আমি বলি, আসুন।
হাফিজুদ্দিন একটা কাপড়ের ব্যাগ খুঁজে বের করে আমার পেছনে পেছনে আসতে থাকে। আমি তাকে সরাসরি শয্যাকক্ষে নিয়ে আসি, সে বেশ অবাক হয়।
আমি বলি, ব্যাগটা খাটের নিচে রাখুন, ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে দিন।
হাফিজুদ্দিন মেঝেতে শুয়ে পড়ে খাটের নিচে ব্যাগটা রাখে, ঠেলে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেয়; তার মাথাটা বেশ ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলো, মাথাটা বের করলে দেখা যায় কিছু মাকড়সার জাল তার চুলে ঝুলে আছে।
তার বয়স বাড়ছে
ডলি বারবার আমাকে জানিয়ে দিচ্ছে তার বয়স বাড়ছে, তার বয়স বেড়ে গেছে, তার আর সময় নেই; আমার সময় থাকতে পারে, তার সময় নেই, সে এক হাজার বছর বাঁচার জন্যে আসে নি। আমার সঙ্গে দশ বছরে তার বিশ বছর বয়স বেড়ে গেছে; তার যে বয়স বাড়ছে, তা আমি দেখতে পাই। ডলি গোশল করে কম, তার বিশেষ কোনো সময় নেই গোশলের; ভোরেও সে গোশল করতে পারে, রাতেও পারে, দুপুরেও পারে; অনেক দিন করেই না। আমি তাকে গোশল করার কথা জিজ্ঞেস করি না, করাটা আপত্তিকর মনে হয়; কে কখন কী করবে বা করবে না তা তার নিজের ব্যাপার। সে সাজে, বা সাজার চেষ্টা করে; যখন তখন শরীরে সেন্ট ছড়িয়ে দেয়, শা শা শব্দ ওঠে, শব্দটা শুনলে আমার শরীর একবার শিউরে ওঠে; শা শা শব্দ করে সে আমাকে জানিয়ে দেয় যারা সুগন্ধ পছন্দ করে, তারা উন্নত রুচির মানুষ, আর যেহেতু সে সুগন্ধ পছন্দ করে, সে উন্নত রুচির অধিকারী, আমার থেকে। একদিন আমি তাকে গোশল করা সম্পর্কে খুব সরল পরোক্ষ একটা প্রশ্ন করে ফেলি; করে বিব্রত হই।
আমি বলি, আজ মনে হয় তুমি গোশল করো নি।
ডলি বলে, কেনো করবো? করার কী দরকার?
আমি বলি, গোশল তো করতেই হয়।
ডলি বলে, কেনো করবো? রাতে কিছু করো না কি যে গোশল করবো?
আমি বলি, রাতে কিছু করার সাথে গোশলের কী সম্পর্ক?
ডলি বলে, নাপাক হলে গোশল করতে হয়, আমি নাপাক না।
আমি বলি, আমি কোনো দিনই তোমাকে নাপাক করি নি।
ডলি বলে, নাপাক করার মুরোদ তোমার নেই।
ডলি সম্ভবত ধর্মে মন দিয়েছে, আমি চুপ করে থাকি। পাক-নাপাকের ব্যাপারটা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম; ইস্কুলের মওলানা সাহেব শব্দ দুটি বলতেন, শুনে মনে হতো আমার শরীরের ছিদ্রে ছিদ্রে ময়লা জমে আছে। ডলি ঘুমোনোর জন্যে চেষ্টা করছিলো, হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে; দেখতে পাই সে ঘুমোয় নি, বরং প্রখরভাবে জেগে আছে।
ডলি বলে, শুনলাম তোমার সেক্রেটারির বউটা খুব রূপসী।
আমি বলি, আমিও তাই শুনেছি।
ডলি বলে, তুমি কি শুধু শুনেছেই, এখনো দেখো নি?
আমি বলি, না, দেখি নি।
ডলি বলে, আমার কাছে মিথ্যে বোলো না, তুমি অনেকবারই তাকে দেখেছো। সেক্রেটারি কি তোমাকে না দেখিয়ে শোয়ার সাহস করেছে?
আমি বলি, তার বউর সাথে সে শোবে, তাতে সাহসের দরকার হবে কেনো, আমাকেই বা দেখিয়ে নিতে হবে কেনো?
ডলি বলে, তোমাদের আমলাদের মধ্যে না কি এখনো পুরোনো কালের নিয়মকানুন টিকে আছে, শুনতে পাই বসকে না দেখিয়ে স্ত্রীগমন নিষেধ।
আমি বলি, এতো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ তুমি কোথায় পাচ্ছো, ডলি?
ডলি বলে, তোমাদের আমলাদের সম্পর্কে সবারই ধারণা আছে, তাই আমলাদের বউদের সব সংবাদ রাখতেই হয়; কোন দিন সেক্রেটারির বউকে ভাগাও কে জানে?
আমি বলি, তুমি কি সেজন্যে দুশ্চিন্তায় আছো?
ডলি বলে, দুশ্চিন্তার কী আছে? আমিও কাউকে ধরবো, অনেকেই ঘুরঘুর করে; এখনো বুড়ী হয়ে যাই নি।
আমি আর কথা বলি না, ঘুমিয়ে পড়তে চাই।
ডলি বলে, শুনলাম তোমার সেক্রেটারিকে তুমি কয়েক সপ্তাহের জন্যে বাইরে পাঠাচ্ছো?
আমি বলি, হ্যাঁ, আমেরিকায় যাওয়ার একটা সুযোগ ও পেয়েছে।
ডলি বলে, সুযোগ ও আসলে পায় নি, তুমিই সুযোগ করে দিয়েছে।
আমি বলি, হ্যাঁ, ও খুব চমৎকার ছেলে, আমি রিকমেন্ড করেছিলাম।
ডলি বলে, তাহলে যা শুনেছি তা সত্য।
আমি বলি, কী শুনেছো?
ডলি বলে, ও কয়েক সপ্তাহ বাইরে থাকবে, তখন তুমি ওর বউকে নিয়ে সময় কাটাবে। তোমাদের মধ্যে সেই আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে।
আমি বলি, বউটি তা মানবে কেনো?
ডলি বলে, বড়ো স্যারের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ কি সে ছাড়বে?
আমি বলি, আমি যদি চার মাসের জন্যে বিদেশ যাই, তখন প্রধান মন্ত্রী তোমার সাথে সময় কাটাতে চাইলে কি তুমি রাজি হবে?
ডলি কোনো কথা বলে না।
আমি বলি, ডলি, তুমি কি একটি কথা বুঝতে পারছো?
ডলি বলে, কী কথা?
আমি বলি, আমরা পরস্পরের কাছে অপরিচিত?
ডলি বলে, তোমার কাছে আমি অপরিচিত হতে পারি, কিন্তু তুমি আমার কাছে অপরিচিত নও।
আমি বলি, আমার কতোটুকু পরিচয় তুমি জানো?
ডলি বলে, সবটাই জানি।
আমি বলি, আসলে আমরা কেউ কাউকে জানি না; জানার জন্যেও কোনো। ব্যাকুলতা বোধ করি নি।
ডলি বলে, আমরা বিয়ে করেছি, তুমি আমার দেহ সবটা দেখেছো, আমি তোমার দেহ দেখেছি, আমরা একসাথে বসে খাই, একসাথে থাকি, তুমি বড়ো চাকুরি করো; এর বেশি জানার কী আছে?
আমি বলি, তুমি কি জানো আমি কোন ঋতু পছন্দ করি?
ডলি বলে, আমাকে হাসালে। তুমি কোন ঋতু পছন্দ করো, তা জেনে আমার কী লাভ?
আমি বলি, আমি কি জানি তুমি কোন ঋতু পছন্দ করো?
ডলি বলে, তা তোমার জানতে হবে না।
আমি বলি, তুমি কি জানো আমার শরীরের কোনখানে মাঝেমাঝে ব্যথা করে?
ডলি বলে, তোমার শরীরে আবার ব্যথা আছে না কি; আমার তো মনে হয় লোহা দিয়ে তৈরি।
