শ্যামলী বলেছিলো, তোমাকে আমি ভালোবাসি।
হাসান বলেছিলো, আমি তা অনুভব করছি।
শ্যামলী বলেছিলো, চিরকাল তোমাকে আমি চাই।
হাসান বলেছিলো, আমিও চাই।
শ্যামলী বলেছিলো, বলো, আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না।
হাসান বলেছিলো, কখনো ছেড়ে যাবো না, এভাবে জড়িয়ে থাকবো।
দশ বছর হলো, কখনো মনে হয়। কয়েক মাস, কখনো মনে হয় শতাব্দীর থেকেও দীর্ঘ। এই দশটি বছর তুমুলভাবে যাপন করেছে। হাসান, কবিতায় ও বিজ্ঞাপনে তার জীবন বেশ সফলই হয়ে উঠেছে। এখন সে অ্যান্ড ২০০০-এর একজন প্রধান ব্যক্তি, অন্যতম ব্যবস্থাপক: এখন আর তার অ্যাড লিখতে হয় না, বদমাশাদের থেকে অ্যাড সংগ্রহ করতে হয়, লেখার থেকে অনেক সহজ।
কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ – ১০
কয়েক দিন ধ’রে একটা উৎকট বিচ্ছিরি ঝামেলায় রয়েছে হাসান; একটা নোংরা। অশিক্ষিত কোটিপতিকে ধরেছে অচিকিৎসা কবিতা ব্যারামে, কোটিপতিটা হাসানের সাথে অ্যাডের থেকে কবিতা আলোচনা করতেই বেশি পছন্দ করছে, সারাক্ষণ কবিতা, যেনো ওই কোটি কোটি টাকা, পাজেরো, কারখানা, আমদানিরাপ্তানি, গাড়ির, চামড়ার ও আরো চৌত্ৰিশটা ব্যবসা কিছু নয়, কবিতাই সব, তাকে এখন অবিনশ্বর অমরতার রোগে ধরেছে। টাকা হয়েছে, এখন অমরতাও ওর চাই; পারলে কিনে ফেলতো, অমরতা যদি নিউইয়র্ক হনুলুলু সিডনি লন্ডনের একটা ফ্ল্যাট হতো, তাহলে এতো দিনে ও কিনে ফেলতো। ওর ফার্মের একটা অ্যাড পাওয়ার পরই হাসানের পরিচয় ওই মোটা গ্যালগ্যালে থুতুছিটানো ঋণখেলাপিটার সাথে; হাসানকে পাওয়ার পর সে অ্যাডের কথা ভুলতেই বসেছে; জসীমউদদীন সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মতো পদ্যে, ‘আমার মাথা নত ক’রে দাও’, ‘মিলন হবে কত দিনে’ ধরনের মরমী গানে দামি খাতা ভ’রে তুলছে, হাসানকে নিমন্ত্ৰণ ক’রে চলছে তার বনানীর বাড়ি গিয়ে পান করতে করতে ওগুলো একটু দেখে দিতে। এই চােদানি পাছামারা কোটিপতিগুলোকে কেনো যে শেষ বয়সে চাকরানিরোগের মতো কবিতারোগে ধরে, হাসান বুঝতে পারে না; এই চার ডেঞ্চারঅলাটা একলাই নয়, আরো কয়েকটিকে দেখেছে হাসান, তারা কবিতা লিখে অমর রবীন্দ্রনাথ হ’তে চায়। কোটি কোটি বনানী পাজেরো ইন্ডাস্ট্রি ইত্যাদির পর কেনো এই পেটমোটা গাড়লগুলোর এই অমরত্যারোগ? ওরা পাক্কা ঝানু লোক, অন্ধিসন্ধি সব জানে; কিন্তু হাসান ওদের পদ্য দু-একটি পড়ে দেখেছে, ভেতরে ভেতরে ওরা শিশু, ক্লাশ ফোরের শিশু, তুচ্ছ সরল মহান আবেগে ওরা ফুলেফেপে আছে। এক দিকে যারা ঈশ্বরের থেকেও এতো প্রাপ্তবয়স্ক অন্য দিকে তারা কীভাবে হয়। এতো অপ্রাপ্তবয়স্ক? এই ঝানু পাক্কা কোটিপতিটাও একটা শিশু, বস্তি, ব্রিজ, রেলগাড়ি, ধর্ষিতা হালিমা রহিমা সালেহাকে নিয়ে সত্যেন্দ্রনাথ জসীমউদদীনের মতো অনেক পদ্য লিখে ফেলেছে, জীবনে যে সে কিছুই করতে পারে নি, তার সোনার মানবজীবন যে ব্যর্থ গেছে, চাষটাষ কিছুই করতে পারে নি, তার জন্যে সে পাতায় পাতায় হাহাকার করেছে, ‘প্রভু’, ‘প্রেম’, ‘হৃদয়’ লিখতেও বানান ভুল করেছে, কিন্তু কবি তাকে হ’তে হবে, অমরতা তার চাই।
হাসানকে যেতেই হবে তার বনানীর বাড়িতে, একটু পানাহার করতে করতে দেখে দিতে হবে তার ওই অবিনাশী রচনাবলি; সে কিছু চায় না, একটু অমরতা চায়। হাসান একা যেতে রাজি হয় নি, বলেছে সে তার এক কবিবন্ধুকে নিয়ে যাবে, যে আরো বড়ো কবি, যে তার কবিতা দেখে দিলে সে কবি হবেই, এমনকি রবীন্দ্রনাথও হয়ে যেতে পারে। রাকিব সুলতানকেই মনে পড়েছে হাসানের, রাকিব পান করতে পছন্দ করে, এবং এসব কোটিপতির সামনে সহজেই জিপ, টেনে খুলে অনায়াসে একটা পরম দীর্ঘ উত্তেজিত সত্য দেখিয়ে দিতে পারে।
গাড়লটা একটা বাড়ি করেছে বটে, আরেকটুকু হ’লেই বাড়িটার নাম তাজমহল রাখতে পারতো। না কি রেখেছে? হাসানদের গাড়ি যখন ভেতরে ঢুকছে পাঁচসাতটা দারোয়ান এসে টানাটানি ক’রে তোরণ খুলে দেয়, একটা ছোটােখাটাে জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে গাড়ি গিয়ে তাজমহলের দরোজায় থাকে; গাড়লটা লোক বেশ, মনেপ্ৰাণে কবি তো, গ্রহের চক্রান্তেই শুধু টাকা পয়সা করেছে, তার সম্পূর্ণ মোটা শরীরটা নিয়ে ছুটে আসে তাদের অভ্যর্থনা করার জন্যে, যদিও একটা চাকর পাঠিয়ে তাদের ওপরে নিয়ে গেলেই হাসান যথেষ্ট ধন্য বোধ করতো। কিন্তু না, তারা তো কোনো কোটিপতির বাড়ি আসে নি, তারা দুজন বড়ো কবি এসেছে এক ছোটাে অপ্রতিষ্ঠিত কবির বাড়িতে, তাদের এভাবেই অভ্যর্থনা করতে হবে, নইলে এ-বাড়িতে তারা পা ফেলবে কেনো?
রাকিব সুলতান কোটিপতিটার পেট হাত বুলোতে বুলোতে বলে, ভাই, আমরা দুইজন বড় কবি আসলাম একজন ছোট কবির বাড়িতে, রবীন্দ্রনাথরা আসলো কুমুদরঞ্জনের বাড়িতে, এই মহান ঘটনার কথা বাঙলা কবিতার ইতিহাসে বোন্ড টাইপে ল্যাখা থাকবো।
কোটিপতিটা বলে, হ, কবিভাই, ল্যাখা থাকবো; জীবন আমার ধইন্য হইল।
জন্যে আপনে সেইরকম আয়োজন ত করেন নাই। বড় কবিগো সম্মান না দিলে ছোট কবিরা কবি হইবো কিভাবে?
কোটিপতিটি মেঝে গ’লে পড়ার ভঙ্গিতে বলে, আমার ভুল হইয়া গ্যাছে, বলেন কবিভাই, কি আয়োজন করতে হইবো?
হাসান অত্যন্ত কষ্টে হাসি চেপে রেখে বলে, না, না, আপনি বিচলিত হবেন না, কোনো ভুল হয় নি, আর কোনো আয়োজন করতে হবে না।
