ডলি, দেখতে পাই, মৃদু রাজনীতিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে; মাকে দলে নিয়ে এসেছে। এতে তার কোনো কষ্ট হয় নি, বুঝতে পারি আমি; সবাই মানুষের পক্ষে; মানুষের কাজ মানুষ উৎপাদন করা, মাও তা বিশ্বাস করে।
মা এক সন্ধ্যায় জানতে চায়, তুমি না কি ছেলেমেয়ে চাও না?
আমি কোনো কথা বলি না। মা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার একই কথা বলে। আমার কোনো উত্তর দিতে ইচ্ছে করে না, তবে উত্তর ছাড়া মা নড়বে না আমি বুঝতে পারি।
আমি বলি, না।
মা বলে, এটা কেমন কথা?
আমি বলি, ছেলেমেয়ে আমার ভালো লাগে না।
আমার কথা শুনে মা ভয় পায়।
মা বলে, একটা বেড়ালের জন্যে তুমি অনেক দিন কেঁদেছিলে, যখন ছোটো ছিলে, আর এখন তোমার ছেলেমেয়ে ভালো লাগে না?
আমি বলি, বেড়াল আমার এখনো ভালো লাগে।
ডলি বলে, কিন্তু মানুষ তোমার ভালো লাগে না।
আমি বলি, মানুষও আমার কখনো কখনো ভালো লাগে।
মা বলে, আমরা নাতিনাতনি দেখতে চাই, নাতিনাতনি দেখার সখ তো আমাদের আছে।
আমি বলি, কিছু মনে কোরো না মা, ছেলেমেয়ে নাতিনাতনি এসব কথা আমার ভালো লাগে না।
মা বলে, আমার আর তোমার বাবার যদি ছেলেমেয়ে ভালো না লাগতো তুমি হতে কোথা থেকে?
আমি বলি, আমি তো হতে চাই নি।
মা নিস্তব্ধ হয়ে যায়, কোনো কথা বলে না।
ডলি বলে, কিন্তু তুমি হয়েছে আমি হয়েছি, আমাদের থেকে আরো মানুষ হবে। আমি মানুষ হওয়াতে চাই।
আমি বলি, মানুষ হওয়ানোর কথা ভেবে আমি কোনো সুখ পাই না।
ডলি চিৎকার করে ওঠে, কিন্তু প্রত্যেক রাতেই তো করতে চাও, শুয়োরের মতো সুখ পাও।
আমি বলি, আমি হয়তো শুয়োর, আমার পক্ষে মানুষ জন্ম দেয়া সম্ভব নয়।
ডলি কাঁদে, আমাকে একটি শিশু দাও।
আমি বলি, হয়তো কোনো শুয়োর জন্ম দিয়ে ফেলবো।
ডলি চিৎকার করে, আমাকে একটা শুয়োরই দাও।
মা চলে গেছে, ডলিও চলে গেলে আমি স্বস্তি পেতাম; সে যায় না, তার যাওয়ার কথা নয়, এটা তারই কক্ষ। সে উঠে আলমারি খোলে, আমি বুঝতে পারি না কেনো হঠাৎ আলমারি খুলছে; তবে আলমারি খোলা আমার কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার বলে মনে হয় না। তার আলমারি সে খুলবে, তার যদি ইচ্ছে হয় রাত দুপুরে কাতান পরতে, পরবে। ডলি হঠাৎ মসৃণ বস্তুর প্যাকেটগুলো আমার সামনে ছুঁড়ে দেয়, আমি চমকে উঠি, বুঝতে পারি না আমার সামনে এগুলো কী এসে পড়ছে। পাঁচ-ছটি প্যাকেট সে ছুঁড়ে মেরেছে আমার সামনে; বস্তুগুলো মসৃণ হ’লেও মোড়কগুলো অতো মসৃণ নয়, সেগুলো বেশ শব্দ করে আমাকে চমকে দেয়। অল্প পরই আমি বস্তুগুলো চিনতে পারি। ডলি ছুটে এসে একটির পর একটি মোড়ক খুলতে থাকে, খুলে মসৃণ বস্তুগুলো ছেঁড়ার চেষ্টা করতে থাকে। এর আগে ডলি কখনো ওই বস্তু ধরে নি, মোড়ক খোলে নি; আমি শুরুতেই বুঝতে পারি ডলি যদি সবগুলো মোড়ক খুলে সবগুলো বস্তু ছিঁড়ে ফেলতে চায়, তাহলে তার কয়েক সপ্তাহ লাগবে। সে প্রথম নখ দিয়ে মোড়ক খোলার চেষ্টা করে, তার নখ তা পেরে ওঠে না; সে দাঁত দিয়ে মোড়ক কাটার চেষ্টা করতে থাকে, তার দাঁত ওই মোড়ক কাটতে পারে না; তখন সে উন্মত্ত হয়ে ওঠে, একটির পর একটি প্যাকেট খুলে গুচ্ছগুচ্ছ মসৃণ বস্তু বের করতে থাকে, নখ দিয়ে ছেঁড়ার চেষ্টা করতে থাকে, দাঁত দিয়ে কাটতে চায়; কিন্তু একটি মসৃণ বস্তুও সে বের করতে পারে না। সবগুলো জড়ো করে সে পা দিয়ে পিষতে থাকে। ডলি জানে না ওই মসৃণ বস্তুগুলো অবিনশ্বর, মাটির নিচে পুঁতে রাখলে সৌরজগতের ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত টিকে থাকবে; ওগুলোর ক্ষয় নেই, বিনাশ নেই-এজন্যেই ওগুলোকে আমার ভালো লাগে; শুধু আগুনই ওগুলোকে ধ্বংস করতে পারে।
আমি বলি, আমি বের করে দিচ্ছি।
ডলি আমার দিকে তাকায় না।
আমি তার কাছে গিয়ে মোড়ক ছিঁড়ে একটি একটি করে গোলাপি মসৃণ বস্তু তার হাতে তুলে দিতে থাকি; সে টেনে সেগুলো ছেঁড়ার চেষ্টা করে। প্রথমটি ছিঁড়তে না পেরে সেটি ছুঁড়ে দিয়ে আরেকটি নেয়; সেটিও ছিঁড়তে না পেরে আরেকটি নেয়; সেটিও ছিঁড়তে না পেরে আরেকটি নেয়; সেটিও ছিঁড়তে না পেরে আরেকটি নেয়; সেটিও ছিঁড়তে না পেরে আরেকটি নেয়। সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তার ঘুম পায়; সে মেঝেতে এলিয়ে পড়ে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। আমি গোলাপি বস্তু আর মোড়কগুলো নিয়ে বাথরুমে ঢুকি; কমোডে গোলাপি বস্তুগুলো ছেড়ে দিয়ে ফ্লাশের পর ফ্লাশ টানতে থাকি। একেকবার হল্লা করে পানি আসতে থাকে; আমার মনে হয় লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি গোলাপি মসৃণ শাপলা ভাসছে কমোড়ে, পদ্ম ফুটে আছে কমোডে, তার রঙে কমোড রঙিন হয়ে গেছে;–আমি কি কখনো শাপলা দেখেছি, শুনেছি বিলে শাপলা ফোটে, আমি কি কখনো পদ্ম দেখেছি?–ওগুলোকে ফ্লাশ টেনে মাটির অতলে পৌঁছে দিতে হবে; আমি ফ্লাশ টানতে থাকি, হল্লা করে পানি আসে, আমি ফ্লাশ টানতে থাকি, আমার চোখের সামনে হাজার হাজার কুমুদ শাপলা ভাসতে থাকে, আমি ফ্লাশ টানতে থাকি, গোলাপি কুমুদের কোলাহলে আমার রক্ত বিবশ হয়ে যেতে থাকে; মনে হয় পৃথিবী ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত ফ্লাশ টেনে যেতে হবে, নইলে এই শাপলাগুলো এভাবেই ভাসতে থাকবে কমোডের সরোবরে।
কয়েক দিন পর একটি ঘটনা
কয়েক দিন পর একটি ঘটনা ঘটে। অফিসের মাইক্রোবাসে অনেকের সাথে আমিও অফিসে যাই এবং ফিরি; সেদিনও মাইক্রোবাসটি আমাকে নামিয়ে দেয়, আমি নেমে বাসায় উঠে আসি। মাইক্রোবাস থেকে নেমে আমি পেছনের দিকেও তাকাই না, বাসায় ঢুকে কাপড় বদলিয়ে বাথরুমে ঢুকি। বাথরুমে ঢুকেই সেদিন আমি কোলাহল আর কান্না শুনতে পাই। কোলাহল নিয়মিত ব্যাপার, কান্নাটিকেই একটু নতুন সংযোজন মনে হয়। কারো কান্না শুনলেই আমি আর কাতর হয়ে উঠি না, কান্নাকে একটা সাংসারিক কর্তব্য বলেই আমার মনে হয়। আমি মগ দিয়ে মাথায় আর শরীরে পানি ঢেলে চলেছি, কল থেকে পানি পড়ার শব্দ হচ্ছে, কান্না আর কোলাহলও আমি শুনতে পাচ্ছি না। তখন বাথরুমের দরোজায় মা আর ডলি ফুঁ দিয়ে চিৎকার করে আমাকে ডাকতে থাকে; তাড়াতাড়ি বেরোতে বলে; আমি বেরিয়েই বাড়িভর্তি পাড়াবাসীদের দেখতে পাই। তাদের অনেককেই আমি চিনি, অর্থাৎ অনেককেই আমার চেনা মনে হয়; তবে অনেকের সাথে আমার কখনো কথা হয় নি।
