ডলি বলে, আমাদের এই পাশাপাশি শোয়া নিরর্থক, কী হবে পাশাপাশি শুয়ে, আমার আর ইচ্ছে করে না।
আমি বলি, পাশাপাশি শোয়ার মধ্যে কোনো অর্থ আছে বলে তো আমি জানি না।
ডলি বলে, তাহলে শোও কেনো?
প্রশ্নটিকেই নিরর্থক মনে হয় আমার; তাই বলি, আমি জানি না।
ডলি বলে, এও জানো না? তাহলে কী জানো?
আমি বলি, বেশি কিছু না।
ডলি বলে, আমি তো পাশের বাসার লোকটির সাথে এক বিছানায় শুতে পারি না, এটা জানো?
আমি বলি, জানি; তবে ইচ্ছে হলে তুমি শুতে পারো।
ডলি বলে, এমন করলে এরপর আমার ইচ্ছে হবে।
আমি বলি, কী করছি?
ডলি বলে, তাও বুঝতে পারছো না?
আমি বলি, না তো।
ডলি বলে, পাশাপাশি শুয়ে থাকলেই দেহ জুড়িয়ে যায় না, আমার একটি দেহ আছে, তার ক্ষুধা আছে।
আমি বলি, ক্ষুধা?
ডলি বলে, তোমার মনে আছে ক-মাস ধরে আমরা কিছু করি নি?
আমি বলি, না, হিশেব করি নি।
ডলি বলে, তুমি হয়তো বাইরে কিছু করো, তাই তোমার মনে নেই; আমার মনে আছে, আমি তো বাইরে কিছু করতে পারি না।
আমি বলি, করতে পারো।
ডলি বলে, করতে পারো বললেই মেয়েমানুষ করতে পারে না।
আমি বলি, তুমি ঘুমোও, আমি একটু পড়ি।
ডলি বইটি ছুঁড়ে ফেলে দেয়; বলে, বিছানা শোয়ার জন্যে, পড়ার ইচ্ছে হলে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে কোনো হলে গিয়ে ওঠো।
আমি বইটি কুড়িয়ে বসার ঘরে গিয়ে বসি। বইটি পড়তে শুরু করেই আমার ভেতরে অদ্ভুত শান্তি নামে; শব্দটি ঠিক হলো না, ওই অনুভুতির জন্যে আমি কোনো শব্দ জানি না; ওই বোধকে সুখও বলা ঠিক হবে না। শান্তি বা সুখ ওই অনুভূতির কাছে খুব গরিব শব্দ। তা সুখের থেকে, জীবনের থেকে বেশি; শিশুর মৃত্যুর থেকে, নারীর সাথে পাশাপাশি শোয়া আর কিছু করার থেকে বেশি। লোকটি বড়ো কিছু করতে চায় নি, শুধু তার ছেলেবেলার কথা বলেছে; নিজের কথা বলেই নি, বলেছে গাছপালা নদী জল পুকুর মাছ মেঘ খেজুরগাছ শিশির কুয়াশা ধান বৃষ্টির কথা। লোকটি কী করে তার ছেলেবেলাকে এমনভাবে মনে রেখেছে? তার মনে ছেলেবেলা এমনভাবে ঢুকে আছে কীভাবে? আমি আমার ছেলেবেলাকে মনে করতে চাই, পারি না; তাতে কোনো বৃষ্টি নেই গাছ নেই জল নেই সবুজ নেই মেঘ নেই কুয়াশা নেই শিশির নেই। আমার কোনো বন্ধু ছিলো? মনে করতে পারি না। কোনো কিশোরীকে দেখে কোনো সন্ধ্যায় হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম আমি? মনে পড়ে না। একরাশ জোনাকিপোকার পেছনে পেছনে ছুটেছিলাম? জোনাকিপোকা আমি কখনো দেখিই নি, শুধু নামটি জানি। শীতে কুয়াশার ভেতর দিয়ে শিশিরভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে আমি কখনো ছুটেছিলাম? শিশির কাকে বলে? ঘাস কেনো শিশিরে ভেজে? কুয়াশা কাকে বলে? ঘাস কী? আমি মনে করতে পারি না। কিন্তু লোকটির সাথে আমি শিশিরে ভিজতে থাকি, কুয়াশায় ভিজতে থাকি, জোনাকিপোকার পেছনে পেছনে দৌড়াতে থাকি; দেখতে পাই বাঁশবাগানের মাথার ওপর একটা ভয়ঙ্কর চাঁদ উঠেছে।
বই পড়তে পড়তে আমার কখনো ঘুম আসে না; কখনো আমি পাশে বই খোলা রেখে ঘুমিয়ে পড়ি নি। যখন আমি ঘুমোতে চাই তখন খুব যত্নের সাথে আমি বই বন্ধ করি, ঠিক জায়গায় রাখি; আজো যত্নের সাথে বইটি বন্ধ করে ঠিক জায়গায় রাখার কথা মনে হয়; তবে রাখতে পারি না। ঘুম পাচ্ছে, কিন্তু আমি কোথায় ঘুমোবো? ডলি কি জেগে আছে? জেগে থাকলে তার পাশে গিয়ে আমি ঘুমোতে পারবো না, আমার ইচ্ছে করছে না। ডলি কি ঘুমিয়ে আছে? ঘুমিয়ে থাকলে ঘুমন্ত একটি নারীর পাশে গিয়ে চুপচাপ আমি শুয়ে পড়তে পারবো না, আমার ইচ্ছে করছে না। তাহলে আমি বসার ঘরেই ঘুমিয়ে পড়বো? শয্যার বাইরে আমি কখনো ঘুমিয়েছি বলে মনে পড়ে না; আমি মেঝেতে ঘুমিয়ে পড়তে পারবো না। ডলি ক্ষুধার কথা বলছিলো? শরীর না-জুড়োনোর কথা? আমি কি ক্ষুধা বোধ করছি, আমার শরীর কি উত্তপ্ত হয়ে থাকছেঃ আমি কি বাইরে জুড়োই? আমার ঘুম পাচ্ছে; মেঝেতেই আমি শুয়ে পড়বো? মেঝেতে আমি শুতে পারি না। বসে থাকবো? বসেও থাকতে পারি না। গিয়ে দেখি ডাল ঘুমিয়ে পড়েছে; বিছানায় উঠতে আমার ভয় হয়। অচেনা কেউ ভেবে ডলি চিৎকার করে উঠতে পারে। আমি নিঃশব্দে পাশে শুই, ডলি চিৎকার করে ওঠে না। কিছুক্ষণ আগেই ঘুম পাচ্ছিলো, এখন পাচ্ছে না; অদ্ভুত লাগে শরীরটাকে। ঘুম আসে না; টের পাই শরীরে একটা ক্ষুধা জেগে উঠছে, হঠাৎ শরীরের ভেতরে একটা দেশলাই কাঠি জ্বলে উঠলো; তার আগুন গিয়ে লাগলো খড়কুটোতে, খড়কুটো পুড়তে শুরু করলো। ডলির ভেতরও এমন খড়কুটো পোড়ে, এমনভাবে দেশলাই জ্বলে ওঠে; আগুনের দুর্দান্ত ক্ষুধা জ্বলে? ডলিকে জাগাবো? ডলিকে আমি জাগাতে পারবো না; বলতে পারবো না তোমার মতো একটা ক্ষুধা আমার দেহেও জ্বলছে। এ-আগুন আমার ব্যক্তিগত, এ-ক্ষুধা আমার ব্যক্তিগত; কারো সাথে আমি তা ভাগ করে নিতে পারি না; এবং তখনি আমার মনে পড়ে দিগন্তের ওপারে ফেলে-আসা আমার সেই ক্ষুধাঝলকিত আগুনউজ্জ্বল বজ্রবিদ্যুৎচৌচির বিস্ময়কর দিনগুলোকে। আমি সেই বজ্রে ফিরে যাই সেই বিদ্যুতে ফিরে যাই, ডলি জানতে পারে না, বজ্র আমাকে ফাড়তে থাকে বিদ্যুৎ আমাকে ছিঁড়তে থাকে ক্ষুধা আমাকে ঝলসাতে থাকে আগুন আমাকে পুড়ে পুড়ে সোনার মতো গলাতে থাকে;–আমি ঘুমিয়ে পড়ি।
হাফিজুদ্দিন একদিন হঠাই এসে উপস্থিত হয়; তার চেহারাটি কিছুটা চেনা লাগেলেও আমি আর কিছু মনে করতে পারি না। হাফিজুদ্দিন ঢুকে বসার ঘরে বসার সাথে সাথেই আমি বসার ঘরে যাই; দেখি আমার দ্বিগুণ মোটা গোলগাল বেঁটে কালো একটি লোক বসে আছে। আমাকে দেখেই সে লাফিয়ে ওঠে, তার মাংসল মুখমণ্ডল থেকে একরাশ কালো উজ্জ্বল হাসি উপচে পড়ে।
