টেলিফোন ধরেই ডলির গলা শুনতে পাই।
ডলি বলে, প্লেন ছাড়তে আরো তিন ঘণ্টা বাকি, এক ঘণ্টা ধরে রিং করছি।
আমি বলি, এইমাত্র বাসায় ফিরলাম।
ডলি বলে, এতোক্ষণ কোথায় ছিলে?
আমি বলি, ক্লাবে।
ডলি বলে, আজই ক্লাবে চলে গেছো!
আমি বলি, অনেক টাকা জিতলাম।
ডলি বলে, এয়ারপোর্টে আসো না, আমাকে বিদায় দিয়ে যাও।
আমি বলি, এখন বেরোতে ইচ্ছে করছে না।
ডলি বলে, অন্য কোনো মেয়েলোক ডাকলে তুমি হয়তো চলে আসতে।
আমি বলি, আমি কি টেলিফোন রেখে দেবো?
ডলি বলে, তাতো দেবেই, আমার কথা শুনতে তোমার ভালো লাগবে কেনো?
আমি বলি, সত্যিই ভালো লাগছে না।
ডলি বলে, তোমার সঙ্গে যেনো আমার আর দেখা না হয়।
আমি বলি, তা তোমার ওপর নির্ভর করছে।
ডলি বলে, আমি না ফিরলে আমাকে তুমি আর ফিরিয়ে নেবে না?
আমি বলি, এসব আমি এখন ভাবছি না।
ডলি বলে, আজ থেকে ভাবার অবসর পাবে।
ডলি টেলিফোন রেখে দেয়। আবার কিছুক্ষণ পর টেলিফোন বেজে ওঠে।
ডলি বলে, তুমি চিরকাল আমাকে একলা রেখে দিলে।
আমি বলি, তার জন্যে আমি দুঃখিত।
ডলি বলে, এয়ারপোর্টেও আমি একলা।
আমি চুপ করে থাকি। আমার বলতে ইচ্ছে হয়, এয়ারপোর্টে একলাই আমার ভালো লাগে, কিন্তু বলি না। সবার ভালো লাগার প্রকৃতি একরকম নয়।
ডলি বলে, আমার ইচ্ছে হয় প্লেনটা যেনো ভেঙে পড়ে।
আমি বলি, ভেঙে পড়বে কেনো?
ডলি বলে, তাহলে আমাকে আর তুমি দেখতে পাবে না।
ডলি ফোন রেখে দেয়।
ডলির প্লেন যদি সত্যিই ভেঙে পড়ে? তাহলে ওই ভেঙে পড়ায় আমার কি কোনো হাত থাকবে; আমি কি মনে করবো যে ভেঙে পড়ায় আমার একটি মানসিক ভূমিকা ছিলো? যদি তখন সবাইকে আমি বলি বা বিবৃতি দিই যে প্লেনটা ভেঙে পড়ুক এমন কামনা আমি করেছিলাম, ওই কামনা আমার ভেতরে অনেকক্ষণ ধরে কাজ করছিলো, সবাই আমাকে কি পাগল না অপরাধী ভাববে? অনেক রাতে আমি আকাশে প্লেনের গম্ভীর আকাশ-ফাড়া শব্দ শুনতে পাই, এমন শব্দ যেনো প্লেনটি পাথর ভেঙে ভেঙে এগোচ্ছে, আর বলে যাচ্ছে ভেঙে পড়বো, ভেঙে পড়বো। ছেলেবেলায় কোনো একটানা শব্দ শুনলেই আমার ভালো লাগে এমন কোনো শব্দ শুনতে শুরু করতাম : রেলগাড়িতে উঠলেই কখনো শুনতাম চলে যাচ্ছি, চলে যাচ্ছি, কখনো আবার আসবো, আবার আসবো, কখনো নদীতে অনেক পানি, নদীতে অনেক পানি, কখনো ইস্কুল বন্ধ, ইস্কুল বন্ধ, কখনো লাল ঘুড়ি, লাল ঘুড়ি। আমার যা শুনতে ইচ্ছে করতো, তাই শুনতে থাকতাম। এবার আমি ভেঙে পড়বো না, ভেঙে পড়বো না শুনতে থাকি, শুনতে শুনতে বিমানের শব্দ আকাশে মিলিয়ে যায়; তারপরও শুনতে থাকি ভেঙে পড়বো না, ভেঙে পড়বো না, কিন্তু হঠাৎ আমার মনে হয় আমি যেনো শুনছি ভেঙে পড়বো, ভেঙে পড়বো।
বয়স কতো হলো আমার? চুয়ান্নো? আমার বয়স কত হলো, প্রশ্ন করে জানতে হয় না; আমার বয়স কতো বছর-মাস-দিন, প্রত্যেক ভোরেই মনে পড়ে; কখনো আমি হেসে উঠি কখনো ভয় পাই। হেসে ওঠার ব্যাপারটি বেশি পুরোনো নয়, এক দশকের মতো; ভয় পাওয়ার ব্যাপারটিই পুরোনো,–আমি ভয় পেয়েই জন্ম নিয়েছিলাম এবং জন্ম নিয়েই ভয় পেয়েছিলাম। মৃত্যু? মনে পড়লে হেসে উঠি এখন, এবং যেহেতু মাঝেমাঝেই মনে পড়ে, ভুলে থাকতে পারি না, তাই মাঝেমাঝেই হেসে উঠি। ডলির সামনেই হেসে উঠেছিলাম একদিন, যা আমার ঠিক হয় নি; ডলি এটাকে কোনো গূঢ় রহস্যময় সত্যের সূত্র মনে করে সত্য উদ্ধারের জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়েছিলো। ঘরে আর বারান্দায় হেঁটে হেঁটেই আমি শেভ করি; সেদিন শেভ করতে করতে, হয়তো হাতে কালোর সাথে গুঁড়োগঁড়ো শুভ্রতার মিশ্রণ দেখে, আমার মৃত্যুর কথা মনে পড়েছিলো; আমি হেসে উঠেছিলাম।
ডলি বলেছিলো, হাসলে যে।
আমি বলেছিলাম, হাসি পেলো।
ডলি বলেছিলো, খামোখা মানুষের হাসি পায় না কি?
আমি বলেছিলাম, অনেকটা খামোখাই।
ডলি বলেছিলো, আমার বিশ্বাস হয় না; নিশ্চয়ই তোমার কোনো গোপন কথা মনে পড়েছে।
আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ, খুবই গোপন কথা।
ডলি বলেছিলো, তোমার গোপন কথাটি কী জানতে পারি?
আমি বলেছিলাম, তোমাকে বলতে পারবো না।
ডলি বলেছিলো, আমাকে বলবে কেনো, সেক্রেটারির বউকে গিয়ে বলো।
আমি আরেকবার হেসে উঠেছিলাম। ডলিকে বলতে পারি নি শেভ করতে করতে। আমার জরুরি ফাইল নয়, গোপন ফাইল নয়, রাষ্ট্রের অবধারিত উন্নতি নয়-মৃত্যুর কথা মনে পড়ছিলো; মনে হচ্ছিলো এই যে আমি ঘরে আর বারান্দায় পায়চারি করে শেভ। করছি, একদিন আমি শেভ করবো না, শেভারের ঝিঁঝি থেমে যাবে। আমার মনে দুঃখ জাগে নি, আমি ভয় পাই নি, আমার হাসি পেয়েছিলো। অনেক দিন ধরেই মৃত্যুর কথা মনে পড়লে আমার হাসি পায়; আর এমন এক সময় ছিলো যখন ভয়ে বুক কাঁপতো। কিন্তু আমি হেসে উঠি কেনো? মৃত্যু তো হাস্যকর ব্যাপার নয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়? পার্কে আর লেকের পারে বন্ধুদের আর সহকর্মীদের আর অচেনা জীবনমুখিদের যখন দ্রুত হাঁটতে দেখি, আমার হাসি পায়; মনে হয় তারা মৃত্যুর আগে আগে হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তারা দেখতে পাচ্ছে মৃত্যু তাদের থেকে মাত্র এক পদক্ষেপ পেছনে, তাই তারা এক পা আগে আগে দ্রুত হাঁটছে। কতো দিন পারবে? খুব দণ্ডিত মনে হয় তাদের। বেঁচে থাকার জন্যে কী আপ্রাণ ইতর লোলুপতা। কেনো বেঁচে থাকতে হবে? এক সময় কেনো থেমে যেতে হবে না, মরে যেতে হবে না, মিশে যেতে হবে না, নামপরিচয়হীন হয়ে যেতে হবে না? কী পার্থক্য। পঁচিশ আর পঁচাশির মধ্যে পাঁচ লক্ষ বছর বাঁচতে না পারলে পঁচাশি বছর বেঁচে থেকে কী লাভ? বাল্যকালে আমার পাঁচ হাজার বছর পাঁচ লক্ষ বছর পাঁচ কোটি বছর বেঁচে থাকার ইচ্ছে হতো। মানুষ মরে যায়, এটা কত বছর বয়সে বুঝতে পেরেছিলাম, আমার মনে নেই; মনে পড়ে বোঝার পর আমি ঘুমাতে গিয়েই মাকে জড়িয়ে ধরতাম; নিঃশব্দে চিৎকার করতাম-আমি মরবো না, মা মরবে না; আর সবাই মরে যাবে, আমি মরবো না, মা মরবে না। আমার জগৎ মৃত্যুতে ভরে গিয়েছিলো, মৃত্যুকে এড়িয়ে যাওয়াই ছিলো আমার প্রতিমুহূর্তের সাধনা; মৃত্যুই ছিলো আমার প্রত্যেক মুহূর্তের দেবতা। তখনো জানতাম না যে মানুষ সব কিছু হিশেব করতে পারে; আমিও হিশেব করতে শিখতে থাকি, এবং আমি অনেকটা মেনে নিই যে আমিও মরবো, মাও মরবে। কিন্তু আমি সময় বাড়াতে থাকি, মৃত্যুর সাথে সংখ্যার খেলায় মেতে উঠি, যেনো আমি সংখ্যা দিয়ে মৃত্যুকে ঠেকাতে পারবো।
