চিৎকার করে তারা বলে, আপনি বাইরে চলেন, দেখেন আপনার ড্রাইভার কী করছে।
আমি বলি, আমার তো কোনো গাড়ি নেই, ড্রাইভারও নেই।
তারা বলে, আপনার ড্রাইভার না, আপনার অফিশের ড্রাইভার।
আমি জানতে চাই, ড্রাইভার কী করেছে?
তারা বলে, খুন করছে।
খুনের কথা শুনে আমি চমকে উঠি না, কোনো আর্তনাদও করি না; তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারি তারা আমার মুখে একটা ভীষণ চমকানো ভাব দেখতে চেয়েছিলো, আমার কণ্ঠের একটা আর্তনাদ শুনতে চেয়েছিলো। তা না পেয়ে তারা হতাশ হয়। আমি যে চমকাই নি, আর্তনাদ করি নি, এতে আমারও বিস্ময় লাগে। আমার মনে হয় সংবাদপত্রের পাতার কয়েক শো খুনের খবরের মধ্যে এইমাত্র একটি আমি পড়লাম। খুনের খবর পড়ে সবার মতো আমিও কখনো ছুটে বেরোই না; কে কখন কীভাবে খুন হয়েছে দেখতে যাই না; বরং অন্য কোনো স্তম্ভে খুনের খবর থাকলে তা দ্রুত পড়ে ফেলি; এবং ভুলে যাই। অফিসের ড্রাইভার কাকে পথে খুন করেছে, আমি কেনো দেখতে যাবো? কেনো উত্তেজিত হবো? না, তবে আমাকে যেতে হবে; আমাকে নামিয়ে দিয়ে গাড়ি ঘোরানোর সময়ই ড্রাইভার কাজটি করেছে। তাই এই খুনের সঙ্গে আমি জড়িয়ে আছি; তাই আমাকে তাদের সাথে বাইরে গিয়ে খুনের পরবর্তী দৃশ্য দেখতে হবে; তাই আমি তাদের সাথে বাইরে যাই। নেমেই দেখি একটি ছোটো শিশুর মাথা পিষে গেছে, তার মাথা থেকে ছোট্ট এক বাটি মগজ একদিকে ছিটকে পড়ে আছে, পাশে একটুকু লাল রক্ত ছড়ানো, শিশুটি চিৎ হয়ে পড়ে আছে। তার শরীরের আর কোথাও একটা দাগও নেই, শুধু তার মাথার ওপর দিয়ে মাইক্রোবাসের একটি চাকা চলে গেছে।
দৃশ্যটি আমার সুন্দর লাগে। শিশুটি বেশ সুন্দর ছিলো; তার গায়ে নতুন জামা, পায়ের জুতোও নতুন। সে নতুন জুতো আর জামা পরে সুন্দরভাবে ঘুমিয়ে আছে। শুধু ঘুম থেকে আর জাগবে না; আর লুকোচুরি খেলবে না। দুটি নারী তার পাশে বসে কাঁদছে, কেঁদে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে; একটি নারী তাই ধারাবাহিকভাবে কাঁদতে পারছে না। থেমে থেমে কাঁদছে। সবার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয় তারা চাচ্ছে আমি একটুকু কাঁদি। আমি কাঁদলে তারা শান্তি পাবে, তাদের বুকে শক্ত অশান্তি জমে আছে, আমি কাঁদলে তাদের অশান্তিটা গলে যাবে। আমার কান্নার কথা মনে পড়ে না; আমার ভেতরে এমন কিছু ঘটে না, যাতে আমি ডুকরে উঠতে পারি। শিশুটির শুয়ে থাকাটা–আমার সুন্দর লাগে; আরেকবার তাকিয়ে আমি তাকে দেখি।
ঘটনা আর কাহিনী তারা বিস্তৃতভাবে, এলোমেলো ও চিৎকার করে, বিবৃত করতে থাকে। আমি তা নিজের ভেতরে সাজাতে থাকি।
ঘটনা পুনর্গঠন করলে দাঁড়ায় : মাইক্রোবাসটি যখন আমাকে নিয়ে আসে তখন কয়েকটি শিশু লুকোচুরি খেলছিলো, মাইক্রোবাসটি আমাকে নামানোর জন্যে থামলে শিশুটি মাইক্রোবাসের পেছনে লুকোয়; ড্রাইভার গাড়ি ঘোরানোর সময় তার মাথাটি গাড়ির পেছনের চাকার নিচে পড়ে যায়।
কাহিনী পুনর্গঠন করলে দাঁড়ায় : শিশুটি দিনাজপুর থেকে গতকাল নানার বাড়ি বেড়াতে এসেছে। তার বাবা সেখানে একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, তিনি আসতে পারেন নিঃ তার মা তাকে নিয়ে বাপের বাড়ি বেড়াতে এসেছে। শিশুটি বাপমায়ের একমাত্র সন্তান; বয়স পাঁচ বছর। বেড়াতে আসার কোনো কথা ছিলো না, শিশুটিই ঢাকায় বেড়াতে আসার জন্যে পাগল হয়ে ওঠে, কয়েক মাস ধরেই সে আসার জন্যে কান্নাকাটি করছিলো; তাই তার মা টিকতে না পেরে গতকাল বাপের বাড়ি আসে। আজ সকালে তার নানা তাকে নতুন জামা আর জুতো কিনে দিয়েছেন; নতুন জামা আর জুতো পরে সে তার মামাতো ভাইদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছিলো, আর তখনই আমাদের অফিসের গাড়ি পেছনে ফিরতে গিয়ে তাকে স্তব্ধ করে দেয়। সে আর খেলবে না।
আমার চোখে কোনো অশ্রু জমে না; বুকে কোনো কাঁপন লাগে না; রক্তে কোনো কষ্ট প্রবাহিত হয় না।
গাড়িতে পাঁচজন কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁরা বিধ্বস্ত হয়ে রাস্তায় পড়ে আছেন। তাঁদের ঘিরে রেখেছে পাড়ার তরুণ সমাজসেবকগণ। একটু দূরে ড্রাইভার অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তাকে হাত ও পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে। তার হাত আর পা না বাধলেও চলতো; তার হাত আর পা দুটির এমন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, ওগুলো সে আর কখনো ব্যবহার করতে পারবে বলে মনে হয় না।
গাড়িটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়ে আছে। পাড়ার সমাজসেবকেরা ভাঙার বিস্ময়কর বিজ্ঞান জানে; বোঝার কোনো উপায় নেই ওটি কিছুক্ষণ আগে গাড়ি ছিলো; দ্রুতবেগে চলতো।
আমি দুঃখ পাই গাড়িটির জন্যে, যেটিকে কখনো কখনো আমি অশ্ব ভাবতাম।
আমার বিধ্বস্ত সহকর্মীদের পাশে গিয়ে আমি বসি; তাদের জন্যে আমার কষ্ট লাগে না; যেমন আমি যদি তাদের বাসার সামনের পথে পাড়ার সমাজসেবকগণের উদ্যোগে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে থাকতাম তাদের কষ্ট লাগতো না। তারা সবাই মরে গেলেও আমার কষ্ট হতো না, এমন মনে হয়, যদিও তাদের অন্তত তিনজনকে আমি বেশ পছন্দ করি; আর অন্তত দুজন যদি দিনে একবার আমার ঘরে এসে না বসে আমার খারাপ লাগে, আমি খবর দিয়ে আনি, চা খেতে খেতে অনেকক্ষণ গল্প করি। একজনের স্ত্রীকে আমার খুব পছন্দ; তার স্ত্রী আমাকে দেখলে এতো চঞ্চল হয়ে ওঠে যে আমার মনে হয় অমন একটি কন্যা আমার থাকলে বেশ হতো, যদিও আমি আমার ঔরষে কোনো কন্যা বা পুত্র জন্ম দিতে চাই না। আমি তাদের জন্যে বাসা থেকে পানি আনাই। পাড়ার তরুণ সমাজসেবকেরা, যারা তাদের বিধ্বস্ত করেছে, আনন্দের সাথে পানি আনার দায়িত্ব পালন করতে থাকে; প্রমাণ দিতে থাকে যে তারা সমাজসেবক হিশেবে পুরস্কৃত হওয়ার যোগ্য। তারা বিধ্বস্তদের পানি খাওয়ায়, শরীরের এখানে সেখানে লেগে-থাকা ময়লা পরিষ্কার করে, তাদের কাছে মাফও চায়; এবং তাদের জন্যে বেবিট্যাক্সি ডেকে আনে। তারা আমার সাথে ড্রাইভারকে নিয়ে হাসপাতালে যায়। হাসপাতালে যাওয়ার সময় একবার আমার মনে হয় ও মরে গেলে ওকে নিয়ে আমার হাসপাতালে যেতে হতো না।
