আমি বলি, আমি কি জানি তোমার শরীরের কোনখানে ব্যথা করে?
ডলি বলে, এসব কথা রাখো, স্বামীস্ত্রীর এসব জানার দরকার নেই।
আমি বলি, তুমি কি জানো তুমি আমার কোনখানে চুমো খেলে আমার ভালো লাগে?
ডলি বলে, তোমার ইতর কথা রাখো।
আমি বলি, তোমার কোন আসনে বেশি সুখ হয় আমি কি জানি?
ডলি বলে, রাখো তোমার আসনটাসন, আমাকে ঘুমোতে দাও।
ডলি সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছে, আমি আর কথা বলি না।
অনেক দিন ধরেই একটা অবর্ণনীয় অদ্ভুত ইচ্ছে হচ্ছে আমার, ইচ্ছেটাকে কখনো আমি বাস্তবায়িত করতে পেরে উঠবো না, কিন্তু ইচ্ছেটা হচ্ছে; আমার ভালো লাগছে–ইচ্ছেটার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কাজের ফাঁকে ফাঁকেই ইচ্ছেটাকে আমি দেখি, দেখে আমার সুখ লাগে। অনেক বছর আগে একটি চাষীকে আমি দেখেছিলাম, সে মাঠে গরু নিয়ে যাচ্ছে; সেই চাষীটিকে আর গরুগুলোকে আমি দেখতে পাই-একটি স্বচ্ছ পর্দার ওপারের ছায়ার মতো তারা আমার কাছে। আমি কি ওই চাষীটি হতে, পারতাম? আমি কি ওই চাষীটি হতে পারতাম না? ওই গরুগুলো নিয়ে কি আমি মাঠে যেতে পারতাম না? আমি জানি চাষী হয়ে গরু নিয়ে মাঠে যাওয়া খুব মধুর নয়; কিন্তু তাকে যেভাবে আমি যেতে দেখেছিলাম, তা মধুর। অমন ঘাসের ওপর আমি কখনো পা ফেলি নি; আমি ঘাস আর মাটির ছোঁয়া কেমন তা জানিই না;–অনেক বছর ধরেই আমার পা ঘাস আর মাটির ছোঁয়া পাওয়ার স্বপ্ন দেখে আসছে; ঘাস দেখলেই আমার ইচ্ছে করে জুতো খুলে ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে কোথাও চলে যাই; কিন্তু আজো যেতে পারি নি; কোনো দিন যেতে পারবো না হয়তো। একবার এক দুপুরে দুর থেকে একটি ছোটো নদীতে এক মাঝিকে নৌকো বেয়ে যেতে দেখেছিলাম; সে গান গাইছিলো না, নৌকো বেয়ে যাচ্ছিলো; আমি আজো তাকে দেখতে পাই। আমি কি ওই মাঝিটি হতে পারতাম? আমি কি ওই মাঝিটি হতে পারতাম না? মাঝি হওয়া সুখকর নয়, আমি জানি, কিন্তু ওই মাঝিটিকে, তার নৌকোটিকে, কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমি দেখতে পাই-স্বচ্ছ পর্দার আড়ালে তার নৌকো ভাসছে। কেনো দেখতে পাই। একবার দূর থেকে জঙ্গলের ভেতর আমি একটি বাঁশের ঘর দেখেছিলাম, কোনো মানুষ দেখি নি; ওই ঘরটিকে আমার মনে পড়ে। আমি কি ওই ঘরে থাকতে পারতাম না? ওই গরুগুলো, ওই নৌকো, ওই বাঁশের ঘরের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই; কিন্তু ওগুলোকে আমি হঠাৎ হঠাৎ দেখতে পাই; কোনো কালে ওগুলোর সাথে আমার গভীর সম্পর্ক ছিলো; ওগুলোকে আমি ভুলে গেছি; আমার ভুলে যাওয়ার অতল গভীরতা থেকে মাঝেমাঝে ওগুলো জেগে উঠে আমাকে সুখে ভরে দিচ্ছে। আমার জীবন একটা ছকের ভেতর বাধা পড়ে গেছে, আমি খুব প্রচণ্ডভাবেই তা টের পাই; অনেকের কাছেই ওই ছক খুব আকর্ষণীয়, আমার কাছেও; কিন্তু ছকের বাইরের নৌকো আর ঘাস আর বাঁশের ঘর আমাকে কেনো বিহ্বল করে তোলে?
আমার দিকে তাকিয়ে কেউ বুঝে উঠতে পারে না আমার ভেতরে একটি মেঠোপথ আছে, যে-পথ দিয়ে ভোরবেলা একটি চাষী তার গরুর পাল নিয়ে মাঠে যায়; একটি নদী আছে, ছোট্ট, তাতে একটি মাঝি নৌকো বায়; বনের ভেতরে একটি বাঁশের ঘর আছে, তার চারপাশে কাউকে দেখা যায় না। আমি চাই না কেউ বুঝে উঠুক; কেউ আমার ভেতরের চাষীটিকে, মাঝিটিকে, ঘরটিকে দেখে ফেলুক। আমি চাই, হয়তো চাই, আমি চাই কি না আমি জানি না, সবাই বাইরের আমাকে দেখুক, আমার বাইরটাকে দেখুক; আমার ভেতরটাকে দেখে ফেললে আমি খুব বিব্রত হয়ে পড়বো, যারা দেখবে তারা খুব বিচলিত হয়ে পড়বে। দক্ষ আমলা বলে আমার সুনাম রয়েছে (আমলা শব্দটিই আমরা কেউ পছন্দ করি না, আমাদের সামনে কেউ বলে না, পেছনে সবাই’বলে), যা অনেকের কাছে দুর্নাম; পেশায় আমি খারাপ উন্নতি করি নি, সবচেয়ে উঁচু পদটিতে আমার বয়সের অনেকের আগেই আমি পৌঁছে যাবো মনে হচ্ছে; আমি অনেকেরই ঈর্ষার পাত্র; তবে এ-সবই আমার কাছে হাস্যকর, তুচ্ছ, যদিও তা আমি কখনোই কাউকে বুঝতে দিই নি, অর্থাৎ এমন কিছু করি না যাতে তারা বুঝে উঠতে পারে। কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয় আমার কাছে, যদিও ধুলোকণাটিকেও আমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি; মানুষও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়, যদিও অন্যরা মানুষকে যতোটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তারচেয়ে আমি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি মানুষকে। একটি মানুষ সৃষ্টি করি নি বলে ডলির হাহাকারের শেষ নেই, তার হাহাকারকে আমার নিরর্থক মনে হয়; ওই হাহাকার, আমার মনে হয়, আন্তরিক নয়, তা দুর্মর প্রথার চিৎকার ও আড়ম্বর। কী হতো যদি আমার দুটি ছেলে আর একটি মেয়ে, বা তিনটি মেয়ে, বা চারটি ছেলে, বা দুটি মেয়ে আর একটি ছেলে, বা শুধুই একটি মেয়ে, বা একটি ছেলে থাকতো? কী সুখ পেতাম আমি তাদের ইস্কুলে পৌঁছে দিয়ে? ইস্কুল থেকে এনে? বুকে জড়িয়ে ধরে? তারা হয়তো এখন দেশেও থাকতো না; তাদের বিদেশে পাঠিয়ে গৌরব উপভোগ করে কী সুখ পেতাম? সুখের কথাই আমার কখনো মনে পড়ে না।
ডলি একদিন বলে, একটা দুর্ঘটনাই আমার জীবনটাকে বদলে দিলো; নইলে অন্য রকম হতো।
আমি বলি, দুর্ঘটনার কাজই হঠাৎ বদলে দেয়া, সুন্দরকে অসুন্দর করে তোলা, স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করা।
ডলি বলে, তোমার দর্শন রাখো, এসব আমার শুনতে ইচ্ছে করে না।
আমি বলি, দেলোয়ারকে তোমার মনে আছে?
