হাফিজুদ্দিন বলে, দোস, আমারে চিনতে পারছো ত?
আমি বলি, চেনা চেনা লাগছে, ঠিক মনে করে উঠতে পারছি না, তবে এখনি পারবো।
হাফিজুদ্দিন বলে, পরিচয়টা পরে দিতেছি, তবে তুমি আমারে তাজ্জব কইরা দিছো।
আমি বলি, অবাক হওয়ার কী আছে?
হাফিজুদ্দিন বলে, আসনের সময় বুকটা কাঁপতেছিলো তোমার মতন অফিসারের বাসায় ঢোকতে পারুম কি না।
আমি বলি, কেনো, পারবে না কেনো?
হাফিজুদ্দিন বলে, আরে, তোমার মতন অফিসারের বাসায় ঢোকতে হইলে প্রথম আধঘণ্টা বেল বাজাইতে হয়, তিনচাইরটা কামের লোকের কাছে পরিচয় দিতে হয়, তারপর দেখা করনের জইন্য ড্রয়িংরুমে দুই ঘণ্টা বসে থাকতে হয়।
আমি বলে, না, না, আমি অতো বড়ো অফিসার নই।
হাফিজুদ্দিন বলে, তুমি কতো বড়ো অফিসার তা আমি জানি, তাই তো তোমার কাছে আইলাম, দোস। তবে আমারে তোমার মনে হয় ভাল কইরা মনে নাই।
আমি বলি, তোমার চেহারাটা মনে পড়ছে।
হাফিজুদ্দিন বলে, আমি হইলাম হাফিজুদ্দিন, তোমার লগে এইট পর্যন্ত পড়ছিলাম, বাবায় মইরা গেল বইল্যা আর পড়তে পারি নাই। তবে তোমার লগে আমার খাতির আছিল, তোমারে আমি ভালবাসতাম।
আমি বলি, এখন কোথায় আছো?
হাফিজুদ্দিন বলে, নিজের পরিচয়টা আগে দিয়া লই, তারপর সব কই। তোমার কি মনে আছে পড়ায় না পারলে এক ছার কান মলাইতো?
আমি বলি, হ্যাঁ, বেশ মনে আছে।
হাফিজুদ্দিন বলে, তুমি যার কান বেশি মলতা তার কথা মনে আছে?
আমি বলি, দেখি, ভেবে দেখি।
হামিদ স্যারকে মনে পড়ে। তিনি আমাদের ইস্কুলে কয়েক মাস ছিলেন; এসেই নিয়ম করেছিলেন যে পড়ায় পারবে সে যারা পড়ায় পারবে না তাদের কান মলবে। তিনি নিজে কান মলতে আর বেত মারতে পছন্দ করেন না, তবে কান মলা দেখতে পছন্দ করেন। তিনি আমাদের উত্তমভাবে কানমলার কৌশল শিখিয়ে দিয়েছিলেন : কানের লতি দু-ভাঁজ করে জোরে ঘষা দিতে হবে, তাতে কান আর সারা শরীর আগুনের মতো জ্বলে উঠবে; কিন্তু আগুন দেখা যাবে না।
হাফিজুদ্দিন বলে, আর ভাবো কী দোস, আমার কানই বেশি মলতা; তবে আমার কানটা তুমি একটু আস্তে মলতা।
আমি বলি, হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়ছে। কান মলার জন্যে আমি খুব দুঃখিত।
হাফিজুদ্দিন বলে, দুঃখ পাওনের কিছু নাই, দোস, এখন মনে পড়লে মজাই লাগে; তারপর সে খুব আস্তে করে বলে, তোমারে আমি জীবনে প্রথম মাইয়ামাইনষের বুক দেখাইছিলাম, দোস্ত মনে আছে?
আমি বলি, ওহ, তুমি সেই হাফিজ, সেই হাফিজুদ্দিন!
হাফিজুদ্দিন আমাকে জড়িয়ে ধরে, আমিও জড়িয়ে ধরে সুখ পাই।
সেদিন আমি হাফিজুদ্দিনের কান খুব জোরে মলেছিলাম; হাফিজুদ্দিনের কানের লতি বেশ শক্ত হওয়া সত্ত্বেও তার ব্যথা লেগেছিলো।
ছুটির পর হাফিজুদ্দিন আমাকে বলেছিলো, দোস, তর লগে একটা কথা আছে।
আমি বলেছিলাম, বলো।
হাফিজুদ্দিন বলেছিলো, এখানে বলন যাইব না, একটু অই দিকে ল।
আমরা মাঠের এককোণে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। হাফিজুদ্দিন বলেছিলো, দোস, পড়ায় আমি পারি না, তুই পারছ, তুই আমার কানটা একটু আস্তে মলিছ, তাইলে তরে আমি একটা জিনিশ দেখামু।
আমি বলেছিলাম, কী জিনিশ?
হাফিজুদ্দিন বলেছিলো, এমন জিনিশ যা তুই জীবনেও দেখছ নাই, দেখলে আর ভুলতে পারবি না, এমন সোন্দর জিনিশ আর অয় না।
আমি বলেছিলাম, কখন দেখাবে?
হাফিজুদ্দিন বলেছিলো, কাইল ছুটি আছে, তোমারে আমি সকাল আটটার সময় গিয়া লইয়া আসুম, তারপর দেখামু।
পরদিন আটটায় হাফিজুদ্দিন আসে; কিন্তু ছুটির দিনে অতো ভোরে আমি বেরোবে কীভাবে? আমরা একটি বুদ্ধি বের করি।
আমি মাকে বলি, রহমান স্যার আজ আমাদের তার বাসায় যেতে বলেছেন।
মা বলে, স্যাররা আজকাল তো ছাত্রদের বাসায় যেতে বলে না।
আমি বলি, রহমান স্যার বলেছেন এখন থেকে ছুটির দিনে তার বাসায় যেতে হবে। তিনি আমাদের পড়াবেন।
মা বলে, স্যারদের মাথা খারাপ হলো না কি?
আমরা দুজন বেরিয়ে যাই। হাফিজুদ্দিন আমাকে তাদের বাসায় নিয়ে যায় :
পুরোনো শহরের একটি খুব পুরোনো দালান, কয়েক শো বছরের পুরোনো গন্ধ আর অন্ধকার জমে আছে ভেতরে, ওই গন্ধ আর অন্ধকার আমার ভালো লাগতে থাকে, ভেতরে পা দিয়েই আমি গভীরতর অন্ধকারে পড়ি; একটু দাঁড়াই, একটু গন্ধ আর একটু অন্ধকার আমি ভেতরে টেনে নিই: তারপর আবছা আলো দেখতে পাই। হাফিজুদ্দিন আমাকে আবছা অন্ধকারের ভেতর দিয়ে দু-তিনটি ঘর পেরিয়ে একটি বাকানো লোহার সিঁড়ির কাছে এনে সাবধানে ওপরে উঠতে বলে, সে না বললেও আমার সাবধানতার কোনো অভাব ঘটতো না; আমি সিঁড়ির রেইলিং ধরে আস্তে আস্তে পা ফেলে মাথা নিচু করে তার পেছনে পেছনে উঠতে থাকি; এবং সিঁড়ির পর মাথা নিচু করে অনেকক্ষণ হেঁটে একটি অন্ধকার ঘরে ঢুকি। খুব ছোটো ঘর; আমার মনে হয় অন্ধকার জমিয়ে রাখার জন্যে এ-ঘরটি তৈরি করা হয়েছিলো; হাফিজুদ্দিন আমাকে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রেখে তারপর চোখ খুলতে বলে। আমি অনেকক্ষণ বন্ধ করে রেখে চোখ খুলে একটু আবছা আলো, মেঝেতে বিছানো হাফিজুদ্দিনের ছেঁড়া ময়লা বিছানা, বালিশ, ছেঁড়া কাঁথা, এদিকে সেদিকে ছড়ানো কয়েকটি বইখাতা, একটা হারিকেন, কয়েকটি ভাঙা মোম দেখতে পাই। ঘরটির দেয়ালে একটা বড়ো ছিদ্রও দেখতে পাই, যা দিয়ে গলগল করে বাইরের আলো ঢুকছে।
হাফিজুদ্দিন বলে, আন্ধারে ভয় পাইছ না দোস, বাইরে আলো আছে।
