শ্যামলী ফরহাদ, তার সুধা, তার একরাশ কবিতার অপার্থিব উজ্জ্বল প্রেরণা, তার কবিতাকে কাম থেকে প্রেমের দিকে নিয়ে আসার পার্থিব দেবী, তার প্রেম, তার কাম, আজ হয়ে উঠেছে আদিগন্ত বিভীষিকা। হায়, মানুষ, দণ্ডিত মানুষ, তোমার দণ্ডিত পরস্পরকে ছিন্নভিন্ন করার দণ্ডে; যেদিন তোমরা প্রথম চুম্বন করো সেদিনই তোমরা হনন শুরু করো।
হাসানের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ বেরিয়েছে, আজ দশ বছর হলো, বেশ প্রশংসা এবং একটি দুটি ছোটােখাটাে পুরস্কার পাচ্ছে; তবে সবচেয়ে অমূল্য যা সে পায় তার আটাশ বছর বয়সে, তা হচ্ছে শ্যামলী ফরহাদ, যে আকাশভরা চাঁদের মতো বনভরা পুষ্পের মতো ঢোকে তার জীবনে, সে ভ’রে ওঠে। শূন্যতায় মানুষ বাঁচতে পারে না, ভ’রে উঠতে হয় মানুষকে: শ্যামলী তার ভ’রে ওঠা।
এক বিকেলে একটি টেলিফোন আসে, আমি কবি হাসান রশিদের সাথে একটু কথা বলতে চাই।
হাসান বলে, আমি হাসান বলছি।
ওই কণ্ঠ বলে, আমি আপনার কবিতার একজন অনুরাগিণী।
শুধু কণ্ঠ, শুধু কণ্ঠস্বর, স্বরভরা শুধু অনুরাগ।
হাসান বলে, আপনার কথা শুনে আমি ধন্য হলাম, সুখী হলাম।
শুধু কণ্ঠস্বর, শুধু কণ্ঠ, কণ্ঠস্বরভরা শুধু অনুরাগ।
ওই কণ্ঠ বলে, আপনি আমার প্রিয় কবি, প্রিয়তম কবি।
হাসান বলে, আমি মুগ্ধ হচ্ছি। ধন্য হচ্ছি। ভ’রে উঠছি।
সে কি একটু বাড়িয়ে বলছিলো? না। তার জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্তে তার এমনই মনে হয়েছিলো, কয়েক দিন ধ’রে এমনই মনে হয়েছিলো।
ওই কণ্ঠস্বর ফোন রেখে দেয়, হাসান তবু সারা বিকেল সন্ধ্যা মধ্যরাত স্বপ্নে জাগরণে ওই স্বর শুনতে পায়; মাটি নীলিমা জলভূমি বনভূমি ভ’রে যায় ওই স্বরে, সারা শহরে ওই স্বর ছাড়া কোনো স্বর নেই, ট্রাক কোনো শব্দ করছে না, গাড়ি সব হর্নে চারপাশ জীর্ণ করছে না, শুধু একটি কণ্ঠস্বরই অসুস্থ শহরকে সুস্থ ক’রে রেখেছে, তার ভেতর থেকে জেগে উঠছে পংক্তি চিত্রকল্প ধ্বনি কল্প। শহরের কোন প্রান্ত থেকে আসতে পারে ওই স্বর? হাসানের মনে হয় ওই স্বরে সুগন্ধ আছে, সেই সুগন্ধের রেশ ধ’রে সে পৌঁছে যেতে পারে স্বরের দিকে। সে ওই স্বর দেখতে পায়, ওই স্বরের একটি শরীর কেঁপেকেঁপে ওঠে তার চোখে, সে স্বরের সুগন্ধ পায়, তার সুগন্ধ টেনে নিতে থাকে বুকের ভেতরে, জিভ দিয়ে সে চুষতে থাকে স্বরের জিভ আর ওষ্ঠ, সে আঙুল বোলাতে থাকে। ওই স্বরের কোমল শরীরে, আঙুল পাহাড়ে উঠতে থাকে উপত্যকায় নামতে থাকে নদীতে ভুবতে থাকে।
কয়েক দিন হাসান ওই স্বরের মুঠোতে পালকের মতো প’ড়ে থাকে।
আবার এক বিকেলে স্বর বেজে ওঠে, আমি কবি হাসান রশিদকে চাই।
হাসান বলে, কতোখানি চান?
স্বর বলে, সম্পূর্ণ চাই।
হাসান বলে, আপনাকে সম্পূর্ণ দিলাম।
স্বর আমগাছের ঘন সবুজ পাতার ওপর বৃষ্টির ফোঁটার মতো হেসে ওঠে, পিচঢালা পথের ওপর জ্যোৎস্নার মতো ছড়িয়ে পড়ে, আমি আপনার অনুরাগিণী, অ-নু-রা-গি-ণী, আপনি আমার প্রিয়তম কবি।
হাসান বলে, সাত দিন ধ’রে আপনি আমার কাছে কণ্ঠস্বর হয়েই আছেন, কিন্তু আপনার তো একটা নাম আছে?
কণ্ঠস্বর বলে, আছে, কিন্তু সেটা তুচ্ছ।
হাসান বলে, কিন্তু নাম ছাড়া কাউকে কল্পনা করা যায় না, আপনাকে অন্তত আমি কল্পনায় দেখতে চাই।
কণ্ঠস্বর বলে, বাস্তবে দেখতে ইচ্ছে করে না?
হাসান বলে, করে।
কণ্ঠস্বর বলে, কখন?
হাসান বলে, এই মুহূর্তেই।
কণ্ঠস্বর বলে, আমি তো বাতাস নাই যে এ-মুহূর্তেই উপস্থিত হবো, পাখি নাই যে উড়ে যাবো।
হাসান বলে, আপনি যা সেভাবেই আসুন।
কণ্ঠস্বর বলে, অফিসে থাকবেন, আমি আসছি।
সেই শুরু, সেই জীবনের আশ্চর্য বদল, সেই গুচ্ছগুচ্ছ তারকাকে মুঠোতে পাওয়া, সেই অপূর্ব আলোকিত অন্ধকারের দিকে যাত্রা।
হাসানকে অ্যান্ড ২০০০–এ যেতে হবে, দেরি হয়ে যাচ্ছে, বারবার টেলিফোন বাজছে, সে ধরছে না, ধরতে ইচ্ছে করছে না। কী হবে শ্যামলীকে ধ’রে, কী হবে সুন্দর ক্লান্তিকে ধ’রে?
অবশেষে সে টেলিফোন ধরে, এবং অপরপারে খুব উদ্বিগ্ন স্বর শুনতে পায়, কে বলছেন? হাসান রশিদ সাহেব বলছেন, হাসান সাহেব?
হাসান বলে, হ্যাঁ, হাসান বলছি।
আহমেদ মাওলা বলে, আপনেরে টেলিফোন কইর্যা কইর্যা আমরা পাগল হইয়া যাইতেছি, হার্ট অ্যাটাক হইয়া যাইতেছে, আপনে ধরতেছেন না ক্যান?
আহমেদ মাওলা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে, আপনে ভাল আছেন ত? বলেন, আপনে ভাল আছেন ত?
হাসান বলে, হ্যাঁ, ভালোই তো আছি; কিন্তু কী হয়েছে বলুন?
আহমেদ মাওলা বলে, এখন বলুম না, তাড়াতাড়ি আসেন, আসলে বলুম।
আবার টেলিফোন বেজে ওঠে, হাসান ধরতেই আলাউদ্দিন বলে, আরো দোস্ত, তাইলে তুমি আছো, বাচলাম, তোমারে ফোন কইর্যা শ্যাষ হইয়া যাইতেছি।
হাসান জিজ্ঞেস করে, কেনো, কী হয়েছে?
আলাউদ্দিন বলে, দোস্ত, তুমি তাড়াতাড়ি অ্যাডে আসো, আমিও যাইতেছি, তোমারে না দেখলে বিশ্বাস করুম না যে তুমি আছো।
চৌধুরী ব্রাদার্সের ছোটাে পুত্রটি ফোন করে, কবি হাসান রশিদ বলছেন?
হাসান বলে, হ্যাঁ।
সে বলে, আপনি ভালো আছেন?
হাসান বলে, হ্যাঁ, ভালো আছি, কিন্তু কেনো বলুন তো?
ছেলেটি বলে না, এমনিই, না এমনিই।
সে ফোন রেখে দেয়। হাসান চঞ্চল বিচলিত হয়ে ওঠে, নিশ্চয়ই কিছু ঘটেছে তাকে ঘিরে, যার জন্যে এই উদ্বিগ্ন চাপা অস্বস্তিকর ফোন।
