হাফিজুদ্দিনের ভেতর থেকে খলখল খিলখিল হাসি উপচে পড়তে থাকে। ওই স্বাধীনতাটিকে আমারও একবার মনে পড়ে; ওই স্বাধীনতা হাফিজুদ্দিনকে পাঁচতারায় খাওয়াচ্ছে আর গেলাচ্ছে, এবং আমাকে কী করাচ্ছে? এ-পাঁচতারায় আগে কখনো আসি নি, তা নয়; তবে কখনো খেতে বা পান করতে আসি নি, এসেছি সরকারি অনুষ্ঠানে। ইংরেজিতে দু-তিনবার ক্ষুধার ওপর সভাপতিত্বও করেছি। হাফিজুদ্দিন আমাকে সরোবরের পাশে এক চমৎকার ছায়াচ্ছন্ন স্থানের দিকে নিয়ে যায়-সে কি আজো আমাকে দেয়ালের ছিদ্রের ভেতর দিয়ে বিস্ময়কর কিছু দেখাবে?–পথে পথে সে সালামের পর সালাম পেতে থাকে; আমার মনে হয় হাফিজুদ্দিন তার অফিসে ঢুকছে। আমি কি এই হাফিজুদ্দিনেরই কান মলতাম, এই হাফিজুদ্দিনই কি পড়া পারতো না? আমার ভেতরটা একটু শক্ত হয়ে উঠতে থাকে; মনে হতে থাকে এই কুৎসিত লোকটিকে আমি চিনি না, এই লোকটি কখনো আমার সহপাঠী ছিলো না; সে আমার অন্তরঙ্গ কেউ নয়। আমরা বসার সাথে সাথেই হাফিজুদ্দিন খাবার ও পানীয়র বিপুল নির্দেশ দিতে থাকে; আর আমি বোধ করতে থাকি যে লোকটির সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই;–এই লোকটি একটি হাফিজদ্দি, যার সাথে আমি বসতে পারি না।
হাফিজুদ্দিন বলে, দোস, তুমি তো দুনিয়ার অনেক পাঁচতারা দেখছো।
আমি বলি, হাফিজুদ্দিন সাহেব, আপনি আমাকে ‘দোস’ বলবেন না।
হাফিজুদ্দিন আমার কথা শুনে চমকে ওঠে, অনেকটা ভয় পেয়ে যায়।
হাফিজুদ্দিন বলে, জি ছার, আমার ভুল হইয়া গেছে, এখন থিকা ছারই বলবো।
প্রচুর খাবার ও পানীয় এসেছে; হাফিজুদ্দিন আমার জন্যে পানীয় ঢালতে শুরু করে; এবং একটি পানপাত্র এগিয়ে দিয়ে বলে, ছার, একটু খান।
হাফিজুদ্দিন তার পানপাত্রটি ধ’রে আছে, আমি শুরু করলে সে শুরু করতে পারে; তাই আমি শুরু করি না। পান করার কোনো ইচ্ছে আমার নেই; অনেকক্ষণ পর আমার ইচ্ছে হয়, আমি পাত্র তুলে পান করি, কোনো কথা বলি না। হাফিজুদ্দিন পান করার মুহূর্তের আনন্দব্যঞ্জক শব্দটি করতে গিয়ে থেমে যায়, আর তার উদ্দেশে ওই শব্দটি উচ্চারণ করতে আমার ঘেন্না লাগে।
হাফিজুদ্দিন বলে, ছার, আপনে আমার লগে আসছেন, এইটা আমার ভাইগ্য, এত সম্মান আমি আর পাই নাই।
আমি বলি, কিন্তু আপনি আমাকে কেনো এখানে নিয়ে এসেছেন?
হাফিজুদ্দিন বলে, ছার, বলার সাহস দিলে বলতে পারি, অইটা বলার জইন্যই তো আসছি।
আমি বলি, বলুন।
হাফিজুদ্দিন বলে, ছার, সরকার এক লাখ টান চাউল আনবো থাইল্যান্ড থিকা, কাজটা আপনারই হাতে, আমরা কামটা পাইতে চাই।
আমি কোনো কথা বলি না।
হাফিজুদ্দিন বলে, বারো পার্সেন্ট আমরা দিতে রাজি আছি, ছার, আপনে রাজি হইলে আইজই লাখ পাঁচেক দিতে পারি, গাড়িতে আছে।
আমি পান করতে থাকি, কোনো কথা বলি না।
হাফিজুদ্দিন বলে, খাইতে থাকেন ছার, খাইতে খাইতে ভাবেন ছার, কয়েক গেলাশ খাইলেই ডিসিশন নিতে পারবেন, খান ছার।
আমি পান করতে থাকি। হাফিজুদ্দিন গেলাশের পর গেলাশ শেষ করছে, আমি অতো পেরে উঠছি না, আমার ভালো লাগছে।
হাফিজুদ্দিন বলে, খাইলে মনডা ঠাণ্ডা হয়, দুনিয়ার সব মাইনষেরে ভাল লাগে, আমি সেইজন্য সন্ধ্যা হইলেই খাইতে আসি, খান ছার, আমারে আপনার ভাল লাগবো।
আমি বলি, আপনাকে আমার খারাপ লাগছে না।
হাফিজুদ্দিন বলে, কথাটা শুইন্যা বুকটা ভইরা গেল, খান ছার, কামটা তাইলে আমরাই পামু।
আমি পান করতে থাকি, কথা বলি না, ভাষা আমার কাছে বিরক্তিকর মনে হয়।
হাফিজুদ্দিন বলে, চাইলে আপনে ছার এই হোটেলেই আইজ রাইত থাকতে পারেন, আমি এখনই সব ব্যবস্থা কইর্যা দিমু।
আমি কোনো কথা বলি না, মানুষকে আমার ভালো লাগতে শুরু করেছে।
হাফিজুদ্দিন বলে, তাইলে একটা সুটের ব্যবস্থা করি, ছার?
আমি বলি, না, দরকার নেই।
হাফিজুদ্দিন বলে, আপনে চাইলে দুই-একটা হিরোইনেরও ব্যবস্থা করতে পারি, ছার, দুই-তিনটা হিরোইনও আমাগো কারবারে আছে; কইলজার টুকরা, আর জানের দুশমনের হিরোইন দুইটার মধ্যে কোনটা আপনার পছন্দ?
আমি কোনো কথা বলি না, পান করতে আমার বেশ লাগছে, হিরোইন ভালো লাগছে না।
হাফিজুদ্দিন বলে, বুক ত আপনার পছন্দ, আমার মনে আছে, ছার, কইলজার টুকরার হিরোইনটার বুক দুইডা পাহাড়ের মতন; অই দুইডা লইয়া হিরোইনটা হাঁটতে পারে না, অই দুইডা অর বুকে না হইয়া পিঠে হইলেই অর সুবিধা হইত।
আমি পান করতে থাকি, পাঁচ লাখ এক সাথে দেখতে কেমন ভাবতে থাকি।
হাফিজুদ্দিন বলে, জানের দুশমনের হিরোইনটা খ্যালে ভাল, ছার, তারে আমরা কই বেডকুইন, এগারোজনের লগে একলাই খ্যালতে পারে, ছার।
আমি পান করতে থাকি; পাহাড় আর কুইনের কথা ভাবতে আমার ভয় হয়।
আমি বলি, হাফিজুদ্দিন সাহেব, এখন আমি উঠবো।
হাফিজুদ্দিন বলে, ডিসিশনটা লইতে পারছেন, ছার? কামটা আমরা পামু ত?
আমি উঠে দাঁড়াই; হাফিজুদ্দিন আমার সাথে সাথে ওঠে, পেছনে পেছনে আসতে থাকে; পাঁচতারার কর্মচারী কমে গেছে, তবু সে দু-তিনটি সালাম পায়, সে ওইসব সালাম নেয় না, নিতে ভয় পায়।
গাড়িতে ওঠার আগে হাফিজুদ্দিন বলে, ছার, এইখানে ঢোকনের আর বাইর হওনের সময় আমার অই স্বাধীনতাটার কথা মনে পড়ে, অই স্বাধীনতাটা না হইলে এইডার দারোয়ানও হইতে পারতাম না।
গাড়ি চলতে শুরু করে।
আমার বাসার সামনে গাড়ি থামলে হাফিজুদ্দিন জিজ্ঞেস করে, ডিসিশনটা লইতে পারছেন, ছার?
