সালেহ কাঁদতে থাকে; আজ রাতে অনন্তের কানে সে তার কান্না পৌঁছে দিতে চায়, হাসানের মনে হয় সে নতুন কবিতার কান্না শুনছে।
তার ভেতরেও কেঁদে চলছে তার কবিতাগুলো।
রাকিব সুলতান মেঝে থেকে হুহু ক’রে কাদতে কাঁদতে উঠে বসে, হাসানকে দেখতে পেয়ে সে উচ্চকণ্ঠে কাঁদতে কাঁদতে হাসানের পা জড়িয়ে ধরে।
রাকিব সুলতানের কান্নার শব্দে সবাই যেনো অবলুপ্ত অতলতা থেকে এক অপরিচিত অস্বস্তিকর বাস্তবতায় জেগে ওঠে।
হাসানের পা জোরে জড়িয়ে ধ’রে চুমো খেতে থাকে রাকিব, এবং কাঁদতে থাকে যেনো এইমাত্র তার সবচেয়ে প্রিয়জনের মৃত্যু হয়েছে, আর বলতে থাকে, আমারে মাফ কইর্যা দেও, দোস্ত, মাফ কইর্যা দেও, বাঙলা কবিতা, মাফ কইর্যা দেও, চণ্ডীদাস, মাফ কইর্যা দেও, মুকুন্দরাম, আমি বড়ো পাপী, আমি নদীর কাছে পাপ করছি, নারীর কাছে পাপ করছি, ম্যাঘের কাছে পাপ করছি, অক্ষরবৃত্তের কাছে পাপ করছি, পাখির কাছে পাপ করছি, আমারে মাফ কইর্যা দেও।
হাসান তাকে টেনে তুলতে তুলতে বলে, তুমি কী করছো, কী করছো রাকিব, ওঠো, তুমি কোনো পাপ করো নি, পাপ আমরা সবাই করেছি, তুমি কোনো পাপ করো নি, কবিরা সবাই পাপী।
রাকিব সুলতান পাপের ভারি বোঝা মাথায় নিয়ে পা থেকে পায়ে ছুটতে থাকে। পাপের ভারে সে হাঁটতে পারছে না, কাঁপছে, প’ড়ে যাচ্ছে, কিন্তু সে ছুটছে; সব মানুষের পাপ থেকে মুক্ত হয়ে পবিত্র হয়ে উঠতে হবে তাকে।
সে ঢুলতে ঢুলতে গিয়ে জড়িয়ে ধ’রে কামর আবদিনের পা।
কামর আবদিন ভয় পেয়ে লাফিয়ে ওঠেন, এমন বর্বর তিনি আগে দেখেন নি, তার হাতের পাত্রটি দূরে ছিটকে পরে হাহাকার করতে থাকে, পারলে তিনি দৌড়ে বেরিয়ে যেতেন। পৃথিবী থেকে। বেরোতে না পেরে তিনি কাঁপতে থাকেন।
রাকিব সুলতান কামর আবদিনের পা জড়িয়ে ধ’রে চুমো খেতে খেতে কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে, আমারে মাফ কইর্যা দেও, ভাই, তুমি আমার অগ্রজ, তুমি আমার বাবা, তুমি আমার পিতামহ, তোমার কাছে আমার পাপের শ্যাষ নাই, তুমি হইলা আমাগো রবীন্দ্রনাথ, আমাগো জীবনানন্দ, আমাগো এলিঅট; তোমার কবিতা ছাড়া আর কোনো কবিতা নাই, আমারে মাফ কইর্যা দেও, তুমি ছাড়া আর কোনো মুসলমান কবিতা ল্যাখতে জানে না, তুমিই শুধু থাকবা, আমরা থাকুম না, আমারে মাফ কইর্যা দেও।
কামর আবদিন বুঝতে পারেন না। কী করবেন। তিনি রাকিব সুলতানকে জড়িয়ে ধ’রে বলতে থাকেন, এ আআআপনি কী কাককরছেন, এ আপনি কি বলছেন, আপনি আআমাদের বড়ো কবি হহবেন, আমার কবিতা কিছু না কিছু না, আপনার কবিতা পিউউর ককবিতা, আমি আজো শুদ্ধ কবিতা লিলিলিখতে পারি নি।
রাকিব সুলতান কামর আবদিনের পা ছেড়ে গিয়ে লুটিয়ে পড়ে করিম আহমেদের।
করিম আহমেদ বলেন, এ কি অসভ্যতা, এ কি গ্ৰাম্যতা, এ কি ভালগারিটি।
রাকিব কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমারে মাফ কইর্যা দেও, ভাই, তোমার কাছে আমি অনেক পাপ করছি, তুমি হইলা আমাগো হেমিংওয়ে, আমাগো টমাস মান, আমাগো জেমস জয়েস, আমাগো লরেন্স; আমারে তুমি মাফ কইর্যা দেও। কবতে কিছু না, বেশ্যার দালালও কবতে ল্যাখতে পারে, নভেল ল্যাখ্যার জিইন্যে দরকার জিনিয়াস। তুমি আমাগো জিনিয়াস।
রাকিব সুলতান তাঁর পা ছেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে পথ খুঁজতে থাকে, পথ খুঁজে পায় না; সে কাঁদতে থাকে, হাজেরারে, তার কাছে আমি পাপ করছি, তর বুকের কাছে আমি পাপ করছি, তার ঠোঁটের কাছে আমি পাপ করছি, তার শাড়ির কাছে আমি পাপ করছি, আমারে তুই মাফ কইর্যা দে।
হুহু ক’রে কাঁদতে থাকে রাকিব সুলতান।
কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ – ০৮
কয়েক দিন ধ’রেই হাসান ভাবছে একবার বাংলাবাজারের চৌধুরী ব্ৰাদার্সে যাবে, কথা ব’লে দেখবে তারা তার প্রথম কাব্যগ্রন্থটি বের করবেন কি না? একেকবার সে খুবই অনুপ্রাণিত বোধ করে, পরেই মনে হয় যদি তারা রাজি না হন? প্রথম কাব্যগ্রন্থ কি তাকে দুঃখ দেবে, লজ্জা দেবে, বুকে একটা ঘা জাগিয়ে দেবে? একদিন দুপুরে সে সুদূর বাংলাবাজারের পথে গিয়ে পৌঁছে; রিকশা থেকে নেমে খুঁজতে থাকে চৌধুরী ব্রাদার্স, তার লজ্জা লাগে, ভয় লাগে, মনে হয় ফিরে যাই, আবার সে একটি একটি ক’রে নম্বর আর নােম পড়তে পড়তে এগোতে থাকে। সে এক সময় চৌধুরী ব্রাদার্সের ছোটো দোকানটি দেখতে পায়। কলেজের ছাত্র যেমন প্রথম একলা পতিতাপল্লীর গলির সামনে এসে ভয়ে লজ্জায় হঠাৎ অন্য দিকে চ’লে যায়, তাকিয়ে দেখে কেউ তাকে দেখলো কি না, হাসানও দ্রুত হেঁটে পেরিয়ে যায় কয়েকটি দোকান, দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট কিনে ধরায়, আবার অন্য দিকে হাঁটতে থাকে, সিগারেটটি শেষ করে।
সে কি ফিরে যাবে? সে কি চৌধুরী ব্ৰাদার্সে ঢুকবে?
নিজের কী পরিচয় দেবে সে?
নিজেকে কবি বলা কি ঠিক হবে? না, না, না।
না, আর ঘোরাঘুরি নয়। আর সিগারেট নয়; সে এবার ঢুকে পড়ে চৌধুরী ব্রাদার্সে, দু-দিকে বসে আছেন দুই সুদৰ্শন তরুণ, মাঝে এক অদ্ভুত তীক্ষ্ণ বৃদ্ধ।
হাসান নিজের পরিচয় দিয়ে বলে, আমার নাম হাসান রশিদ।
দুই তরুণ উৎসাহিত হয়ে বলে, আপনার কথাই সেদিন হচ্ছিলো, আপনার বই আমরা ছাপবো ঠিক করেছি।
বৃদ্ধ বলেন, আপনে কবি? আপনারে ত কবির মতন দেখাইতেছে না।
হাসান জিজ্ঞেস করে, কবিরা দেখতে কেমন?
