গোলমালে তার কথা কেউ ভালোভাবে শুনতে পায় না ব’লেই মনে হয়; কিন্তু সালেহ ফরিদউদ্দিন তার দিকে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে থাকে, বিচলিত হয়, কথা বলে না, ঢকঢক ক’রে চা শেষ করে, সে হয়তো এখনই তার প্রুফগুচ্ছ বুকে নিয়ে কেঁদে উঠব; এবং একটু পরেই রেস্তোরাঁঁ থেকে বেরিয়ে যায়।
কয়েক দিন পর আবার হাসান যায় শেখ সাহেব বাজার রোডের রিকশাঅলা রেস্তোরাঁয়, যেটি তাকে এখন ডাকে, টানে, যার ধোঁয়া আর চিৎকার সুখকর মনে হয়। তার কাছে। আড্ডা চলছে, ধোঁয়া আর প্রচণ্ড শব্দ উঠছে, প্রুফ দেখে চলছে সালেহ ফরিদউদ্দিন ও আহমেদ মোস্তফা হায়দার।
সালেহ ফরিদউদ্দিন বলে, আসো, আসো, দোস্ত, আমার কবিতা শোনো; যা ল্যাখছি জবাব নাই, নতুন বড়ো কবি আসতে আছে দ্যাশে, জীবনানন্দের পর দোস্ত আমিই একলা কবি, তোমরা কবি হইতে পার নাই।
হাসান হাসে, এবং বলে, তুমি আবার ছােটােখাটাে জীবনানন্দ হয়ে উঠো না, সালেহ, বড়ো জীবনানন্দের পর ছোটাে জীবনানন্দকে খুব করুণ দেখাবে।
সালেহ বলে, আরো দোস্ত, অইটারেও আমি ছারাই যামু, দেইখ্যো।
হাসান বলে, আচ্ছা, শুনি তোমার কবিতা।
সালেহ বলে, আমার বহর প্রথম কবিতাটা বদল করছি, এখন প্রথম কবিতাটার নাম ‘সালেহ ফরিদ’, সেইটাই তোমারে শুনাই।
হাসান সালেহর কথা শুনে নিথর হয়ে যায়, এক অসীম ভারি কর্কশ স্তব্ধতা ভর করে তার ওপর। সে কোনো কথা বলতে পারে না; বলতে পারে না যে এ-নামে তোমার কোনো কবিতা ছিলো না, সালেহ, তুমি সেদিন আমার শেষ কবিতাটির নাম শুনে এ-কবিতা লিখেছে; সালেহ, তুমি এ-অভ্যাস ছাড়ো।
সালেহ করুণ কাতর স্বরে তার কবিতা পড়তে থাকে, হাসানের দিকে তাকাতে পারে না, হাসান তার বিব্রত স্বরে অপরাধবোধের কণ্ঠ শুনতে পায়। সালেহ একটি বিষন্ন অহমিকাপূর্ণ নার্সিসীয় কবিতা লিখেছে নিজেকে নিয়ে, তার স্বভাব অনুসারে বসিয়েছে নানা এলোমেলো বাক্য আর ছবি, সতেরো বছরের কুয়াশাচ্ছন্নরা পছন্দ করবে। এই কবিতা। সালেহর বই তো তার বইয়ের অনেক আগেই বেরিয়ে যাবে, সে কি তার শেষ কবিতাটি রাখবে বইয়ে? সবাই ভাববে না সে সালেহরা দেখাদেখি নিজেকে নিয়ে নিজের নামে লিখেছে কবিতাটি? আর তার কবিতাটি তো সহজে পাঠকের ভেতরেও ঢুকবে না; সে কোনো কাতর হাহাকার করে নি, বিষগ্ন অহমিকা দেখায় নি, সে লিখেছে একটি সময়ের আন্তর ইতিহাস।
আড্ডাটি তার চোখে ময়লা ঘোলাটে হয়ে ওঠে।
হাসান উঠে পড়ে আড্ডা থেকে, সে বাদ দেবে তার কবিতাটি বই থেকে।
হাসান একটি সিগারেট ধরিয়ে হাঁটতে থাকে, রাস্তার মানুষ আর যানবাহনকে তার ধূসর অপরিচিত মনে হয়,–সে বাদ দেবে তার কবিতাটি বই থেকে?
বাদ দেয়াই উচিত, বাদ তাকে দিতেই হবে, ওই কবিতাটিকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে হবে, যেনো ওটি কখনো লেখা হয় নি।
কেনো বাদ দেবে তার কবিতাটি? কেনো মুছে ফেলবে? অনেক খেটে সে লিখেছে কবিতাটি।
কবিতাটি আমার প্রিয় ছিলো, আজ থেকে আমি আর ওটি পড়তে পারবো না। সে হাঁটতে হাঁটতে নিজের সাথে কথা বলতে থাকে। কোনো আমি আমার কবিতার নাম ওদের বলতে গেলাম?
না, কবিতাটি থাকবে, যদিও ওটি আমার প্রিয় থাকবে না।
আমার জন্যে আর আড্ডা নয়, আমার জন্যে নিঃসঙ্গতা, আমার জন্যে একলা জীবন, আমার জন্যে শুধু কবিতা, আমার জন্যে ব্যর্থতা, আমার জন্যে দণ্ড।
হাসানের কবিতাগুলো কম্পোজ হতে থাকে, ধীরে ধীরে, মাসের পর মাস কেটে যেতে থাকে, সে প্রুফ দেখতে থাকে, আলেকজান্ড্রা প্রেসে যেতে থাকে, ফিরে আসতে থাকে, নিউজপ্রিন্টের গন্ধে তার বুক ভরে যেতে থাকে।
এর মাঝে আরেকটি আলোচনা অনুষ্ঠানে, আকস্মিকভাবেই, অংশ নিতে হয় তাকে। পঞ্চাশের এক কবির কাব্যসংগ্ৰহ বেরিয়েছে, তার প্রকাশনা উৎসব হবে, আয়োজকদের একজন তাকে অনুরোধ করে ওই উৎসবে সংগ্রহটি আলোচনা করার জন্যে। সে কি সম্মত হবে? হাসান প্রথম সম্মত হয় না, ওই কবিকে সে ঠিক কবি মনে করে না,–এই দেশে এমদাদ আলিও কবি বেগম রোকেয়াও কবি কাদের নওয়াজও কবি–,তাঁর কবিতার বিশেষ মূল্য নেই ব’লেই তার মনে হয়, সে প্রকাশনা উৎসবে তার কবিতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতে পারবে না, তাই তার তাতে না থাকাই ভালো। প্রকাশনা উৎসবের জন্যে দেশে খান জামান চৌধুরী মোল্লারা উল্লারা আছেন, তারা সব কিছুর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করার বিনম্র উদার প্রতিভা নিয়েই জন্ম নিয়েছেন, কোনো কিছুই মূল্যহীন নয় তাদের কাছে, ছাইয়ের ভেতরে তাঁরা সব সময় অমূল্য রতন পেয়ে ধন্য হন, সব ছোটাে বড়ো পংক্তিই তাঁদের কাছে মহৎ কবিতা, প্ৰতিগণ্ডা পংক্তিই উদ্ধৃতিযোগ্য তাদের কাছে, ওই মহৎ মৌলভিদের দিয়েই প্রকাশনা উৎসবের মতো বিবাহানুষ্ঠান সম্পন্ন করা ভালো। বিবাহোৎসবে বর যতোই অযোগ্য কুৎসিত হোক সে-ই নরোত্তম, প্রকাশনা উৎসবে কবিমাত্রই বড়ো কবি। সে কি থাকবে ওই উৎসবে? উচ্ছ্বসিত স্তব করবে ওই কবির? তাঁর নিকৃষ্ট পদ্যের? তার থাকা ঠিক হবে না, সে আয়োজকদের জানিয়ে দেয়; কিন্তু তাকে থাকতেই হয়, কবি নিজে তার বক্তব্য শুনতে চান।
কবি নিজে তার বক্তব্য শুনতে চান? এটা আরো বিব্রতকর তার কাছে। ওই কবির সাথে তার দু-একবার দেখা হয়েছে, তিনি লোক ভালো, তার কবিতার প্রশংসা করেছেন তিনি, নিজের কবিতা সম্পর্কেও জানতে চেয়েছেন; কিন্তু লোক ভালো হ’লেই কবি ভালো হয় না; ভালো লোকেরা সাধারণত জঘন্য খারাপ কবি হয়। ভালো লোকদের কবিতা লেখা অনুচিত, তাদের উচিত বিয়ে সংসার ক’রে বাচ্চার পর বাচ্চা জন্ম দেয়া, শ্বশুরবাড়ি গিয়ে শাশুড়িকে মা ব’লে সালাম করা।
