হাসান একটি বেবি নিয়ে দ্রুত অ্যাডে পৌঁছে, আরো দ্রুত পৌঁছতে পারলে সে এবং সবাই আরো বেশি স্বস্তি পেতো। অফিসে ঢুকতেই সবাই তাকে ঘিরে ধরে, জড়িয়ে ধরে, কেউ কেউ তার গালে গাল ঘষে, খুবই বিহ্বল বোধ করে সে।
আলাউদ্দিন বলে, দোস্ত, গুজব রটছে যে কবি হাসান রশিদ খুনী হইয়া গ্যাছে, শুইন্যা আমরা পাগল হইয়া গেছি।
আলাউদ্দিন তাকে জড়িয়ে ধরেছে, আর ছাড়তে চায় না; সেও ধ’রে রাখে। আলাউদ্দিনকে, তারও ছাড়তে ইচ্ছে করে না।
হাসান মনে মনে নিজেকে জিজ্ঞেস করে, আমি কি মৃত, আমি কি মৃত? শ্যামলীর সাথে এখন আমার যে-সম্পর্ক, তাতে আমি কি মৃত নাই?
আহমেদ মাওলা বলে, গুজব শুইন্যা আমরা পাগল হইয়া গেছি, আপনেরে দেইখ্যা কানাতে ইচ্ছা করছে।
আহমেদ মাওলা তাকে জড়িয়ে ধ’রে কাঁদতে থাকে।
হাসান হেসে বলে, খুন। আমি হতে পারি, তবে এখনো হই নি; আপনারা সবাই প্রস্তুত থাকুন।
আলাউদ্দিন বলে, দোস্ত তুমি বাইচা আছো তাতে আমরা বাইচা আছি; তয় খুন একজন হইছে, আমি খবর লইয়া জানলাম কবি হাসান করিম খুন হইয়া গ্যাছে কাইল রাইতে।
হাসান বলে, তাই না কি? হাসান করিম খুন হয়েছে?
আলাউদ্দিন বলে, দোস্ত, তোমাগো নামের মিল আছে, আর তুমিই বেশি বিখ্যাত বইল্যা গুজব ছড়াইয়া পড়ছে যে তুমি খুনী হইয়া গ্যাছো।
হাসানের এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়, তার মনে হয়। সেই খুন হয়ে গেছে। হাসান করিমের সাথে তার সামান্য হ’লেও একটা জীবন ছিলো, দেখা হ’লে অন্তত তারা একবার হাসতো পরস্পরের দিকে চেয়ে, তার সেই জীবনটি খুন হয়ে গেছে। তাদের আর দেখা হবে না, মৃদু হাসা হবে না। কেউ খুন হ’লে সে একা খুন হয় না, তার পরিচিতরাও একটু একটু খুন হয়।
হাসান ও আলাউদ্দিন যায় হাসান করিমের বাসায়; গিয়ে দেখে ছোটােখাটাে ভিড় জমেছে, কাঁদছে হাসান করিমের স্ত্রী, দুটি বাচ্চা, আর হাসান করিমের লাশ পড়ে আছে। কয়েকটি পুলিশও দাঁড়িয়ে আছে। এখানে ওখানে।
হাসানকে অনেকেই জড়িয়ে ধরে, হাসান বিব্রত বোধ করে, তারা যেনো খুন হওয়া হাসান করিমকে জড়িয়ে ধরছে তাকে জড়িয়ে ধ’রে।
একজন তাকে জড়িয়ে ধ’রে বলে, আমি ভেবেছিলাম। আপনিই খুন হয়েছেন, সারা রাইত ঘুমাইতে পারি নাই, আমি আপনার আরো কবিতা পড়তে চাই।
লোকটিকে সে দেখেছে আগে, চেনে না; লোকটি তাকে ধ’রে কাঁদতে থাকে, হাসানের মনে হয় সেও কেঁদে ফেলবে।
হাসান চেনা একজনকে জিজ্ঞেস করে, কেনো এমন ঘটলো?
তিনি বলেন, হাসান করিম সর্বহারা দলের সদস্য ছিলেন, তাদের দলে এখন ভাঙাভাঙি আর খুনখুনি চলছে, শুদ্ধি অভিযান চলছে, তিনি হয়তো নিজের দলেরই কারো হাতে খুন হয়েছেন।
আরেকজন বলেন, কাল সন্ধায় তার পরিচিত কয়েকজন তাঁর সাথে দেখা করতে আসে, তাদের সাথে তিনি বের হন, বের হওয়ার সাথে সাথেই তারা তাঁকে গুলি করে।
হাসান জিজ্ঞেস করেন, হাসান করিমের স্ত্রী তাদের চেনেন?
লোকটি বলেন, হয়তো চেনেন হয়তো চেনেন না; তবে তারা তার দলেরই।
বিপ্লবীরা একে অন্যকে এখন সমাধান করছে, নিজেদের সমাধান ক’রে ক’রে একদিন তারা পৃথিবীতে সর্বহারার সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত করবে।
শ্যামলী ফরহাদ কিছুক্ষণ পরেই, যখন সন্ধ্যা নেমে আসছে, প্রথম এসেছিলো তার কাছে; এবং হাসান তাকে দেখে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলো।
কণ্ঠস্বর বাস্তব রূপ নিয়ে এসেছিলো, কিন্তু ওটাকেই হাসানের মনে হয়েছিলো সবচেয়ে অবাস্তব ঘটনা, সবচেয়ে বড়ো বিস্ময়।
কণ্ঠস্বর এসে বলেছিলো, আমি এসেছি, একটু দেরি হয়ে গেলো।
হাসান স্থিরভাবে শ্যামলীর দিকে তাকিয়ে বলেছিলো, হ্যাঁ, এক শতাব্দীর মতো দেরি, তবে আমি আরো কয়েক শতাব্দী অপেক্ষা করতে পারতাম।
কণ্ঠস্বর আনন্দে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে বলেছিলো, পারতেন। কয়েক শতাব্দী অপেক্ষা করতে? দশ, বারো, তিরিশ শতাব্দী?
হাসান বলেছিলো, মহাজাগতি ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত আপনার জন্যে অপেক্ষা করতে পারতাম, তারপরও মনে হতো খুবই কম অপেক্ষা করলাম।
কণ্ঠস্বর বলেছিলো, ততোদিনে আপনি আমাকে ভুলে যেতেন।
হাসান বলেছিলো, মৃত্যুর পরও মনে পড়তো যে আপনি আসবেন ব’লে কথা দিয়েছিলেন, তখনো অপেক্ষা ক’রে থাকতাম।
কণ্ঠস্বর বলেছিলো, চলুন আমার সাথে।
হাসান জিজ্ঞেস করেছিলো, কোথায়? কণ্ঠস্বর বলেছিলো, আপনি যেখানে যেতে বলবেন।
পৃথিবীর, মহাজগতের কোনাে এলাকা সে চেনে না; তাই সে কোথাও যেতে বলতে পারে না। তার মনে পড়ে একটি হিজলগাছের ছায়াকে, তার লাল চেলিকে, সে কি সেই হিজলগাছের নিচে যেতে বলবে? সে কি বলবে, চলুন। একটি পুকুরপারে, যেখানে ঢুকছে জোয়ারের জল?
হাসান বলেছিলো, আপনার যেখানে ইচ্ছে আমাকে নিয়ে চলুন, আমার ইচ্ছে হচ্ছে আমাকে কেউ যেখানে ইচ্ছে নিয়ে যাক, যে-কোনো স্বর্গে যে-কোনো নরকে যে-কোনো আকাশে যে-কোনো পাতালে।
কণ্ঠস্বর বলেছিলো, আমিই তো এমন ইচ্ছে নিয়ে বেরিয়েছি, বলতে এসেছি যেখানে ইচ্ছে আমাকে নিয়ে চলুন, যে-কোনো আলোতে যে-কোনো অন্ধকারে যেকোনো আগুনে যে-কোনো জ্যোৎস্নায়।
হাসান বলেছিলো, আমরা দুজনেই হয়তো মুক্তি চাচ্ছি। চারপাশের শেকল থেকে, আমাদের ভেতরের শোকাল থেকে।
কণ্ঠস্বর বলেছিলো, আমরা সবাই বন্দী, কেউ সুখকররূপে কেউ অসুখকররূপে; তবে আমি বন্দী, আপনি হয়তো বন্দী নন; কবিরা তো মুক্ত।
