কবি কামর আবদিন পান করতে করতে বলেন, আআআসুসুসুন হাসান রশিদ সাহেব, আআআপপপনার ককককথাই হহহচ্ছিলো।
আদিম অভদ্র কবিদের মধ্যে এমন দু-একটি ভদ্র উদাহরণ থাকা দরকার।
হাসান হাত নেড়ে সবাইকে সালাম দেয়, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে।
কবি শাহেদ আলতাফের মুখটি বিশাল, ঠোঁট ঝুলন্ত, চুল এলোমেলো, চোখ ঘোলাটে লাল; এর মাঝেই প্রচুর পান ক’রে ফেলেছে বলে মনে হয়, সে ঝিমোচ্ছে একটু পরই হয়তো সিঁড়ির নিচে গড়িয়ে পড়বে, হাসানের দিকে একবার তাকিয়ে বলে, পিয়ো, ইয়াং পোয়েট অ্যান্ড রেবেল, হ্যাঁভ এ গ্লাস।
শাহেদ আলতাফ হাত বাড়িয়ে দেয় হাসানের দিকে; কয়েক সেরা ওজন হবে শাহেদ আলতাফের হাতটি, হাসানের হাতটি ভেঙে যেতে চায়।
শাহেদ বলে, ইয়াং পোয়েট অ্যান্ড রেবেল, হাতটা তো রমণীদের মতো নরম।
হাসান বিব্রত হয়ে হাসে, বলে, কবির হাত।
শাহেদ আলতাফ বলে, পোয়েট, নাই-এ-ডেইজ পোয়েটদের হাত ডাকাতদের হাতের মতো শক্ত হওয়া দরকার, লিরিকেল রোম্যান্টিসিজমের কাল কবে শেষ হয়ে গেছে, এখন কবির হাত দিয়ে নর্দমা ঘাটতে হবে, চৌরাস্তায় গুণ্ডামি করতে হবে, রাবীন্দ্ৰিক চম্পক আঙুলে আর চলবে না; এ পয়েট নাউ-এ-ডেইজ ইজ অ্যান অ্যাকজিকিউশনার।
কবি রাকিব সুলতান এরই মাঝে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে।
রাকিব সুলতান বলে, গিলতে আসতে দেরি করলে আর কবি হওনা হইবো না ভাই, মদের গন্ধ পাইলেই কবিগো কুত্তার মতন ছুইট্টা আসতে হইবো শুয়োরের মতোন ঘোৎঘোৎ করতে করতে আসতে হইবো, মদই হইল কবি গো পানি কবিগো নিশ্বাস, হায়, তাও অই গরিবরা পায় না, গার্মেন্টস্রা পায় খানকির পুতরা পায়, কবিরা পায় না। বইল্যা দিলাম। আপনে ভাই কবি হইতে পারবেন না, যান, গ্যারামে গিয়া চেয়ারম্যানের মোটাগাটা একটা মাইয়ারে বিয়া কইর্যা সুখে ঘরসংসার করেন, পোলাপান পয়দা করেন।
কবি সালেহ ফরিদউদ্দিন একপাশে তার প্রুফগুচ্ছ বিছিয়ে বসেছে, কাবাব আর নান খেয়ে চলছে, ও সব সময়ই ক্ষুধার্তা থাকে, এবং নিজের কবিতাও আবৃত্তি ক’রে চলছে, আর পান ক’রে চলছে।
সে বলে, আসো, দোস্ত, বসো আমার পাশে; তোমারে একটা কবিতা শুনাই।
সালেহ প্রুফগুচ্ছ থেকে একটি কবিতা পড়তে শুরু করে, ওর দেখে পড়তে হয়। না, চােখ বুজেই সে আবৃত্তি করতে থাকে।
ম্যাডাম মরিয়ম ঢোকার সময়ই হাসানকে সালাম ও হাসি জানিয়েছিলো, এবং আরো দুটি তরুণীও তাকে সালাম ও হাসি জানিয়েছিলো; তারা পরিবেশকে খুবই সেনাসুয়্যাল শৈল্পিক ক’রে রেখেছে, পাত্রে পাত্রে ব্ল্যাক লেবেল ঢেলে দিচ্ছে, এগিয়ে দিচ্ছে কাবাব আর নান।
হাসান কবি সালেহ ফরিদউদিনের পাশে বসে।
ম্যাডাম মরিয়ম একটি প্লেটে কাবাব আর নানা নিয়ে তার সামনে হেসে দাঁড়ায়, সে প্লেটটি নেয় ম্যাডাম মরিয়মের হাত থেকে। মরিয়মের একগুচ্ছ আঙুল তার আঙুলের ওপর একপশলা বৃষ্টিধারার মতো ঝরে পড়ে।
অনেক দিন পর তার আঙুলের ফাটা মাটির ওপর শ্রাবণ নামলো।
ম্যাডাম মরিয়ম তার গেলাশে হুইস্কি এবং চােখে বৃষ্টি ঢালতে ঢালতে জিজ্ঞেস করে, পানি না বরফ, কবি?
বিস্মিত হয়ে হাসান তাকায় তার দিকে, এবং হেসে বলে, পানিও নয় বরফও নয়, একটু সবুজ মেঘ একটু সোনালি কুয়াশা এক টুকরো নীল চাঁদ যদি থাকে।
মরিয়ম মধুরভাবে তাকায় হাসানের দিকে।
হাসান বলে, প্রিয়, এখানে আমি একা কবি নাই, একা আমাকে কবি বললে অন্যরা আপনাকে খুন ক’রে ফেলবে। সেনাপতিরাও অবহেলা সহ্য করে, কিন্তু কবিরা করে না, কবিরা নিজেকে ছাড়া আর কাউকে কবি মনে করে না।
মরিয়ম তার গ্লাশে পানি ঢালতে ঢালতে বলে, খুন করুক, আপনারে এই একটু
সবুজ ম্যাঘ দিলাম, কবি।
হাসান মরিয়মের মুখের দিকে তাকিয়ে গেলাশে একবার চুমুক দেয়।
বরফ নেই। সে কাপতে কাঁপতে এক চুমুকে অর্ধেকটাই শেষ করে ফেলে, তার ঝকঝকে গায়ের রঙ ঝিলিক দিয়ে ওঠে, এবং বলে, ইম্মরটালগো লগে পান করতে পাইর্যা আমি নিজেরে ধইন্য বোধ করতেছি।
আলাউদ্দিন সম্ভবত এর আগেই দু-এক গ্লাশ গিয়েছে।
কবি কামর আবদিন খুবই সামাজিক ভদ্র, তিনি জিজ্ঞেস করেন, আলাউদ্দিন সাহেব, ভাভাভাবীকে তো আআআজ দেখছি না।
তাঁর ভদ্রতায় মুগ্ধ হয় হাসান, নিজেকে অভদ্র মনে হয়; আলাউদিনের বাসায় এসে প্রথমেই তো তার উচিত ছিলো ভাবীর সংবাদ নেয়া।
তবে কামর আবদিনের ভদ্রতা ভিন্ন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
আলাউদ্দিন আরেক চুমুকে গোলাশটি শেষ ক’রে ম্যাডাম মরিয়মের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলে, তারে কি দ্যাখনের সাধ এত তারাত্যারিই হইয়া গেলো আপনের আবদিন ভাই? এখনও তা রাইত বেশি হয় নাই, এক গোলাশও শ্যাষ করেন নাই, আরও কয়েক গেলাশ গিলেন, তারপর তারে দেখনের কথা ভাইবেন। রাইত ফুরাই যায় নাই।
খুবই বিব্রত হন ভদ্র কবি কামর আবদিন, তাঁর হাত থেকে গোলাশটি পড়ে যেতে চায়; গোলাশটি ধরতে ধরতে তিনি লাজুকভাবে বলেন, না, না, কিকিকিকিছু মমমনে কককরবেন না, আমি কিছু খারাপ মিন করি নি, আআআমি এএইভাবেই জিজিজিজ্ঞেস কককরেছিলাম। ভাবী খুব সন্ত্রান্ত মহিলা।
আলাউদ্দিন বলে, ওই সব সম্ভ্রান্তফম্ভ্রান্ত মহিলার কথা ভুইল্যা যান, আইজ ম্যাডাম মরিয়ম আছে, লগে আরও দুইজন প্রিন্সেস আছে।
কবি রাকিব সুলতান বলে, অই হারামজাদা আলাউদ্দিন, তুই তা আমার আগেই মাতাল হইয়া যাইতেছছ, আগে আমারে মাতাল হইতে দে, এইটা আমার অধিকার, তারপর তুই মাতলামি করিছ। আসল কথাটা কইয়া দে যে ভাবী দ্যাশে নাই, দিল্লি দাৰ্জিলিং গ্যাছে।
