হাসান বলে, আপনার আর সিগারেট খাওয়া ঠিক হবে না।
করিম আহমেদ রেগে ওঠেন, ধমক দিয়ে বলেন, আরে হাসান সাহেব, আপনি তো খুবই কৃপণ লোক, একটা সিগারেট, তাও দিতে চাচ্ছেন না।
শাহেদ আলতাফ অনেকক্ষণ চুপচাপ পান করছিলো, অল্প অল্প ঢুলে পড়ছিলো, এক সময় সব কিছু তার অসহ্য মনে হয়; সে ব’লে ওঠে, শালা এই গাইয়া কবিয়ালগো সাথে পান করতে আসার থিকা মেথরপট্টিই ফার বেটার, শালারা কবিতাও ল্যাখতে জানে না পান ও করতে জানে না। আমি এখনই বেরিয়ে বাদামতলি চ’লে যাবো, সেইখানে গোলাপির সাথে মদ খাবো।
শাহেদ আলতাফ একবার উঠতে গিয়ে ব’সে পড়ে; বিড়বিড় করতে থাকে, গোলাপি গোলাপি, পেতে দে তোর পবিত্ৰ দেহখানা।
পান করতে বেশ লাগছে হাসানের, বেশ লাগছে তার এই পরিবেশ। কবি, এখানে পান করছে কবিরা, যারা এই শহরের রাষ্ট্রের কেউ নয়, যারা নির্বাসিত এই শহর রাষ্ট্র বন্দুক কামান থেকে,–হাসানের মনে হ’তে থাকে–, কিন্তু তারাই এই সময়। আজ সন্ধ্যার আজ রাতের এই অসামান্য সময়টুকুই শুধু স্মরণীয় শুধু উল্লেখযোগ্য সারা শহরের আজকের ইতিহাসে, আর কিছু স্মরণীয় নয় উল্লেখযোগ্য নয়। কয়েক দিন আগে সে একটা ঝকঝকে উচ্চ আমলার চকচকে বাসায় পান করতে গিয়েছিলো, চারজনকে বসতে হয়েছিলো পৃথিবীর চার প্রান্তে, এবং তারা কেউ কথা বলছিলো না, যে যার পাত্র নিয়ে অল্প অল্প খাচ্ছিলো, হয়তো তারা ফাইল ঘাটছিলো, উন্নতি মাপছিলো, টাকা হিশেবে করছিলো, সভ্যতা বজায় রাখছিলো, আর হাসানের মনে হচ্ছিলো সে একটা গোয়ালঘরে বসে সাত দিনের বাসি পান্তাভাত লবণ ছাড়া খাচ্ছে। বারবার সে নিজেকে বলছিলো, হাসান, দ্যাখো, প্রতিভাহীনতা কাকে বলে, ভালো ক’রে দেখে নাও, সাফল্য হচ্ছে এই রকম, চুপচাপ, অতিশয় সভ্য, চারপ্রান্তে, নীরবে নিঃশব্দে পান্তাভাত। একটু পরেই সে বেরিয়ে এসেছিলো, ঠিক করেছিলো ওই সাফল্যের পান্তাভাতে সে আর যাবে না।
পান করতে তার বেশ লাগছে, সব কিছু সুন্দর মনে হচ্ছে, কয়েক দিন আগে যেরঙিন ট্রাকটি তাকে চাপা দিতে দিতে স’রে গিয়েছিলো, সেটির মুখ সে দেখতে পাচ্ছে–সুন্দর বিষন্ন পবিত্র মুখ, সেটির গলা জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে, এবং তার ভেতর থেকে দু-তিনটি কবিতা না পাখি না কী যেনো গড়িয়ে গড়িয়ে বেরোতে চাচ্ছে, কয়েকটি চিত্রকল্প কোপে কেঁপে বারবার হানা দিচ্ছে, কয়েকটি শব্দ প্রজাপতির মতো উড়ছে ঘুরছে উড়ছে বসছে কাঁপছে নাচছে; একটু একটু ঘোলাটে বোধ করছে সে নিজেকে, এক অসম্ভব সরলতা তার ভেতরটাকে কোনোদিন না-দেখা দিঘির জলের মতো দোলাচ্ছে। সে বিষগ্ন হয়ে উঠছে তাদের পুকুরের পাড়ের নিঃসঙ্গ হিজল গাছটির ছায়ার মতো। হিজল, তুমি আমার থেকে পাঁচ বছর দূরে আছাে আমি আছি তোমার থেকে, কেমন আছো, তুমি? কী রকম ব্যথিত সুদূর নক্ষত্রের মতো মনে হচ্ছে সবাইকে, কী যেনো তারা জয় করতে চাচ্ছে যা তারা কখনো জয় করতে পারবে না, তারা চিরপরাভূত থেকে যাবে। আমি এই চিরপরাজিতদের একজন, আমি এই চিরপরাজিতদের একজন হ’তে চাই, যেমন পরাজিত রবীন্দ্রনাথ, যেমন পরাভূত সুধীন্দ্রনাথ জীবনানন্দ বুদ্ধদেব, যেমন পরাভূত বদলেয়ার র্যাঁবো মালার্মে ইয়েট্স্, এবং আরো অজস্র মত্ত উন্মত্ত উদ্ধাস্তু।
হাসান নিজের পাত্রটিকে ভ’রে নেয়ার জন্যে উঠে দাঁড়ায়, একটুকু কাঁপে, মধুর কম্পনটুকু সে উপভোগ করে, সে নির্ভার হচ্ছে, মধ্যরাতে হয়তো কোনো খ’সে পড়া গাছের পাশ দিয়ে গড়িয়ে যাবে ছোট্ট কোনো পুকুরের দিকে।
সে দেখে আলাউদ্দিন নদীর পাড়ে একটি বিশাল নৌকোর মতো কাৎ হয়ে আছে, মেঝের ওপর শাশ্বত বিকলাঙ্গ ভিখিরির মতো প’ড়ে আছে রাকিব সুলতান, চুপচাপ পান করছে কামর আবদিন, করিম আহমেদ, শাহেদ আলতাফ, হয়তো তারা অন্য কোনো নক্ষত্রে আছে যার নাম তারা জানে না; সালেহ ফরিদউদ্দিন তার প্রুফগুচ্ছ জড়িয়ে ধ’রে কাঁদছে।
মরিয়ম এসে তার পাত্রটি ভ’রে দেয়, একগুচ্ছ মেঘ তার আঙুলে লাগে।
মরিয়মকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে, ওর চুলের ভেতর একরাশ আঙুল প্রবাহিত ক’রে দিতে ইচ্ছে করছে, ওর শাড়ির ভেতর দিয়ে একটা কোমল নরম সাপের মতো এঁকেবেঁকে ওপরের দিকে উঠে বিড়া পাঁকিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে, ওর বুকে একটা ছোটো পাখি হয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।
মরিয়ম বলে, কবিদের মদ খাওয়া খুব সুন্দর, দেখতে আমার ভাল লাগে।
ঝলক দিয়ে উঠছে মরিয়ম।
মরিয়মের পায়ের তালু দুটি কেমন? সেখানে ওষ্ঠ ছোঁয়াতে ইচ্ছে করছে; ও কি শোয় আলাউদিনের সাথে, তা শোক, ওর ঠোঁটে হুইস্কি হয়ে লেগে থাকতে ইচ্ছে করছে, ওর গ্ৰীবায় একটা লাল তিল হয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে; ওকে একটি কবিতার পংক্তি ক’রে চিরকালের জন্যে অমরতা দিতে ইচ্ছে করছে।
হাসান বলে, কবিরা ব্যর্থ, ব্যর্থতা সব সময়ই সুন্দর।
মরিয়ম বলে, আমার কাছে আপনে সুন্দর।
হাসান মরিয়মের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে, ওর মুখে একটা উজ্জ্বল শহর দেখতে পায়, যেখানে জুলছে অজস্র নিদ্ৰাতুর বাতি।
হাসান সালেহ ফরিদউদ্দিনের দিকে এগিয়ে যায়, একটু কাঁপছে সে, সালেহের কান্না আরো বেড়ে গেছে।
হাসান জিজ্ঞেস করে, কাঁদছো কেনো সালেহ?
সালেহ বলে, আমার এই কবিতাগুলো অমর হবে না, এগুলো জীবনানন্দের কবিতার মতো হবে না।
