আলাউদ্দিনই তো হবে প্রথম অভ্যর্থনাকারী, বই পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে আলাউদ্দিন, দোস্ত, তুমি তা জানো তোমারে লইয়া দ্যাশ পাগল হইয়া ওঠবো না, তুমি তো কোনো লড়কে লেঙ্গে ল্যাখো নাই, কিন্তু এই কবিতা বুঝাই দিছে তুমি বড় কবি হইবা।
হাসান হেসে বলে, তার মানে আমার সামনে ভয়াবহ ভবিষ্যৎ?
আলাউদ্দিন হাসতে হাসতে বলে, আমার সেইটাই মনে হয়, দোস্ত।
হাসান ভয় পায়; সে ভেবেছিলো আলাউদ্দিন প্রতিবাদ করবে, কিন্তু আলাউদ্দিন প্রতিবাদ না ক’রে তাকে সমর্থনা করে।
কেঁপে ওঠে হাসান, সত্যিই আমার সামনে ভয়াবহ ভবিষ্যৎ?
আড্ডায়ও বই নিয়ে যায় সে একদিন; বিব্রতভাবে বই দেখায়, সবাই বই দেখে প্রচ্ছদের আর ছাপার প্রশংসা করে, প্রচুর চা ও সিগারেট সমাপ্ত হয়, কিন্তু কবিতা সম্পর্কে কিছু বলে না।
কয়েকটি পত্রিকায় আলোচনার জন্যে সে বই পৌঁছে দেয়।
প্রত্যেক সম্পাদক বলেন, কাউকে দিয়ে আলোচনা লিখিয়ে আনুন, ভালো আলোচনা।
সে কাকে দিয়ে লিখিয়ে আনবে তার প্রশংসা?
হাসান বলে, লিখিয়ে আনা প্রশংসা আমার ভালো লাগবে না।
পারলে কাউকে দিয়া আলোচনা করাবেন, ভালো লাগবে, অচেনা আলোচনাই আমি চাই।
এক সম্পাদক বলেন, অচেনা কাউকে দিলে গালাগালির সম্ভাবনাই বেশি, আমরা কেউ কারো প্ৰশংসা করি না, ভালো জিনিশের তো করিই না।
হাসান হেসে বলে, গালাগালি প্ৰাপ্য হ’লে তাই চাই।
একজন বলেন, আপনার কোনো শিক্ষককে দিয়ে একটা আলোচনা লিখিয়ে আনুন, শিক্ষকের প্রশংসাপত্র কাজে লাগবে।
হাসান বলে, আমার তো কোনো শিক্ষক নেই।
বেশ কয়েক মাস ধ’রে হাসান উপভোগ করতে থাকে প্রচুর তিরস্কার ও সামান্য প্রশংসা; সে ভরে উঠতে থাকে ওই তিরস্কারে ও প্রশংসায়–তার আরেকটি জীবন শুরু হয়ে গেছে, ক-শতাব্দী ধ’রে এটা চলবে? তার ভেতরের খড়কুটােও পুড়তে শুরু করেছে, শিশিরে ভিজতে শুরু করেছে। নিরন্তর শীতল আগুনে পোড়া আর গনগনে শিশিরে ভেজা, এই তো কবির জীবন। তিরস্কার তার খারাপ লাগে না, ওগুলো প’ড়ে সে মনে মনে হো হো হাসে, রক্তে একটু বিষ ছড়িয়ে পড়ে, বিষ তো ছড়িয়ে পড়বেই, এমন কোন কবি আছে যার রক্তনালিতে হৃৎপিণ্ডে রক্তের থেকে বিষের পরিমাণ বেশি নয়, ফুসফুসে বাতাসের থেকে বিষপ্রবাহ অবিরাম নয়? কাহ্নপাদের রক্ত? মধুসূদনের রক্ত? বিহারীলালের রক্ত? ওতে বিষ বেশি না রক্ত বেশি? রবীন্দ্রনাথের রক্ত? জীবনানন্দের রক্ত? বুদ্ধদেবের রক্ত? সুধীন্দ্রনাথের রক্ত? ওতে বিষ বেশি না রক্ত বেশি? ওদের ফুসফুসে বাতাস বেশি না বিষকণিকা বেশি? আর সে তো সামান্য, তাই বিষকেই সুধায় পরিণত করতে হবে তার। সুধা? কোন কবি কবে তা পেয়েছে? তার সামনে বিষের পেয়ালা, কবিকে অনবরত পান করতে হয় বিষ, মৃত্যুময় গরল।
এই গরল সে পান ক’রে আসছে কতো দিন হলো? এক যুগ? দেড় যুগ?
পাঁচতলা থেকে হাসান তাকায় দক্ষিণের প্রসারিত ব্যাপ্ত আকাশচুম্বী মলস্তূপের দিকে। পৌরসভা নতুন সভ্যতা গড়ার জন্যে জমিয়ে তুলছে বর্তমান আবর্জনার পাহাড়; এই মলস্তূপ থেকে একটি একটি ক’রে উঠে এসেছে তার অনেক কবিতা। আরো আসবে। মলস্তূপের পাশে বস্তির শুয়োরগুলোকে তার মনে পড়ে, কী করুণ বিষগ্ন গরিব শুয়োর। মানুষও ওদেরই মতো, সেও কি ওগুলোরই সহোদর?
কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ – ০৯
ফোন বাজছে, তার ধরতে ইচ্ছে করছে না, বেজে চলছে ফোন, ধরতে ইচ্ছে করছে না; সে জানে ফোনে ওই পাশে শ্যামলী ফরহাদ–তার একদা আনন্দ আর এখনকার অশেষ ক্লান্তি যন্ত্রণা রক্তক্ষরণ। তার ধরতে ইচ্ছে করছে না, কিন্তু সে ধরবে, না ধরলে কিছুক্ষণ পর সে শূন্যতা বোধ করবে।
হাসান বলে, হ্যালো।
শ্যামলী ফরহাদ বলে, তোমার এতো সময় লাগলো ফোন ধরতে?
হাসান বলে, আমি দুঃখিত, একটু দেরি হয়ে গেলো।
শ্যামলী বলে, কাজের মেয়েটিকে নিয়ে শুয়ে আছো না কি? তোমার কাজের মেয়েটি তো রূপসী আর যুবতী।
হাসানের রক্তের ভেতর দিয়ে একটি ছুরিকা তীব্ৰ বেগে ছুটে চলে।
হাসান বলে, হ্যাঁ, সে রূপসী এবং যুবতী, আঠারো বছর।
একগুচ্ছ ছুরিকা হয়তো আরো তীব্ৰ বেগে ছুটে চলছে শ্যামলীর রক্তের ভেতর দিয়েও; শ্যামলী বলে, এই জন্যেই তোমাকে ক্লান্ত লাগছে? কবার করলে? তোমার তো আবার ক্ষুধার শেষ নেই।
হাসান বলে, দু-বার, না তিনবার মনে নেই, আরেকবার উদ্যোগ নিচ্ছি, খুব ক্ষুধা, সারাজীবনেও মিটবে না।
হাসান ফোন রেখে দেয়, তবে আবার ফোন বেজে ওঠে, বাজতে থাকে, বাজতে থাকে, বাজতে থাকে; অথচ শ্যামলী ফরহাদের ফোনের জন্যে সে এক সময় ভোর হ’তে না হ’তেই অ্যান্ড ২০০০-এ গেছে, সন্ধ্যার অনেক পরে ফিরেছে অ্যাড থেকে; আর শ্যামলীর জন্যেই সে নিজের ফোন নিয়েছে, টাকা ছিলো না, ধার করতে হয়েছিলো শ্যামলীর থেকেই অর্থাৎ শ্যামলীই টাকাটা গুজে গিয়েছিলো তার হাতে, টাকাটা শ্যামলীকে আর ফেরত দেয়া যায় নি, যদিও হাসান বারবার চেষ্টা করেছে। ফোন এক সময় ভরা ছিলো সুধায়, আজ ভ’রে উঠেছে তীব্রতম কালকূটে— মানুষের সম্পর্কের এই অবধারিত পরিণতি। এটা বেজে উঠলে আজ সে ভয় পায়: মনে হয়। মনসার হাজার হাজার সাপ ঢুকছে তারের ভেতর দিয়ে, ওই তার সাপের মতো ফণা তুলছে, সেটটাকে মনে হয় কুণ্ডলিপাকিয়ে শুয়ে থাকা বিষধর, সে এক লখিন্দর, আটকা প’ড়ে আছে লোহার বাসরে।
