ভাবি, বেলা নিশ্চয়ই রেগে উঠছে, কিন্তু একের পর এক ফোন আসতে থাকে।
বেলা আধঘণ্টা পর আবার লাইন পায়, পেয়েই রেগে ওঠে, দাদা, লাইনটা কেটে গেলো, তুমিই তো আমাকে একটু ফোন করতে পারতে; তোমার লাইন পাওয়া যা কষ্ট, আর হাজারটা পরিচয় দিতে হয়।
আমি বলি, তোকে তো এজন্যেই বলেছিলাম আমলা হ, না হয়ে তুই বউ হওয়ার জন্যে পাগল হয়ে গেলি।
বেলা বলে, বুঝেছি তুমি আমাকে বাসায় যেতে বলবে না, তাই ফোনেই বলছি; কাশেমকে চট্টগ্রামে বদলি করে দিয়েছে, ওকে ঢাকায় রাখার একটু ব্যবস্থা করতে হবে। বেলা আরো যোগ করে, কাশেমকে তোমার মনে আছে কি না জানি না, কাশেম তোমার ছোটো বোনের স্বামী।
আমি বলি, ওর ঢাকায় থাকার কী দরকার?
বেলা চিৎকার করে কেঁদে ওঠে, এ তুমি কী বলছো, দাদা? কাশেম চট্টগ্রামে গেলে আমাকেও যেতে হবে, খোকাকে সেখানে ভর্তি করাতে হবে; আমি ঢাকা ছেড়ে যেতে পারবো না।
আমি বলি, চট্টগ্রামে তো মানুষেরাই থাকে।
বেলা বলে, আমি চট্টগ্রাম যেতে পারবো না, দাদা; তুমি একটু বলে দিলেই ওকে আর বদলি করবে না।
আমি বলি, আগে ক-বার বলেছি।
বেলা বলে, মাত্র দুবার, দাদা।
আমি বলি, আর বলতে পারবো বলে মনে হচ্ছে না রে বেলা।
বেলা চিৎকার করে কাঁদে, দাদা, তুমি আমাদের ভালোবাসো না।
কাশেমকে বদলি করে দেয়া হয়েছে, ফেরাতে হবে; কিন্তু আমিই তো চাই আমাকে কোথাও বদলি করে দেয়া হোক, শহর ছেড়ে চলে যাই। আমাকে বদলি করে ঢাকার বাইরে পাঠানোর জায়গা নেই, পাঠালে দেশের বাইরে পাঠাতে হবে; আমি তা চাই না। ঢাকার বাইরে, বিলের ধারে বা নদীর পারে, হিজল বট নারকেল বনের ভেতরে কোনো উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক করে আমাকে বদলি করে দিলে কেমন হয়? আমাকে কি ওই পদে বদলি করা সম্ভব? সংস্থাপনের জালালউদ্দিন মিয়ার সাথে একবার আলাপ করে দেখবো? জালালউদ্দিন চাইলেই তো হতে পারে। জালালউদ্দিন কি আমার জন্যে এটা চাইতে পারে না? আমি কি দরখাস্ত লিখবো যে হুজুরের নিকট আমার এই আবেদন যে আমাকে বিলের ধারে বা নদীর পারে কোন একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক করিয়া বদলি করার আজ্ঞা হোক? বগুড়ায় সেই প্রধান শিক্ষককে আমি দেখেছিলাম, যার চুলের মসৃণতা দেখে আমার মনে হয়েছিলো তাঁর মতো সুখী যদি আমি হতে পারতাম, আমার আজো ইচ্ছে হয় তাঁর মতে, অবিকল তাঁর মতে, প্রধান শিক্ষক হতে। প্রধান শিক্ষকেরা কি সব সময় ইংরেজি আর্টিক্যল আর প্রিপজিশনের কথা ভাবেন? আমাদের প্রধান শিক্ষকও সব সময় ইংরেজি আর্টিক্যল আর প্রিপজিশনের কথা বলতেন, বগুড়ার প্রধান শিক্ষকও বারবার ইংরেজি আর্টিক্যল আর প্রিপজিশনের কথা বলছিলেন, আমার তাই হ’তে ইচ্ছে করছে; কিন্তু জালালউদ্দিন কি আমাকে বদলি করবে?
আমার বদলি হ’তে ইচ্ছে করছে, কিন্তু জালালউদ্দিন মিয়াকে আমি বলতে পারি না আমাকে বিলের ধারে বা নদীর পারে কোনো বিদ্যালয়ে বদলি করে দাও, জালালউদ্দিন মিয়া তা পারবে না, আমার পক্ষেও তাকে একথা বলা সম্ভব নয়; তবে দশ দিনের জন্যে আমাকে নিউ ইয়র্ক যেতে হচ্ছে, যদিও যেতে আমার ইচ্ছে করছে না। আমার ইচ্ছে করছে বিলের ধারে নদীর পারে যেতে; সেখানে কেউ আমাকে যেতে বলবে না, সেখানে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ নেই। আমার ভয় হয় বিমান পশ্চিমের দিকে উড়লেই হয়তো ডলির কথা মনে পড়বে, ডলিকে আট দশ ঘণ্টা ধরে ভাবতে হবে, ভাবতে আমার ইচ্ছে করছে না। আমার কি একটা দায়িত্ব পড়ে যাবে না হিথ্রোতে নেমে ডলিকে ফোন করা? তারপর ডলির ওখানে গিয়ে অন্তত একদিন থাকা? ফেরার পথে তার ওখানে গিয়ে ওঠা? এমন কি তাকে নিয়ে ঢাকায় ফেরা? হিথ্রো থেকে ফোন করার অর্থই কি হবে না যে আমি ডলিকে আনতে গেছি? এসবের কোনোটিই আমার ইচ্ছে করছে না। বিমানে উঠে আমি একটি বই পড়তে শুরু করি, বইটি পড়া যখন শেষ করি তখন বিমান হিথ্রোতে নামছে; নামার সময় আমি একটু ভয় পাই, আর তখন ডলিকে আমার মনে পড়ে। হিথ্রোতে নেমে আমি ডলিকে টেলিফোন করি না, এক ঘণ্টার মধ্যেই আরেকটি বিমানে নিউ ইয়র্কের দিকে উড়তে থাকি; এবং ফেরার সময়ও আমি হিথ্রোতে নেমে ডলিকে ফোন করি না, তার কথা আমার মনেই পড়ে না; শুধু বিমানটি যখন ভূমধ্য না আড্রিয়াটিকের এক কোণে এসে একবার লাফিয়ে ওঠে, তখন ডলিকে আমার মনে পড়ে। আবার বিমান মসৃণভাবে চলতে শুরু করলে ডলিকে আমি ভুলে যাই। আমার মনে পড়তে থাকে কোথাও আমার বদলি হওয়া দরকার, ঢাকা আর নিউ ইয়র্ক কোনোটিতেই আমার থাকতে ইচ্ছে করছে না, নারকেলগাছের নিচে টিনের ঘরে থাকতে ইচ্ছে করছে। অমন বাড়িতে আমি কখনো থাকি নি; নারকেলগাছের ছায়ায় আমার ঘুমোতে ইচ্ছে করছে। ঢাকায় নেমে আমি কি আরো একটি প্লেন ধরবো? প্লেন আমাকে কোথায় পৌঁছে দেবে? টিনের ঘরের দরোজায়? না, বিমানে করে টিনের ঘরের দরোজায় যাওয়া যায় না; হেঁটে যেতে হয়। আমি কি ঢাকায় নেমে হাঁটতে শুরু করবো? হেঁটে হেঁটে কোথায় যাবো? এর চেয়ে ভালো হয় বিমানটি কোথাও না নামলে; বিমানটি কি বছরের পর বছর আকাশে উড়তে পারে না? না, পারে না; বিমানটিকে নামতেই হবে; আর বিমানটি যা পারে, তা হচ্ছে ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে। আমি বিমানের সাথে চুরমার হয়ে যেতে চাই না; আমি নামতে চাই, কিন্তু নেমে কোথাও যেতে আমার ইচ্ছে করে না।
