১ম যুগ্ম জিজ্ঞেস করেন, গাড়িটি আপনাকে নামাতে গিয়েই সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এটা কি সত্য?
আমি বলি, জি, স্যার।
২য় যুগ্ম জিজ্ঞেস করেন, মাইক্রোবাসটি রক্ষা করার জন্যে আপনি কোনো চেষ্টা করেন নি, এটা কি সত্য?
আমি বলি, জি, স্যার।
অতিরিক্ত বলেন, তাহলে আমাদের তদন্ত এখানেই শেষ হলো।
আমি বলি, স্যার, আমার কিছু কথা ছিলো।
অতিরিক্ত বলেন, বলুন।
আমি বলি, ড্রাইভার একটি শিশুকে চাপা দিয়েছিলো, শিশুটি মারা গেছে।
১ম যুগ্ম বলেন, শিশুর মৃত্যু গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আমি বলি, আমি তখন গাড়িতে ছিলাম না।
২য় যুগ্ম বলেন, আপনি গাড়িতে ছিলেন না, তাও গুরুত্বপূর্ণ নয়; কথা হচ্ছে গাড়িটি আপনাকে নামাতে গিয়েছিলো।
আমি বলি, শিশুটি খুব সুন্দর ছিলো, স্যার।
১ম যুগ্ম বলেন, তাতে কিছু যায় আসে না।
আমি বলি, সুন্দর মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না, স্যার।
তিনি বলেন, সৌন্দর্য এবং মানুষ আমাদের বিবেচনার বিষয় নয়।
আমি বলি, শিশুটি তার পিতামাতার একমাত্র সন্তান ছিলো, স্যার।
২য় যুগ্ম বলেন, মাস দশেকেই আরেকটি শিশু তারা উৎপাদন করতে পারবে, কোনো নিষেধ নেই।
অতিরিক্ত বলেন, কিন্তু স্ত্রীদের গর্ভে আমরা মাইক্রোবাস উৎপাদন করতে পারি না।
আমি উঠে আসি। ডলি কি একটা মাইক্রোবাস গর্ভধারণ করতে পারবে? ডলিকে আজ বলবো, আমি একটা সন্তান চাই, মানুষ নয়; একটা মাইক্রোবাস। শুধু মাইক্রোবাস কেনো? ডলির গর্ভে আমি রেলগাড়ি জাহাজ উড়োজাহাজ হেলিকপ্টার উৎপাদন করতে চাই। ডলির গর্ভকে, আমার সাধ হয়, একটা শক্তিশালী কারখানায় পরিণত করতে, যেখানে উৎপাদিত হবে ট্যাংক, ট্যাংকার, বোমারু বিমান, মিসাইল, আণবিক বোমা। ডলির গর্ভকে একটা তেলের খনিতে পরিণত করতে চাই আমি, আমাদের সঙ্গমে প্রতিদিন যা প্রসব করবে লাখ লাখ ব্যারেল পেট্রোলিয়ম। ডলির গর্ভে আমি উৎপাদন করতে চাই টমোটা, টাটা, ফোক্সওয়াগন, মার্সিডিজ; রক্তমাংসের ঘিনঘিনে মানুষ নয়, আমাদের সঙ্গমে আমার ঔরসে ডলির গর্ভে উৎপাদিত হবে সুপারসোনিক বিমান, আণবিক সাবমেরিন, জগন্নাথ ট্রাক, শীততাপনিয়ন্ত্রিত বাস, রঙিন টেলিভিশন, দশতলা দালান, নদীর ওপর সাড়ে তিন কিলোমিটার ব্রিজ।
কিন্তু শিশুটিকে একবার দেখতে ইচ্ছে হয় আমার, এবং আমার হাসি পায় যে শিশুটিকে আমার দেখতে ইচ্ছে করছে। শিশুর অভাব নেই চারপাশে, রাস্তায় নামলেই একটার পর একটা শিশু আমি দেখতে পারি। কিন্তু আবার আমার ওই ইচ্ছেটা হয়। কেনো আরেকটুকু ভালো করে দেখলাম না? এখন ও কোথায় কতোটা মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। ওর মা কি কবরের পাশে বসে কাঁদছে? ওর জানাজায় কি আমি গিয়েছিলাম? না, যাই নি; যাওয়ার কথা মনে পড়ে নি; পড়লেও যেতাম না। আমি কখনো কোনো জানাজায় যাই নি; সেখানে দাঁড়িয়ে কী বলতে হয় জানি না; বললে কী হয় জানি না। ওর মতো ছেলেবেলায় যদি আমি কোনো মাইক্রোবাসের পেছনে লুকোতাম তাহলে এখন আমি এখানে থাকতাম না। ও নিশ্চয়ই কোনো গোরস্থানে শুয়ে আছে। ঢাকায় কততগুলো গোরস্থান আছে? শুধু একটি গোরস্থানই আমি চিনি। সেটা দেখলে আমি অসুস্থ বোধ করি। ও কি সেখানকার মাটির নিচেই পড়ে আছে? ওর জন্যে আমার মায়া হয়। ও কি জানে ওর মার ক্ষতিপূরণ হয়ে গেছে? আমি বেরিয়ে পড়ি, নোংরা গোরস্থানটির গেইটে নামি। যতোই ভেতরে ঢুকতে থাকি, ততোই আমার নোংরা লাগতে থাকে। আমি ভেবেছিলাম ভেতরে শান্তি বিরাজ করবে, যা মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দেবে; কিন্তু যতোই এগোতে থাকি ততোই চারপাশ আমাকে নোংরা জীবনকে মনে করিয়ে দিতে থাকে। এখানে যারা শুয়ে আছে মৃত্যুর পরও তারা সুখ পাচ্ছে না; জীবনের অসুখ তাদের ঘিরে আছে। তারা জীবনকে অসুস্থ করে রেখেছিলো, এখন মৃত্যুকেও অসুস্থ করে রাখছে। গোরস্থানটিকে করে তুলেছে কবরের বস্তি। আমি নতুন কবরগুলোর দিকে এগোতে থাকি; একটি লোকের থেকে জেনে নিই গতকালের শিশুদের কবরগুলো কোথায়। একটি নয়, দশবারোটি শিশুদের কবর; প্রায় পাশাপাশি তারা মাটির নিচে লুকিয়ে আছে, ওপরে বাঁশের বেড়া ঝকঝক করছে-ওগুলো হয়তো। জানে না ওদের নিচে ঘুমিয়ে আছে শিশুরা। কিন্তু কোন কবরের খোঁজে আমি এসেছি?
কোন কবরটি ওর? কোন কবরে ও মাইক্রোবাসের পেছনে লুকিয়ে আছে? আমি এক কবর থেকে আরেক কবরে যেতে থাকি। আমার মনে হয় এখনি কবরের মাটিতে ওর মুখের ছাপ দেখতে পাবো। তবে ওর মুখটি কি আমার মনে আছে? মুখ দেখে কি চিনতে পারবো ওকে? বহু দিন আমি ভালো করে কোনো শিশুর মুখ দেখি নি। শিশুর মুখ কেমন? আমি শুধু ছিটকে পড়া একবাটি মগজ দেখতে পাই, পাশে একদাগ রক্ত; ওর মুখ আমার মনে পড়ে না। আমি ওর মুখটি খুঁজতে থাকি, আমার ভেতরে ওর মুখ খুঁজে পাই না। আমার ভেতরে কতো মাটি জমেছে যে মুখটি আমি দেখতে পাচ্ছি না? আমি কোনো শিশুর মুখই মনে করতে পারি না; আমার চোখে শুধু মড়ার খুলি ভেসে উঠতে থাকে। প্রত্যেকটি কবরই কি ওর? প্রত্যেকটি কবরের মাটির নিচে, বাঁশের বেড়ার তলে, ও মাইক্রোবাসের পেছনে লুকানোর চেষ্টা করছে? কবরের পাশে এলে প্রার্থনা করতে হয়? আমি কোনো প্রার্থনা জানি না; আমার ভেতরে কোনো প্রার্থনা জাগছে না। ও কি জানে ওর মার ক্ষতিপূরণ হয়ে গেছে? একটি লোক পাশে এসে দাঁড়ায়, সে বলছে সে প্রার্থনা করতে জানে; পাঁচ টাকা লাগবে। আমি তাকে পাঁচটি টাকা দিই; লোকটি জানতে চায় কোন কবরের জন্যে প্রার্থনা করতে হবে; আমি বলি আমি জানি না।
