আমি বলি, না, না, ভয় পাচ্ছি না।
হাফিজুদ্দিন দেয়ালের ছিদ্রে চোখ দেয়, এবং আমাকে বলে, দোস, আয়, দেখ, এমন জিনিশ তুই আর দেখছ নাই, তর সারাদিন দেখতে ইচ্ছা করবো।
আমি ছিদ্রে চোখ দিতেই আমার চোখ অপূর্ব আলোর আক্রমণে অন্ধ হয়ে যায়। আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি, এবং চোখ সরিয়ে নিয়ে দু-হাতে চোখ চেপে ধরি।
হাফিজুদ্দিন বলে, দোস, চোখ সরাইছ না, ভালো কইর্যা দেখ, এই জিনিশ দেখতে দেখতেই ত আমার আর বই খোলতে ইচ্ছা করে না।
আমি আবার ছিদ্রে চোখ দিই। ছিদ্রটা ছোটো, একসাথে দু-চোখ দেয়া যায় না; একবার এক চোখ দিয়ে দেখতে হয়, আরেকবার আরেক চোখ দিয়ে। আমি দেখতে থাকি।
হাফিজুদ্দিন বলে, দোস, দেখতে পাইতাছছ?
আমি কথা বলি না, দেখতে থাকি; আমি অন্ধ হয়ে যাই, আমার দু-চোখে অজস্র চোখ জন্ম নিতে থাকে, অজস্র চোখ দিয়ে আমি দেখতে থাকি; এতো আলো, এতো জ্যোত্সা, এতো সৌন্দর্য আমি কখনো দেখি নি।
গোশলখানায় তিনটি মেয়ে গোশল করছে। তাদের বুকের তিন জোড়া স্ফীত আলোকিত গলিত চাঁদ থেকে জ্যোত্সা ঝরে পড়ছে। জ্যোৎস্নার কম্পনে আমার চোখ অন্ধ হয়ে যেতে থাকে, মাংস খসে পড়তে থাকে, রক্ত সমস্ত নালি ভেঙে ফিনকি দিয়ে ছুটতে থাকে। আমি দেয়ালের ছিদ্র থেকে চোখ সরিয়ে চোখ বন্ধ করে জোড়ায় জোড়ায় জ্যোৎস্না দেখতে থাকি।
হাফিজুদ্দিন বলে, তোমার লগে অনেক বছর দেখা নাই, পড়ালেখা আর করতে পারি নাই, তবে ভালই আছি।
আমি বলি, কী করছো তুমি আজকাল?
হাফিজুদ্দিন বলে, ব্যবসাপাতি করছি, ভালই করতাছি; গাড়িবাড়িও কইর্যা ফালাইছি। আইজ তোমারে সন্ধ্যায় আমি একটু খাওয়াইতে চাই।
আমি বলি, খাওয়ানোর কী হলো? কিছু বলতে চাইলে এখানেই বলো।
হাফিজুদ্দিন বলে, না, দোস, এইখানে বলুম না; খাইতে খাইতে বলুম। তুমি সন্ধ্যায় বাসায় থাইক।
সন্ধ্যায় হাফিজুদ্দিন আসে; তাকে আমার বেশ ভালো লাগে, যেমন লাগতো এইটে পড়ার সময়; আমার মনে হতে থাকে সে হয়তো আমাকে এমন কিছু দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে যা আমি আগে দেখি নি। তার সাথে আমি হেসে হেসে কথা বলতে বলতে গাড়িতে উঠি; এবং উঠেই খুব গোপনে খুব মসৃণভাবে হাফিজুদ্দিনকে ঈর্ষা করতে থাকি। তাকে ঈর্ষা করতে আমি চাই না; বারবার সুখী হতে চাই ছেলেবেলার বন্ধুকে পেয়ে; নিজেকে বোঝাতে চাই যে হাফিজুদ্দিন আমার বন্ধু, সে জীবনে সফল হয়েছে। এটা আমার জন্যে অত্যন্ত সুখের; ইচ্ছে করলেই আমি তার মতো সফল হতে পারতাম, সে আমার মতো সফল হতে পারতো না। আমি নিজেকে বোঝাই যে হাফিজুদ্দিনের কাছে কোনোদিন আমার যাওয়ার দরকার হবে না, কিন্তু আমার কাছে তাকে আসতে হয়েছে, হয়তো আরো আসতে হবে; হাফিজুদ্দিন যতোগুলো গাড়িই করুক, সে আমার নিচেই আছে, এবং থাকবে। কিন্তু আমি আর আগের মতো হাসতে পারি না যদিও হাসতে চাই, হাফিজুদ্দিনের ‘দোস’ সম্বোধন আমার ভালোই লাগছিলো, কিন্তু এখন আর ভালো লাগছে না; মনে হতে থাকে গাড়িটা আমার নয়, হাফিজুদ্দিনের; এমন একটি গাড়ি কখনো আমার হবে না। হাফিজুদ্দিন এইটের পর আর পড়তে পারে নি; আমি তার কান মলতাম, এখন আমি তার গাড়িতে চলছি; এর আগে এমন একটা সুখকর গাড়িতে আমি চড়ি নি; আর তখনি হাফিজুদ্দিন গাড়ি নিয়েই কথা বলতে শুরু করে।
হাফিজুদ্দিন বলে, দোস, গাড়িটা নতুন কিনলাম; আমার অন্য গাড়িটায় এসি নাই, এসি ছাড়া আমি টিকতে পারি না।
আমি শুনতে পাই নি এমনভাবে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকি।
হাফিজুদ্দিন বলে, সেইজন্য বেডরুমেও আমি এসি লাগাইছি।
এবার আমাকে শুনতেই হয়, বেশিক্ষণ আমি অন্য দিকে তাকিয়ে থাকতে পারি না; অন্য দিকে তাকিয়ে থাকতে আমার অস্বস্তি লাগে।
আমি বলি, তুমি বেশ সফল হয়েছে হাফিজুদ্দিন।
হাফিজুদ্দিন বলে, কী বলো, দোস?
আমি বলি, তুমি বেশ সফল হয়েছে।
হাফিজুদ্দিন বলে, ট্যাকাপয়সা করছি কি না তা বলতাছো?
আমি বলি, হ্যাঁ।
হাফিজুদ্দিন বলে, দোস, ল্যাখাপড়া জানি না, তোমাগো মতন অফিসারদের লগে সহজে খাতির জমাইতে পারি না, তাগো লগে ট্যাকাপয়সা দিয়াই খাতির জমাইতে হয়, তবে আল্লার রহমতে কিছু টাকাপয়সা করছি।
আমি বলি, আমাকে তোমার এতোদিন পর কেনো মনে পড়লো?
হাফিজুদ্দিন বলে, খাইতে খাইতে তা তোমারে বলবো; এখন তুমি কও গুলশান বনানীতে কয়টা বাড়ি বানাইছো, ব্যাংকে কয় কোটি জমাইছো, আর গাড়ি কয়টা করছো?
আমি বলি, এসব আমি কিছুই করতে পারি নি হাফিজুদ্দিন।
হাফিজুদ্দিন চিৎকার করে বলে, এইটা কী শুনাইলা দোস, তোমার মতন অফিসারগো নিউইয়র্কেও বাড়ি আছে, আর তোমার একটা গাড়িও নাই?
আমি বলি, না, সত্যিই নেই।
হাফিজুদ্দিন বলে, শুনছি তুমি খাওটাও না; আমাগো কাছে সব অফিসারগো লিস্টি আছে, তারা কত খায় তার হিশাব আছে, আমরা জানি তুমি খাও না; না খাইলে বাড়িগাড়ি কেমনে হইবো, দোস?
আমি বলি, আমার সম্পর্কে তোমাদের ধারণা খুব খারাপ, তাই না?
হাফিজুদ্দিন বলে, খোঁজ নিয়া দেখলাম তুমি আর আমি ইস্কুলে ক্লাশমেট আছিলাম, তুমি আমার কান মলতা, আর আমি তোমারে এমন জিনিশ দেখাইছিলাম যা তুমি আগে দেখো নাই।
গাড়ি একটি পাঁচতারা হোটেলের ভেতরের এলাকায় এসে থামে।
হাফিজুদ্দিন বলে, দোস, এই হোটেলে আমি আইজকাইল প্রত্যেক সন্ধ্যায় খাই। আর গিলি, কিন্তু অই স্বাধীনতাটা না হইলে এইডার দারোয়ানও হইতে পারতাম না।
