বৃদ্ধ বলেন, রাস্তায় পাগল আসতে দেখলেই আমার মনে হয় কোনো কবি আসতেছে, বই ছাপাইতে বলবো। আপনের ত লম্বা চুল নাই, পরনে ছিরা জামা নাই, আপনে আবার দারিও কাটছেন।
পিতার কথা শুনে দুই তরুণ বেশ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু ক’রে থাকে।
হাসান বলে, আমি অতো বড়ো কবি নই।
বৃদ্ধ বলেন, আপনে দেখি আবার শুদ্ধ ভাষা কন, কবিরা শুদ্ধ ভাষা জানে না।
হাসান বলে, আপনি কবিদের সম্পর্কে চমৎকার ধারণা রাখেন, আমার বেশ ভালো লাগছে।
বৃদ্ধ বলেন, কবিতা ছাইরা আমারে ক্যালাস নাইনের কয়টা নোট বই লেইখ্যা দেন, অইগুলি চলে, হাতে দুই চাইর পয়সা আসে, আপনেও ভাল পয়সা পাইবেন, কবিতায় পয়সা নাই, পাগল ছারা কেও কবিতা পড়ে না।
বৃদ্ধের কথা শুনে তাঁর লাজুক পুত্র দুটি লজ্জা পায়, হাসান হাসে, এবং বলে, নোটবই লিখতে পারলে খুব খুশি হতাম, তবে নোট বই লিখতে হ’লে পণ্ডিত হতে হয়, এক্সপেরিয়েন্স্ড্ হেডমাস্টার হতে হয়, আমি তাদের মতো পণ্ডিত নই; আপনি তো জানেন ফেলকরারা আর মূর্খরাই কবিতা লেখে; আর পয়সা? পয়সা খুবই সুন্দর, খুবই পবিত্র, পয়সা দেখতে আমার ফুলের থেকেও ভালো লাগে, আমি যদি বিশ্বাসী হতাম। তাহলে শুধু পয়সায়ই বিশ্বাস করতাম।
বৃদ্ধ বলেন, হ, বােঝছি, পয়সাই যদি চাইবেন তাইলে আর ক্যান কবিতা ল্যাখবেন, তাইলে ত ব্যবসাবাণিজ্যই করতেন।
হাসান হাসে, আপনি ঠিক বুঝেছেন, তবে আমি স্বপ্নে কিন্তু শুধু পয়সাই দেখি।
বৃদ্ধ বলেন, আপনারে আমার ভাল লাগতেছে, আপনে অন্য কবিগুলির মতন না। তারা আইসাই বিড়ি ধরায়, চা খাইতে চায়, দোকানো ছাপ ফালায়, আর বলে তাগো মতন কবি আর নাই। তয় আমার কাছে কবি হইতেছে মহাকবি কায়কোবাদ, আর কবি নাই, তার মতন ল্যাখেন ত ‘কে মোরে শোনাইল আজানের ধ্বনি, মর্মে মৰ্মে সেই সোর বাজিল কি সোমধুর, আকোল করিল প্ৰাণ নাচিল ধমনী’। ল্যাখেন ত এমন কবিতা, দেখুম কেমুন কবি আপনেরা।
প্রথম কবিতার বই ছাপার জন্যে গৃহীত হয়ে গেছে, চৌধুরী ব্রাদার্স গ্রহণ করেছে তার পাণ্ডুলিপি, হাসান কাঁপছে থরোথরো, দিনরাতগুলো তার স্বপ্নে ভরে গেছে। যন্ত্রণায় ভ’রে গেছে মধুরতায় ভ’রে গেছে। অ্যান্ড ২০০০-এর ডেস্কে বসে স্ক্রিপ্ট লিখতে লিখতে মনে হয় তাকে যেতে হবে নবাবপুরে আলেকজান্ড্রা প্রেসে, পবিত্রতম গন্তব্যে, তীর্থে, যেখানে অলৌকিক লাইনোতে ছাপা হচ্ছে তার কবিতার বই, লাইনো হচ্ছে কবিতা আর কবিতা হচ্ছে লাইনো, তাকে প্রুফ দেখতে হবে, প্রুফ দেখাটা তাকে শিখে নিতে হবে, আঙুল থেকে বের করতে হবে ওই চমৎকার ঐন্দ্রজালিক চিহ্নগুলো। সে গন্ধ পেতে থাকে নিউজপ্রিন্টের, তার বুক ভরে যায়, গোলাপের- যদিও সে ঠিক জানে না গোলাপের গন্ধ কেমন, কখনো ঘ্রাণ নেয় নি ওই প্রখ্যাত ফুলের— থেকেও অনেক অনেক সুগন্ধি ওই নিউজপ্রিন্ট, তা চোখের সামনে নক্ষত্রগুচ্ছের মতো জ্বলে ওঠে লাইনো পংক্তিমালা, ওই অপূর্ব অক্ষরে মুদ্রিত হয়ে তার তুচ্ছ গরিব বিষন্ন পংক্তিগুলো হয়ে উঠবে কবিতা, এই ভাবনা তাকে শিউরে দিতে থাকে।
একদিন গিয়ে দেখে কম্পোজ হচ্ছে তার কবিতা; চার পাতা কম্পোজ হয়েছে।
কম্পোজিটর তার হাতে চারটি পাতা দিয়ে কম্পোজ করতে থাকে, ঝনাৎ ঝনাৎ ক’রে ঝরতে পড়তে থাকে একেকটি পংক্তি, শব্দটাকে তার সিম্ফনির থেকে মধুর মনে হয়, ইচ্ছে হয় তাড়াতাড়ি পংক্তিগুলো তুলে দেখতে, কিন্তু সে কোনো কথা বলে না, সে দেখে তার লেখা কবিতা হচ্ছে, অমরতা পাচ্ছে।
একটি লোক এসে বলে, আপনে কি প্রুফ দ্যাখতে জানেন?
হাসান বলে, না।
লোকটি বলে, শিখ্খা লইয়েন, আবার সাত দিন পর আইয়েন।
বিকেলােভর কাঁপতে কাপতে কবিতাগুলো পড়তে পড়তে ওগুলোর রূপ বদলে গেছে দেখতে দেখতে সন্ধ্যার পর হাসান চার পাতার প্রুফ নিয়ে উপস্থিত হয় শেখ সাহেব বাজার রোডের রিকশাঅলা রেস্তোরাঁঁর আড্ডায়; দেখে জমজমাট আড্ডা চলছে, আর প্রুফ দেখে চলছে সালেহ ফরিদউদ্দিন ও আহমেদ মোস্তফা হায়দার।
সালেহ বলে, দোস্ত, তোমার বই না কি কম্পোজ শুরু হইয়া গ্যাছে?
হাসান বলে, হ্যাঁ, চার পাতা প্রুফ দিয়েছে।
মোস্তফা হায়দার জিজ্ঞেস করে, কয়টা কবিতা দিলা, কি কি কবিতা দিলা, দোস্ত? পলিটিকেল কবিতা কয়টা দিলা? পলিটিকেল কবিতা ছাড়া আইজকাইল কবি হঅন যায় না, দ্যাখছো না রাস্কেল বিভূতিভূষণটা থার্ড ক্লাস পলিটিকেল কবিতা লেইখ্যা পপোলার কবি হইয়া গ্যালো। ওই শালা কোনো কবি না, কিন্তু আইজাকাইল ওইটাই হইছে এক নম্বর কবি।
হাসান বলে, আশিটির মতো কবিতা দিয়েছি, কোনো পলিটিকেল কবিতা নেই, আমি তো অমন কবিতা লিখতে পারি না।
একটু থেমে হাসান বলে, বিভূতিভূষণ পপোলার হয়েই থাকবে, কোনো দিন কবি হবে না, সে আমাদের কবিয়াল।
মোস্তফা হায়দার বলে, তাইলে তুমি হইবা বালের কবি, যাও, দুই চাইরটা স্বাধীনতা, ফাদার অফ দি ন্যাশন, ড্যামোক্রেসি আর সোসিয়ালিজমের শ্লোগান ঢুকাই দেও, তাইলেই কবি হইবা।
হাসান বলে, আমি তা পারবো না তা তুমি জানো।
সালেহ জিজ্ঞেস করে, বই শুরু করলা কি কবিতা দিয়া আর শ্যাষ করলা কি কবিতা দিয়া? শুরু আর শ্যাষের কবিতা খুব ইস্পরটেন্ট, দোস্ত।
হাসান কয়েকটি কবিতার নাম বলে, এবং বলে, আমার শেষ কবিতাটির নাম ’হাসান রশিদ’।
