প্রকাশনা উৎসব স্তব আর উচ্ছাসে মুখর হয়ে ওঠে।
এক আলোচক বলেন, এটা এক মহৎ কাব্যসংগ্ৰহ, এই কবির কবিতা চিরকালীনতা লাভ করেছে, তিনি বাঙলা ভাষার এক প্রধান কবি।
আরেক আলোচক বলেন, আধুনিক কবিতার ধারায় তিনি শুধু এক প্রধান কবিই নন, তিনি তিরিশের নষ্ট আধুনিকতা ত্যাগ ক’রে আধুনিক বাঙলা কবিতাকে পাশ্চাত্য থেকে ঘরে ফিরিয়ে এনেছেন; তার কবিতায় দ্যাশের মাটির গন্ধ পাওয়া যায়, তাঁর কবিতায় ঘাসের গন্ধ পাওয়া যায়।
হাসানকে যখন ডাকা হয় সে স্থিরভাবে মাইক্রোফোনের দিকে যায়, কিন্তু ভেতরে একটা তীব্র কম্পন অনুভব করে;–তাকেও বলতে হবে একরাশ মিথ্যে, উচ্চারণ করতে হবে নিরর্থক স্তবস্তুতি? যা কবিতা হয় নি, তা উদ্ধৃত ক’রে বলতে হবে এগুলো আধুনিক ও শাশ্বত?
সে জানে না সে কী ব’লে ফেলবে। ঠিক আছে সে মিথ্যে কথাই বলবে; কবি নিজে বসে আছেন মঞ্চে, তিনি মিথ্যে শুনে সুখী হবেন, মিথ্যে সাধারণত সুখকর; তাতে বাঙলা কবিতার কিছু যাবে আসবে না, হাজার বছর ধ’রেই তো কতো বাজে পদ্যে ভ’রে আছে বাঙলা কবিতার নদী? সরোবর? পুকুর? গোলা? ডোল? ঈশ্বরগুপ্ত রঙ্গলাল কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার কায়কোবাদ এমদাদ আলি বন্দে আলি বাজে পদ্য লিখেছেন ব’লে কার কী ক্ষতি হয়েছে?
কিন্তু সে কথা বলতে গিয়ে দেখে সে মিথ্যে বলতে পারছে না; ওই কবির কবিতা মনোযোগের সাথে প’ড়ে তার যা মনে হয়েছে, তাই বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে তার ভেতর থেকে। ওই কবির তো কবিতাই লেখা ঠিক হয় নি। ভালো পিতা আর শ্বশুর হিশেবে জীবন কাটিয়ে গেলেই ভালো করতেন তিনি।
হাসান বলে, কাব্যসংগ্ৰহ প্রকাশ এক সুখকর আনন্দদায়ক ঘটনা, তার কবিতার সংগ্ৰহ প্রকাশে কবি আনন্দিত, আমরাও সবাই আনন্দিত। তিনি এ-বয়সে যে পাঁচশো কবিতা লিখেছেন, তার জন্যে তাকে আমি অভিনন্দন জানাই।
হাসান বলে, কবিতা লেখা সকলের জন্যে জরুরি নয়, কারো কারো জন্যে জরুরি; কিন্তু পৃথিবীতে তারাই কবিতা লিখতে বেশি উদ্যোগী হয়, যারা অন্য কিছু করলেই ভালো হতো কবিতার জন্যে, এবং তাদের জন্যে।
হাসান বলে, আধুনিকতা বাঙালি মুসলমানের কাছে বড়ো ধাঁধা, মুসলমানের পক্ষে আধুনিক হওয়া প্রায় অসম্ভব, শিল্পকলা বোঝাও কঠিন।
হাসান লক্ষ্য করে চারদিকে একটা অস্বস্তিকর স্তব্ধতা ছড়িয়ে পড়ছে।
হাসান বলে, বাঙালি মুসলমান পঞ্চাশের দশকে আধুনিক হয়ে উঠতে পারে নি, কবিরাও প্রকৃত আধুনিক হয়ে উঠতে পারেন নি। আজ যার কবিতা আমরা আলোচনা করছি, তার কবিতায় আধুনিক চেতনার থেকে অনাধুনিক ইসলামি ও লৌকিক চেতনাই বেশি পাই। আমার মনে হয় তাঁর লেখা কবিতাও হয়ে উঠেছে খুবই কম। তাঁর কৃতিত্ব উৎকৃষ্ট কবিতা সৃষ্টির নয়, তাঁর কৃতিত্ব তিনি বাঙালি মুসলমানের কবিতার ধারাটিকে শুকিয়ে যেতে দেন নি, নিজেকে উৎসর্গ ক’রে তিনি পরবর্তীদের জন্যে কবিতার স্রোতকে অবারিত রেখেছেন।
আরো খোলাখুলিভাবে একথাগুলো তার বলতে ইচ্ছে করছিলো; কিন্তু কবির কথা মনে রেখে একটু রেখেঢেকেই বলার চেষ্টা করছিলো হাসান।
মঞ্চে তখন চিৎকার শুরু হয়ে যায়, কবি নিজে চেয়ার থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম করেন, আর আয়োজনকারীদের একদল হৈচৈ ক’রে হাসানের সামনে থেকে মাইক্রোফোন টেনে নেয়, তার হাত থেকে কাব্যসংগ্রহটি কেড়ে নেয়। হাসান আস্তে আস্তে মঞ্চ থেকে নিচে নেমে আসে।
এক আয়োজনকারী তাকে আটকে বলে, এইসব বলার জাইন্যে আপনেরে আমরা ডাকছি নি? আপনে কবিতার এইটা বোঝেন।
হাসান বলে, আমি যা বুঝি তাই বলতে চেয়েছি।
আরেক আয়োজনকারী বলে, আপনের মোখ ভাইঙ্গা দেঅন দরকার।
হাসান সভাকক্ষ থেকে ধীরেধীরে বেরিয়ে আসে, এবং দেখতে পায় তার পেছনে পেছনে বেরিয়ে আসছে শ্রোতাদের অনেকে।
এক তরুণ দৌড়ে এসে একটি খাতা খুলে বলে, একটি অটােগ্রাফ দিন। হাসান এক নতুন চাঞ্চল্য বোধ করে; এবং বলে, না, না, আমি এখনো অটােগ্রাফ দেয়ার উপযুক্ত হই নি।
তরুণটি তার খাতা বাড়িয়ে ধ’রে থাকে।
হাসান তার খাতাটি নিয়ে স্বাক্ষর দেয়, এবং নিচে একটি ধারালো দাগ দিয়ে দুটি ফোঁটা দেয়।
নতুন কাল এই প্রথম তার স্বাক্ষর চায়, নতুন সময়কে সে এই প্রথম স্বাক্ষর দেয়। এই শুরু; নতুন কাল তার দিকে শূন্যপৃষ্ঠা তুলে ধরতে শুরু করেছে।
তরুণটি জিজ্ঞেস করে, এই রেখা ও ফোটা দুটির কী অৰ্থ?
হাসান তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, কোনো অর্থ নেই।
তরুণটি বলে, না, নিশ্চয়ই অর্থ আছে, আমাকে বলুন।
হাসান হেসে বলে, এটি তরবারি, যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছি।
রাতে ঘরে ফিরে গিয়ে ওই কবির জন্যে তার খুব কষ্ট হয়, ভারি একটা যন্ত্রণা তাকে চেপে ধরে, ইচ্ছে হয় মাইল মাইল মাইল হেঁটে হেঁটে হেঁটে পা ক্ষতবিক্ষত ক’রে পাহাড় ডিঙ্গিয়ে নদী পেরিয়ে তাঁর সামনে গিয়ে মাটিতে মাথা নিচু ক’রে বসে থাকে সারারাত। তার মুখে কোনো কথা আসবে না, মাটিতে বসে থেকেই সে কবিকে জানাবে তার অশেষ বেদনা। ওই কবি ব্যর্থ, তার কোনো কবিতাই সম্পূর্ণ কবিতা হয়ে ওঠে নি, কিন্তু তিনি তো কবিতার জন্যে ব্যয় করেছেন সারাটি জীবন। কবির কী আছে হৃদয়ের একগুচ্ছ খড়কুটাে ছাড়া? ওই খড়ে আগুন? লাগলে ছাই হয়ে যায় মহাজগত, আবার শিশির জমলে মহাজগত জুড়ে ফোটে শিউলি কামিনী রক্তজবা। অন্য কিছুর জন্যে এভাবে জীবন ব্যয় করলে পার্থিব সোনায় তাঁর সব কিছু ভ’রে উঠতো, কখনো এমন যন্ত্রণা সহ্য করতে হতো না। তিনিও তো দণ্ডিত, প্রতিটি মুহূর্ত তিনি দণ্ড ভোগ করেছেন, জেগে থেকেছেন অজস্র রাত্রি, শুধু স্বপ্ন দেখছেন, ব্যর্থতার আগুনে পুড়েছেন, যেমন সে জেগে থাকছে রাতের পর রাত, স্বপ্ন দেখছে, স্বপ্নগুলো দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠছে। তারাও তো বেরোতে যাচ্ছে প্রথম কাব্যগ্রন্থ, তার বই নিয়ে যে উল্লাসে মেতে উঠবে না। শহর, এটা সে জানে; অনেক আক্রমণ আসবে, তার কবিতাকে হয়তো ছিঁড়ে ফেড়ে ফেলবে অনেকে, হয়তো তার উৎকৃষ্টতম চিত্রকল্পটি দেখিয়ে বলবে এটা কিছুই হয় নি, এটা কষ্টকল্পনা। কবিতা তো মেপে দেখানো যায় না, কবিতাকে তো নম্বর দেয়ার কোনো উপায় নেই। সময়ই বিচার করবে। কবিতা, এসব যদিও বলা হয়, তবু মানুষই বিচারক, এবং সব সময়ই মনস্বী বিচারকের খুবই অভাব, তুচ্ছদের বিচারই মেনে নিতে হয় যুগ যুগ। হাসান যন্ত্রণা বোধ করতে থাকে, ওই কবির জন্যে যন্ত্রণাটি রাতের গভীরতার সাথে সাথে পরিণত হয় নিজের জন্যে গভীর যন্ত্রণায়।
