আমি বলি, বলুন।
তিনি বলেন, রহিমাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
আমি বলি, ক্ষতি? কার ক্ষতি? আর কিসের ক্ষতিপূরণ?
তিনি বলেন, এই যে রহিমার ছেলেটিকে তোমার ড্রাইভার খুন করেছে।
আমি বলি, একটি শিশু গাড়ির চাকার নিচে পড়ে মারা গেছে, একে কি আপনারা ক্ষতি বলছেন?
তারা সবাই চুপ করে যায়, তাদের মুখে আমি অপরাধবোধের আঁকাবাঁকা দাগ দেখতে পাই। তারা কেউ কথা বলে না।
এক বৃদ্ধ বলেন, হ্যাঁ, এটা তো ক্ষতিই।
আমি বলি, একমাত্র সন্তান মারা যাওয়াটা ক্ষতি?
বৃদ্ধ বলেন, আমাদের তো তাই মনে হয়।
ক্ষতি কাকে বলে? আমি আর ক্ষতি শব্দের অর্থ বুঝতে পারি না। আমার ইচ্ছে হয় অভিধান দেখি, কিন্তু কোনো অভিধানের নাম আমি মনে করতে পারি না।
আমি বলি, কীভাবে তার ক্ষতিপূরণ করা যেতে পারে?
এক বৃদ্ধ বলেন, পঞ্চাশ হাজার টাকা দিলে ওই ক্ষতিপূরণ হতে পারে।
আমি একটা কষ্ট বোধ করি, আর পরমুহূর্তেই আমার কোনো কষ্ট লাগে না।
আমি রহিমাকে জিজ্ঞেস করি, পঞ্চাশ হাজার টাকা দিলে আপনি কি আপনার ছেলেকে ফিরে পাবেন?
তিনি বলেন, না।
আমি বলি, আপনি কি টাকা চান?
তিনি বলেন, হ্যাঁ।
আমি বলি, আপনি কি আপনার ছেলেকে ভালোবাসতেন না?
তিনি চুপ করে থাকেন।
আমি সবাইকে বলি, গাড়ির নিচে পড়ে কেউ মরলে তার জন্যে কে দায়ী তা আমি জানি না।
এক সেবক বলে, ড্রাইভার দায়ী, আপনারা দায়ী।
আমি বলি, আমি ঠিক জানি না, তবে যে মারা গেছে সেও তো দায়ী হতে পারে। সেবকেরা চিৎকার করে ওঠে, কেনো সে দায়ী হবে? তার কোনো অপরাধ নেই। সে ছোট্ট শিশু। সে কোনো অপরাধ করে নি। সে দায়ী হতে পারে না।
আমি বলি, শিশুরাও অপরাধ করতে পারে।
সেবকেরা আবার চিৎকার করে, শিশুরা অপরাধ করতে পারে না; শিশুরা নিষ্পাপ, তারা দেবতা, তারা ফেরেশতা, তারা কোনো অপরাধ করতে পারে না। অপরাধ করেন আপনারা।
পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে যাচ্ছে; উত্তপ্ত পরিবেশ স্বাস্থ্যকর নয়, কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ারও সহায়ক নয়। তাই পরিবেশকে ভাবগম্ভীর করে তোলার উদ্যোগ নিতে এগিয়ে আসে কেউ কেউ।
এক সেবক ধীরস্থিরভাবে বলে, আপনি আমলা বলেই এমন কথা বলতে পারলেন, দেখতে পাচ্ছি আমলাদের চোখে শিশুরাও অপরাধী।
পরিবেশ ভাবগম্ভীর হয়ে ওঠে না।
আরেকজন বলে, দায়ী আপনারাই।
আমি বলি, আমি আইন জানি না, যারা আইন জানে তারাই বলতে পারবে কে দায়ী।
সেবকেরা বলে, আইন আমরাও জানি। দরকার হলে আইন আমরা শিক্ষাও দিতে পারি।
আমি বলি, দয়া করে আমাকে একটি আইন শেখালে খুশি হবো।
তারা বলে, বলুন।
আমি বলি, আমি তো তখন গাড়িতে ছিলাম না।
তারা বলে, কিন্তু অপরাধটা আপনারই; আপনাকে নামিয়ে দেয়ার জন্যেই গাড়ি এসেছিলো।
আমার নিজেকে উদ্ধার করার ইচ্ছে করে না; ডলি আমাকে উদ্ধার করার দায়িত্ব নেয়; তাকে আমার বাধা দিতেও ইচ্ছে করে না।
ডলি শিশুটির মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আপনার ছেলে আমার ছেলেও হতে পারতো। তার জন্যে আমার বুক ভেঙে যাচ্ছে।
শিশুটির মা ডলিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। বেদনায় তারা দুজন পরস্পরের ভগিনী হয়ে ওঠে।
ডলি হঠাৎ উঠে দৌড়ে আমাদের ঘরে যায়-তাকে অলৌকিক বাণীপ্রাপ্তর মতো অনুপ্রাণিত মনে হয়; আমি আলমারি খোলার শব্দ পাই। তারপরই দেখি ডলি অধিকতর অনুপ্রাণিতর মতো এসে ঢুকছে।
ডলি তার অলঙ্কারগুলো শিশুটির মার দিকে দু-হাতে তুলে ধরে বলে, আপা, আপনি এগুলো নিন, আমার আর নেই, থাকলে আপনাকে দিতাম।
শিশুটির মা অলঙ্কারগুলোর দিকে জ্বলজ্বলে চোখে তাকায়।
আমি বলি, ডলি, তুমি এগুলো তাকে দেবে না।
ডলি বলে, না, এগুলো আমি তাকে দেব, এগুলোতে আমার কোনো দরকার নেই।
এক বৃদ্ধ বলেন, এতোগুলোর দরকার নেই, অর্ধেক দিলেই চলবে; এগুলোর দাম লাখ টাকার বেশি হবে।
ডলি বলে, শিশুটির দাম লাখ টাকার অনেক বেশি, থাকলে আমি আপাকে কোটি কোটি টাকা দিতাম।
শিশুটির মার মুখ প্রশান্ত হয়ে ওঠে।
আমি শিশুটির মাকে জিজ্ঞেস করি, আপনি কি এগুলো চান?
শিশুটির মা কথা বলে না।
আমি বলি, এগুলো নিতে হলে একটা কথা আপনাকে বলতে হবে।
সবাই আমার দিকে তাকায়। আমার মনে হয় তারা কথাটি বুঝে ফেলেছে, তাই আমার আর কথাটির কথা বলতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু আমি দেখতে পাই তারা কী কথা বলতে হবে জানার জন্যে অধীর হয়ে আছে; আমি বলছি না দেখে ধৈৰ্য্য হারিয়ে ফেলছে। তবু আমি কথাটি বলতে পারি না।
এক সেবক বলে, বলুন, রহিমা আপাকে কী কথা বলতে হবে।
আমি বলি, না, থাক।
এক বৃদ্ধ বলেন, তুমি বলো, রহিমা কথাটি বলেই এগুলো নেবে।
আমি কথাটি বলতে পারি না।
সেবকেরা বলে, বলুন, কী কথা বলতে হবে?
আমি বলি, আপনি বলুন যে আপনি আপনার ছেলেকে ভালোবাসতেন না, তার মৃত্যুতে আপনি সুখী হয়েছেন।
আমার কথা শুনে সবাই কেঁপে ওঠে, শিশুটির মা ডুকরে ওঠে; আর ডলি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলে, তাকে আমার সব অলঙ্কার নিতে দাও, কিন্তু তাঁকে তুমি একথা বলতে বোলো না।
পরদিন অফিসে গিয়েই দেখি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়ে গেছে; এবং এগোরাটায় আমাকে অতিরিক্তর কক্ষে সাক্ষী দিতে যেতে হবে। সাক্ষী নয়, যেতে হবে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে; কমিটি অনেকখানি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে যে আমাকে নামাতে গিয়েই রাষ্ট্রের একটি দামি যানবাহন সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এবং ওই রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি রক্ষার জন্যে আমি কোনো চেষ্টা করি নি। ঠিক সময়ে আমি তিন সদস্যের কমিটির মুখোমুখি হই।
