ডলি বলে, মনে থাকবে না কেনো? আমি তো পশু নই; সে আমার স্বামী ছিলো।
আমি বলি, কোনোদিন তো বুঝতে দাও নি।
ডলি বলে, তোমাকে বুঝতে দিয়ে কী হবে?
আমি বলি, একজনের সাথে থেকে আরেকজনের কথা বলতে হয়তো তোমার বেঁধেছে।
ডলি বলে, তোমার কি দেলোয়ারকে মনে পড়ে না?
আমি বলি, না।
ডলি বলে, আজকাল আমার মনে হয় তুমি আমাকে ভাগিয়ে এনেছে।
আমি বলি, আমি খুব খারাপ কাজ করেছি।
ডলি বলে, হ্যাঁ, খারাপই করেছে।
আমি বলি, তুমি নাও ভাগলে পারতে।
ডলি বলে, তখন তোমাকে বিশ্বাস করার মতো মনে হয়েছিলো।
আমি বলি, আমি কি অবিশ্বাসের কোনো কাজ করেছি?
ডলি বলে, তোমার সাথে থেকে থেকে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।
আমি বলি, যে-কোনো মানুষের সাথেই দীর্ঘকাল থাকা ক্লান্তিকর।
ডলি বলে, ক্লান্তি থেকে আমি একটু মুক্তি চাই।
আমি বলি, তুমি কি আমাকে ছেড়ে অক্লান্তিকর কারো কাছে যেতে চাচ্ছো?
ডলি বলে, না, এই বয়সে তোমাকে ছেড়ে গিয়ে কী হবে? আমার কোনো নতুন জীবন হবে না, বরং কলঙ্ক হবে।
আমি বলি, কলঙ্কের ভয় করছো কেনো?
ডলি বলে, কলঙ্কের ভয়েই তো কিছু করে উঠতে পারলাম না, তোমার সাথে পড়ে রইলাম।
আমি বলি, খুব ভুল করেছে; আমার যদি মনে হতো তোমার সাথে থেকে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, তাহলে ছাড়াছাড়ি করে ফেলতাম, কলঙ্কের ভয় করতাম না।
ডলি বলে, তোমরা আমলারা তো এমনই।
আমি বলি, তাহলে কী করতে চাও?
ডলি বলে, আমি কয়েক মাসের জন্যে লন্ডন যেতে চাই।
আমি বলি, তাতে কি ক্লান্তি কাটবে?
ডলি বলে, গিয়ে দেখি।
ডলি লন্ডনে তার বোনের বাসায় বেড়াতে চলে যায়। সে-সন্ধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠকে আমাকে থাকতে হয়, আমি তাকে বিদায় দিতে যেতে পারি নি। ডলিকে বিদায় দিতে যাওয়ার জন্যে আমার মনে কি কোনো আবেগ ছিলো? আমি তেমন কোনো আবেগ বোধ করি নি; মনে হয় নি যে তাকে অনেক দিন দেখবো না, না দেখে কষ্ট হবে। ডলিরও কি কোনো আবেগ বোধ হয়েছিলো? ওই সন্ধ্যায় বৈঠক ছিলো বলে আমার ভালোই লেগেছে। আর সে যে লন্ডন যাচ্ছে দুপুরবেলাও তার আচরণ দেখে কেউ বুঝে উঠতে পারে নি; এমন কি আমারও মনে হচ্ছিলো সে হয়তো যাওয়া বাতিল করে দিয়েছে। শুধু দুপুরে যখন আমি বেরোতে যাচ্ছি সে সন্ধ্যায় গাড়িটি পাঠিয়ে দিতে বলে, বিমানবন্দরে যাবে বলে। আমি ড্রাইভারকে একবার বলি, এবং তারপর ভুলে যাই; সন্ধ্যার বেশ পর বৈঠক থেকে বেরিয়ে গাড়ি খুঁজি, না পেয়ে খুব উত্তেজিত বোধ করি। আমি হেঁটে হেঁটে বেইলি রোডে ফিরি, এবং বাসায় ঢুকতেই মনে পড়ে যে ড্রাইভার হয়তো ডলিকে নিয়ে বিমানবন্দরে গেছে। নিজেকে আমার খুব হাল্কা লাগে।
অনেক দিন পর আমার ক্লাবে যেতে ইচ্ছে করে; ক্লাবে গিয়ে আমি সোজা দোতলায় উঠে যাই, নতুন কার্পেটের গন্ধটা আমার ভালো লাগে, একটি তাসের টেবিলে বসে পড়ি, পাঁচশো টাকার চাকতি কিনি। চাকতিগুলো ধরতে আমার সব সময়ই শিশুর অনুভূতি হয়, নিজেকে বয়স্ক মনে হয় না, একরাশ খেলনা নিয়ে খেলছি মনে হয়। বেশ ভালো তাস পেতে থাকি, ভালো তাস পেতে পেতে আমার ঘেন্না লাগতে থাকে; উঠে পড়তে ইচ্ছে হয়, তবে উঠে পড়াটা রীতির মধ্যে পড়ে না, কয়েক হাজার টাকা আমি জিতে ফেলেছি, কিন্তু উঠে পড়ার জন্যে আমি পাগল হয়ে উঠি। উঠে পড়ার ভালো উপায় হচ্ছে হারতে থাকা; আমি হারতে শুরু করি, আমার সব কিছু নিঃশেষ হয়ে যেতে থাকে, শেষ চাকতিটি পর্যন্ত আর আমার থাকে না। আমি আবার পাঁচশো টাকার চাকতি কিনি, পৃথিবীর সব বিমান ও বিমানবন্দরের কথা ভুলে যাই; আবার জিততে শুরু করি। এবার আর আমার উঠতে ইচ্ছে করে না, অজস্র চাকতি জমতে থাকে আমার সামনে; চাকতির লাল নীল রঙে আমার চোখ ঝলমল করে উঠতে থাকে। চাকতিগুলোর বিনিময়ে আমি যে-টাকা পাবো, তা আমার কাছে নোংরা লাগতে থাকে; ওই নোংরা নোটগুলো আমি নিতে পারবো না, আমি যখন উঠবো চাকতিগুলো নিয়েই উঠবো। কিন্তু চাকতিগুলো নিয়ে কি ওঠা যাবে, চাকতি নিয়ে যাওয়ার কি নিয়ম আছে? আমি উঠে পড়তে চাই। আমার আবার ঘেন্না লাগতে শুরু করেছে। ডলির বিমান কি উড়েছে; এখন সেটা আকাশের কোথায় আছে? আমার মনে হয় ডলির বিমানটি ভেঙে পড়বে, মনে হয় ভেঙে পড়ুক; একবার আমি মনে মনে বলে ফেলি বিমানটি ভেঙে পড়ুক; আরেকবার আমি বলি বিমানটি ভেঙে পড়ুক। এটা ভাবতে আমার খারাপ লাগে না; আমি নিজেকে বোঝাই এটা ভাবা আমার ঠিক হচ্ছে না, মনে মনে আমি যা বলেছি, তাতে আমি অপরাধ করেছি, আমার ক্ষমাপ্রার্থনা করা উচিত; আমার দুঃখিত হওয়া উচিত; কিন্তু আমার কোনো দুঃখ লাগে না, মনে কোনো অপরাধবোধ জমে না।
বাসায় ফিরে গিয়েই শুনি টেলিফোন বাজছে; টেলিফোন ধরতে আমার ইচ্ছে করে না। আমি কাপড় বদলাই, তখনও টেলিফোন বাজছে; আমি বাথরুমে যাই, তখনও টেলিফোন বাজছে; আমি চুল আঁচড়াই, তখনও টেলিফোন বাজছে; আমি টেলিভিশন খুলি, তখনও টেলিফোন বাজছে। কোথাও হয়তো আগুন লেগেছে। কোথাও হয়তো সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কোথাও হয়তো সব কিছু প্লাবিত হয়ে গেছে। কোথাও আগুন লাগলে আমার কী, আমি কী করতে পারি? সব কিছু ধ্বংস হয়ে গেলে আমার কী করার আছে? আমার কী যদি মহাজগত প্লাবিত হয়ে যায়; একটির পর একটি গ্রহ আর সূর্য যদি প্লাবনের তলে লুপ্ত হয়ে যায়? ওই আগুনের সাথে আমার কি কোনো সম্পর্ক আছে? ওই ধ্বংসের সাথে আমি কি সম্পর্কিত? কী সম্পর্ক আমার প্লাবনের সাথে?
