তার প্রথম কাব্যগ্রন্থটি বেরোতে আরো সময় লাগে, প্রুফে প্রচ্ছদে বাঁধাইয়ে আরো আট মাস কেটে যায়। কিন্তু সে কখনো উত্তেজিত হয় নি;— হবে, বেরোবে, সে মনে করেছে; এই যে দেরি হচ্ছে এটাকে সে উপভোগ করেছে প্রতিটি মুহূর্ত। একদিন চৌধুরী ব্ৰাদার্সে গিয়ে দেখে তার বই বাঁধাই হয়ে এসেছে, শেল্ফে জায়গা ক’রে নিয়েছে, বইটি বিব্রত বোধ করছে না; সে চঞ্চলতা বোধ করে, তার বইয়ের দিকে হাত বাড়াতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু সাহস হয় না। লাইনোতে ছাপা হয়ে যা বাঁধাই হয়ে এলো, শেল্ফে যা স্থান ক’রে নিলো, যার প্রচ্ছদে তার নাম মুদ্রিত, সেগুলো কী? কবিতা? গুরুত্বপূর্ণ? উল্লেখযোগ্য? নতুন?
শাজাহান চৌধুরী একটি বই তার হাতে দিয়ে বলে, দেখুন, খুব সুন্দর হয়েছে।
বইটি হাতে নিতে গিয়ে সে শিউরে ওঠে, তার রক্ত নিঃশব্দে বলতে থাকে, একাব্য আমার, এর পংক্তি আর স্তবকগুলো আমার সৃষ্টি, আমার ভেতর থেকে এগুলো উৎসারিত হয়েছে, হয়তো এগুলো ব্যর্থ হয়তো সফল; এ-বই সাড়া জাগিয়ে চারদিকে আলোড়ন তুলে দেখা দেবে না, কিন্তু নিঃশব্দে ঢুকবে সময়ের বুকের ভেতরে।
হাসান হেসে বলে, বইটি ছুঁয়ে সুখ পাচ্ছি, আমিও হয়তো কবি হ’তে যাচ্ছি। শাজাহান চৌধুরী বলে, আমি কবিতা ছাপি কিন্তু আমি কবিতা বুঝি না, তবে আমি বুঝি আপনি কবি, অন্যদের থেকে অনেক ভিন্ন।
হাসান জিজ্ঞেস করে, এজন্যে আমাকে খারাপ লাগে আপনার?
শাজাহান চৌধুরী বলে, কী যে বলেন কী যে বলেন, আব্বাও আপনাকে পছন্দ করে, সবচেয়ে পছন্দ করে।
চা খেতে হলো, অনেকক্ষণ বসতে হলো, ব’সে ব’সে সুখ পেতে হলো। হাসান বলে, আমাকে কয়েকটি বই দেবেন?
শাজাহান বলে, এজ পাঁচটি নিন, পরে আরো বিশটি পাবেন।
বইগুলো একটি মোড়কে ঢুকিয়ে, যেনো কেউ দেখতে না পায়, হাসান বেরিয়ে পড়ে। তার মনে হয়। এ-মোড়কের ভেতরে এমন সোনা আছে, যা দেখানো যাবে না কাউকে; কিন্তু রিকশায় উঠে একবার মনে হয় একটি বই খুলে দেখি, টেনে বের করে একটি বই, পরমুহূর্তেই বইটি ঢুকিয়ে রাখে মোড়কে। যদি কেউ দেখে ফেলে তার বই বেরিয়েছে, তাহলে সে খুব বিব্রত বোধ করবে। অ্যান্ড ২০০০–এ পৌঁছে সে বইগুলো যত্ন ক’রে রেখে দেয় ড্রয়ারে, যেনো কেউ দেখতে না পায়। সে প্রকাশিত হয়েছে, সে প্রকাশিত কাব্যের কবি, এটা তাকে শিউরে দিতে থাকে, এটা তাকে হঠাৎ চুমো খাওয়া তরুণীর মতো সুখী বিব্রত স্বপ্নগ্ৰস্ত ক’রে তোলে।
সে নিজের সাথে, একটি সিগারেট ধরিয়ে, কথা বলতে থাকে।
হাসান, তুমি কেনো বিব্রত বোধ করছে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ নিয়ে? তুমি এর জন্যে মাসের পর মাস ব্যাকুল হয়ে ছিলে না, যেমন প্রেমিক থাকে প্রেমিকার জন্যে? তোমার তো এখন উচিত উল্লাসে ফেটে পড়া, চারদিক মাতিয়ে তোলা, যেমন প্রেমিকাকে পেলে মত্ত হয়ে ওঠে প্রেমিকের রক্তমাংস।
তোমার তো উচিত এখন সুখে আনন্দে খানখান হয়ে ডেস্ক থেকে ডেস্কে যাওয়া, সবাইকে বই দেখানো, কিন্তু তুমি যাচ্ছো না কেনো?
আজ সন্ধ্যায় আড্ডায় গিয়ে তুমি সবাইকে দেখাবে তোমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ, সালেহ আর মোস্তফা হায়দার যেমন বই নিয়ে ছুটছিলো। তুমিও তেমন ছুটবে।
ছুটিতে হয়, নইলে হয় না; বই গোপন বস্তু নয়, তা সবাইকে জানানোর জন্যে।
কবিতার জন্যেও ফিল্ড ওয়ার্ক দরকার হয়, হাসান, সবাই করে।
না, থাক, কয়েক দিন আমার বই একান্ত আমার হয়ে থাক; তারপর দেখাবো।
দেখাতে গিয়ে তুমি বিব্রত হয়ে না, হাসান।
সন্ধ্যায়, অন্যান্য দিনের থেকে অনেক আগে–আজ কেনো এতো আগে ঘরে ফিরতে ইচ্ছে হলো, আপাদমস্তক বিশুদ্ধ আমহাজগত একলা হ’তে ইচ্ছে হলো ব’লে?—, ঘরে ফিরে হাসানের মনে হয় সূচনা হলো এক নতুন সময়ের, আর কারো কাছে নয় হয়তো, কিন্তু তার কাছে। ভবিষ্যতের কথা কে বলতে পারে, কে পড়তে পারে ভবিষ্যতের শাদা পৃষ্ঠা? বহু দিন পর সে মুগ্ধ হচ্ছে, একটা কিছুর দিকে সে তাকিয়ে থাকতে পারছে— ‘সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সে কখনো তাকিয়ে থাকে প্রচ্ছদের দিকে— সুদূর নক্ষত্রের মতো অচেনা লাগে নিজের নামটি,–নাম, ওরে নাম, তোর জন্যেই কি এই নিরন্তর জাগরণ?–, সূচিপত্রের ওপর চোখ বোলাতে থাকে কখনো, একটি শিশু একটি কিশোর জেগে ওঠে তার ভেতরে, পুকুরে সাঁতার কাটতে থাকে, হিজলের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে, হঠাৎ বর্ষায় খলখল করছে মাঠ, উল্টেপাল্টে বারবার সে পড়ে কবিতাগুলো- এগুলো আমি লিখেছি? আমি লিখেছি? ন্যাংটাে সাঁতার কাটতো যে একদিন, সে লিখেছে? হিজলের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতো যে হাফপ্যান্ট প’রে, সে লিখেছে?–কখনো একটি দুটি মুদ্রণক্রটি তাকে কষ্ট দেয়। একটি কবিতায় ‘অন্ধ’ হয়ে গেছে ‘অন্য’, আরেকটিতে ‘নিশ্বাস’ হয়ে আছে ‘বিশ্বাস’–শব্দ দুটির ওপরই দাঁড়িয়ে ছিলো কবিতা দুটি অনেকটা, ভুল ছাপা হয়ে কবিতা দুটি যেনো কুঁড়েঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। পাঠক কি বুঝবে কী ছিলো এখানে? একটি কবিতা থেকে বাদ প’ড়ে গেছে একটি চাবিশব্দ। হায়!
আমার পংক্তিগুচ্ছ স্তবকমালা আমার কবিতা
জানি না তোমরা কবিতা কি না সত্যিই জানি না
জানি না তোমরা কী শুধু জানি তোমরা আমার সত্তা
তোমরা জন্মেছো আমার রক্ত থেকে মাংস থেকে আমার ক্ষুধা থেকে
স্বপ্ন থেকে আমার ব্যর্থতা থেকে সুখ থেকে দুঃস্বপ্ন থেকে
আমার প্রেম থেকে কাম থেকে আমার নিদ্রা থেকে অনিদ্রা থেকে আমার শৈশব থেকে উঠে এসেছে আমার যৌবন থেকে দল মেলেছো
যখন ঝড়ে ভাঙাচোরা খড়ের ঘরের মতো প’ড়ে থেকেছি
তখন তোমরা জন্মেছো যখন অনন্ত নীলিমায় ঝড়ে বজে বিদ্যুতে উড়েছি
একলা তখন তোমরা বিকশিত হয়েছো
তোমাদের পেয়েছি আমি হঠাৎ রাস্তায় পেয়েছি জনতাদূষিত রাজপথে
যখন নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থেকেছি
তোমাদের পেয়েছি ট্রাকের চাকার নিচে যখন রঙিন প্রজাপতির মতো প’ড়ে থেকেছে কোনো রিকশা
পেয়েছি যখন আমার চোখের সামনে দুলে উঠেছে
যমজ ভগিনীর মতো কোনো তরুণীর উদ্ধত স্তনযুগল
তোমাদের পেয়েছি যখন গাছের সবুজ গ’লে গ’লে ঝরেছে আমার চুলে
সবুজ হয়ে উঠেছে আমার চুল আমার মুখ আমার চোখ
তোমাদের মধ্যে আছি আমিই তোমরা আমিই
তোমরা অামারই শিল্পরূপ
সীমাহীন অতল অন্ধকারে তোমরা অন্য অন্ধকার
এই তো শুরু, এই তো ব্যর্থতার বুলি কাঁধে মহাকালের দিকে যাত্রা।
এই তো শুরু, পিছল মাটির ওপর দিয়ে অচেনা ভুবনের দিকে যাত্রা।
এই তো শুরু, নিষ্ঠুর রক্তপিপাসু শিখরের দিকে অবিরাম আরোহণ।
এই তো শুরু, এই তো শুরু, এই তো শুরু …
