আমার দুঃখ লাগে মাইক্রোবাসটির জন্যে। হঠাৎ মনে হয় মাইক্রোবাসটিকে আমি ভালোবাসি; এমন একটি মাইক্রোবাস আমি কখনো সৃষ্টি করতে পারবো না; আমার ঔরষে এমন একটি মাইক্রোবাস কখনো জন্ম নেবে না। আমার কোনো গাড়ি নেই; এমন একটি মাইক্রোবাস আমার কখনো হবে না। মাইক্রোবাসটি কখনো আমাকে সুখ ছাড়া দুঃখ দেয় নি। আমি সব সময়ই মাইক্রোবাসটির সামনের আসনে বসেছি; অন্যরা যে ওই আসনটি কখনো দখল করতো না, এটা আমাকে সুখ দিতো; পনেরো মিনিটের জন্যে আমি এ-সুখ উপভোগ করতাম। আমাকে সামনের আসনে বসিয়ে মাইক্রোবাসটি সুখ পাচ্ছে, আমার কি এমন মনে হতো? আর কখনো গাড়িটিকে দেখবো না; স্পর্শ পাবো না? মাইক্রোবাসটির স্পর্শের অনুভূতি আমাকে শিউরে দেয়, আমার ত্বকের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত হঠাৎ একটা বাতাস বয়ে যায়। আমার কি কাঁদতে ইচ্ছে করছে? আমার চোখে একবার একবিন্দু জল এসে গেছে বলে আমার মনে হয়; চোখের জল মোছর মতো করে আমি চোখে আঙুল বোলাই। চোখের জল মুছছি দেখে বা ভেবে কয়েকজন সমাজসেবক আমার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকায়।
সন্ধ্যার পর সমাজসেবকগণ, কয়েকজন বৃদ্ধ, আর শিশুটির মা আমাদের বাসায় আসে।
একজন সেবক বলে, আপনি যে জানাজায় গেলেন না?
আমি বিব্রত বোধ করি।
আরেক সেবক বলে, আপনার জন্যেই আমার ভাগনেটা মারা গেলো, আর আপনি একবারও আমাদের বাসায় গেলেন না, জানাজায়ও গেলেন না।
আমি বলি, যাওয়ার কথা আমার মনে পড়ে নি।
তারা সবাই কেঁপে উঠলো বলে মনে হলো।
আরেক সেবক বলে, আপনারা আমলারা খুন করার পর খুনের কথাও মনে রাখতে পারেন না, এজন্যেই আপনারা আমলা। জীবনে আপনারা কতো খুন করেছেন।
আরেক সেবক বলে, আপনার চোখে একটু পানিও আসে নি।
এক বৃদ্ধ বলেন, তোমাকে আমরা ছোটোবেলা থেকেই চিনি, তোমাকে আমরা ভালো বলেই জানি, তুমি ভালো চাকুরি করো, এমন একটা খুন তুমি করবে আমরা ভাবি নি।
তাঁর কথা শুনে মনে হয় আমি সত্যিই খুন করেছি। শিশুটি পথে দাঁড়িয়েছিলো, দেখে আমার ঘেন্না লেগেছিলো, আমি একটি বন্দুক এনে তার মাথা লক্ষ্য করে পর পর কয়েকটি গুলি করেছিলাম। তার মগজ ছিটকে পড়ছে দেখে আমার ভালো লেগেছিলো।
কিন্তু আমি বলি, তখন তো আমি গাড়িতে ছিলাম না।
এক বৃদ্ধ বলেন, গাড়িটা তো তোমাকে নামানোর জন্যেই এসেছিলো।
এক তরুণ সেবক বলে, আপনার জন্যেই শিশুটি খুন হয়েছে।
শিশুটির মা চুপ করে বসে আছেন। তিনি কাঁদছেন না। তিনি কাঁদছেন না দেখে আমার খারাপ লাগে।
আমি জিজ্ঞেস করি, আপনি যে কাঁদছেন না?
মা’টি একটু বিব্রত হয়; অন্যরাও নড়েচড়ে বসে।
আমি আবার জিজ্ঞেস করি, আর কোনো বাচ্চা আপনার নেই।
তিনি বলেন, না।
আমি বলি, বাচ্চার জন্যে আপনি কষ্ট পাচ্ছেন না?
সবাই চিৎকার করে ওঠে।
সেবকেরা বলে, এমন কথা বলার জন্যে আপনাকে মাফ চাইতে হবে। তার বাচ্চা মারা গেছে আর সে কষ্ট পাবে না? সে কি আপনার মতো?
আমি বলি, আমার ভুল হয়ে গেছে; তবে আপনারা আসার আগে শিশুটির মার কথা একবার আমার মনে হয়েছিলো, যদিও কে মা তা আমার জানা ছিলো না; আমি ভেবেছিলাম তিনি এখন শিশুটির কবরের পাশে বসে কাঁদছেন।
এক সেবক বলে, কষ্ট পেলে লাশের সাথে কি কবরে যেতে হবে?
আমি বলি, আমি কখনো কষ্ট পাই নি; কিন্তু আমার মনে হচ্ছিলো কারো জন্যে কষ্ট পেলে আমি তার কবরে নেমে যেতাম, কবরে শুয়ে থাকতাম।
আরেক সেবক বলে, দেখেন, বন্ধুকে পানিতে ফেলে দিয়ে তার বউকে আপনি বিয়ে করেছেন সেই খবর আমরা রাখি।
আমি বলি, আমার বন্ধুর জন্যে আমি বোধ হয় কষ্ট পাই নি, আর তার লাশও পাওয়া যায় নি।
এক সেবক বলে, আপনারা আমলারা যাদের পানিতে ফেলেন, তাদের লাশ কখনো পাওয়া যায় না। আর বন্ধুর জন্যে কেনো কষ্ট পাবেন, তার সুন্দরী স্ত্রীকে নিয়ে তো এখন সুখেই আছেন।
আমি বলি, আপনারা সব জানেন না।
এক বৃদ্ধ বলেন, তোমার কাছে আমরা কেনো এসেছি, তুমি কি বুঝতে পারছো?
আমি বলি, না, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
তিনি বলেন, তোমাকে নামাতে এসেই ড্রাইভার শিশুটিকে খুন করেছে।
আমি বলি, হ্যাঁ। তিনি বলেন, আমরা ড্রাইভার আর তোমাদের নামে মামলা করেছি।
আমি বলি, নিয়মমতো কাজই করেছেন।
তিনি বলেন, শিশুটি রহিমার একমাত্র সন্তান ছিলো, বড়ো আদরের সন্তান।
আমি কোনো কথা বলি না।
তিনি বলেন, তবে মামলা আমরা করতে চাই না।
আমি বলি, তা আপনাদের ইচ্ছে।
তিনি বলেন, একটা কথা কী জানো রহিমার আর সন্তান হবে না, তার আর সন্তান ধারণের শক্তি নেই।
চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে; এবং রহিমা, শিশুটির মা, ডুকরে কেঁদে ওঠেন। তাঁর কান্না শুনে ডলি, বেলা, আর মা ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে; তারা সবাই মিলে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে। সমাজসেবক আর বৃদ্ধরাও অশ্রুভারাতুর হয়ে পড়ে; দুটি সেবক উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে ওঠে, তাদের কান্না আর অশ্রুতে বসার ঘরটি শোকবিহ্বল হয়ে পড়ে। আমার একটি সিগারেট খেতে ইচ্ছে করে। অনেকক্ষণ ধরেই ইচ্ছে করছিলো; কিন্তু শোকাতুর মা আর বৃদ্ধদের সামনে আমি সিগারেট খেতে চাই নি, আমার দ্বিধা লাগছিলো; এবার আমি একটি সিগারেট বের করি; টান দিতেই আমার ভেতরটা সুখে ভরে ওঠে।
এক বৃদ্ধ বলেন, রহিমার যদি সন্তান ধারণের শক্তি থাকতো তাহলে কথাটা বলতাম না, সেই শক্তি নেই বলেই কথাটা বলছি।
