হাসান তাকে সেদিন যেখানে ইচ্ছে সেখানে নিয়ে যেতে পারে নি, শ্যামলীর গাড়িতে হিজলগাছের নিচে বা তীব্ৰ জোয়ারভরা পুকুরের পারে যাওয়া সম্ভব ছিলো না, আর কোনো জায়গাও তার মনে পড়ছিলো না, যাওয়ার যোগ্য মনে হচ্ছিলো না, শ্যামলীই তাকে নিয়ে গিয়েছিলো এক অভিজাত রেস্তোরাঁয়। একটি নারী, সম্পূর্ণ নারী, সম্পূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠোঁট স্তন উরু বাহু গাল ভুরু নিয়ে তার মুখোমুখি বসে আছে, এটা পরম বিস্ময় মনে হচ্ছিলো তার; সে ধ’রে নিয়েছিলো সে শুধু নারীর স্বপ্ন দেখবে, স্বপ্ন দেখে কবিতা লিখবে, কোনো বাস্তব নারী দেখবে না; মুখোমুখি বসে হাসান তীব্র আকর্ষণ বোধ করছিলো শ্যামলীর প্রতি, যা কোনো স্বপ্নের নারীর প্রতিও সে বোধ করে নি—তার মুখে সে হিজল ফুলের লাল চেলি দেখতে পাঁচ্ছিলো, প্রবল বৃষ্টিতে হিজল ফুল ভেসে যাচ্ছে তার মুখের ওপর দিয়ে, বুকে বাহুতে দেখতে পাঁচ্ছিলো জৈষ্ঠের জোয়ার; তার মুখ চোখ ঠোঁট চুল আঙুল বাহু তাকে টানছিলো। যেমন মেঘ জ্যোৎস্না আষাঢ় শ্রাবণ তাকে টানে। কী সে বোধ করছিলো? প্ৰেম? কাম? শরীরের জন্যে শরীর? সে শ্যামলীকে ছাড়া শ্যামলীর আর কিছু জানে না, জানার কোনো প্রয়োজন আছে ব’লে তার মনে হয় নি, শ্যামলীকে দেখার পর আর কিছু জানার থাকে না।
কয়েক দিন পরই এক দুপুরে সে শ্যামলীকে নিয়ে এসেছিলো তার ঘরে।
সে কি আনতে পারে ওই স্বপ্নকে? ওই স্বপ্নই এসেছিলো তার ঘরে; তার ঘর হয়ে উঠেছিলো অবাস্তব অলৌকিক আমরা।
সেটি ছিলো অনাদি মহাজগতের অনাদি প্রথম দুপুর, অনন্য দুপুর, শেষ ও অ্যাদি ও অনন্ত দুপুর; ওই দুপুরের আগে কোনো পূর্বাহ্ন নেই, পরে কোনো অপরাহ্ন নেই, এক দুপুরের সমাপ্ত মহাকাল। সেই দুপুরে, হাসানের মনে হচ্ছিলো, সে যাপন করছে তার সমগ্র জীবন- সমগ্র জীবন আশি বা একশো বছরের যোগফল নয়, সমগ্র জীবন হচ্ছে বিশেষ মুহূর্তের তীব্র পরম অবর্ণনীয় রূপ, যার পর আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না; জীবন তার কাছে এতো তীব্র এতো সম্পূর্ণরূপে কখনাে ধরা দেয় নি, হয়তো আর ধরা দেবে না। সেই দুপুরে সে মদ্যপান করে নি, কিন্তু তার মনে হচ্ছিলো সে অজস্র কাল ধ’রে মদ্যপান ক’রে কোনো আদিম দেবতার মতো বিভোর মাতাল হয়ে পড়ে আছে প্রান্তরে, তাকে ঘিরে চলছে উৎসব, সে শুধু পান ক’রে চলছে অশেষ অমৃত। শ্যামলী কি পদ্মানদী? মানসসরোবর? শ্যামলী কি বঙ্গোপসাগর? শ্যামলী কি জ্যৈষ্ঠের জোয়ার? শ্রাবণের আদিগন্ত বন্যা? শ্যামলী কি মেঘ ঝড় বিদ্যুৎ? তারা ডুবে গিয়েছিলো নুহের প্লাবনে, বিশ্ব জুড়ে জল জল জল ছাড়া আর কিছু ছিলো না, অবিরল বৃষ্টি ঝরছিলো সমস্ত আকাশ ভেঙে চল্লিশ রাত চল্লিশ দিন ধ’রে, তারা দুটি মহাদেশ হারিয়ে যাচ্ছিলো পারদের মতো অতল জলের তলে; তারা ভেঙে পড়ছিলো ব্যাবিলন জেরুজালেমের মতো, অজস্র শতাব্দী ধ’রে ভেঙে পড়া ছাড়া আর কিছু ছিলো না, শুধু ভেঙে পড়ার সুগভীর শব্দ উঠছিলো তাদের শরীরের কক্ষের পর কক্ষ থেকে, গম্বুজ থেকে, মিনার থেকে, তোরণ থেকে; তারা গ’ড়ে উঠছিলো বিদিশা বিক্রমপুর ময়নামতি মহাস্থানগড়ের মতো, তাদের শরীরের পাশ দিয়ে বয়ে চলছিলো প্ৰমত্ত পদ্মা ব্ৰহ্মপুত্র মেঘনা যমুনা, যেখানে এক বিষগ্ন কবি তার নৌকোয় বসে লিখে চলছিলো তার তীব্রতম কবিতা।
অজস্র শতাব্দী কেটে গেলে এক শরীর আরেক শরীরকে জড়িয়ে ধ’রে পড়ে ছিলো ক্লান্ত সুখী প্রসন্ন পরিতৃপ্ত জনপদের মতো; তাদের শরীরের পলিমাটিতে এসে পড়ছিলো ধানের বীজ, গমের অঙ্কুর, ছড়িয়ে পড়ছিলো কলমিলতা, শেকড় ছড়াচ্ছিলো উদ্ভিদগণ, দিকে দিকে ডেকে উঠছিলো শালিক চড়ুই চিল।
শ্যামলী নদীপারের জনপদের মতো কণ্ঠস্বরে তাকে বলেছিলো, হাসান, আমি তোমাকে ভালোবাসি।
হাসান, আরেক জনপদ, পদ্মার জলকল্লোলের স্বরে বলেছিলো, আমি তোমাকে ভালোবাসি, শ্যামলী।
শ্যামলী বলেছিলো, আমাদের শরীর একথাই শুধু বলছে; আজই আমি প্রথম আমার যে শরীর আছে বুঝলাম।
হাসান বলেছিলো, একমাত্র শরীরই শুধু সত্য বলতে পারে, শরীরের থেকে বড়ো কোনো ঈশ্বর নেই।
শ্যামলী বলেছিলো, হাসান, তোমাকে একটি কথা বলার আছে আমার। হাসান বলেছিলো, পরে বোলো, এই সুখকর ক্লান্তির পরে বোলো, আমি এখন ক্লান্তির পরম সুখ অনুভব করছি; আমি ক্লান্তি উপভোগ করতে চাই।
শ্যামলী বলেছিলো, না, এখনই আমি বলতে চাই, এখনই বলার সময়, যখন আমরা সুখে ক্লান্ত তখনই আমার কথাটি বলা ভালো।
হাসান বলেছিলো, বোলো।
শ্যামলী বলেছিলো, হাসান, আমি বিবাহিত।
হাসান চোখ বুজে শ্যামলীকে জড়িয়ে ধ’রে বলেছিলো, তাতে কিছু আসে যায় না, শ্যামলী।
শ্যামলী জিজ্ঞেস করেছিলো, এরপরও আমাকে ভালোবাসবে?
হাসান বলেছিলো, হ্যাঁ।
শ্যামলী বলেছিলো, আমার দুটি শিশু আছে।
হাসান বলেছিলো, বেশ তো, নিশ্চয়ই তারা খুব সুন্দর।
শ্যামলী জিজ্ঞেস করেছিলো, হুঁ, এরপরও আমাকে ভালোবাসবে?
হাসান বলেছিলো, হ্যাঁ, ভালো না বাসার কিছু নেই, শিশুরা চমৎকার।
শ্যামলী বলেছিলো, তোমার থেকে আমি ছয় বছরের বড়ো।
একটু চমকে উঠেছিলো হাসান, এবং বলেছিলো, মনে হয় না; তোমাকে তো আমার থেকে ছোটােই মনে হয়; তোমাকে যে আমি মুঠোর ভেতরে ভরে রেখেছি, ভেঙেছি পাপড়ির মতো, তোমাকে আমার বালিকা মনে হয়।
