কিন্তু হয়ে ওঠা কাকে বলে, হাসান? নিজের সাথে কথা বলতে থাকে সে।
জমিরালি তো অনেক আগেই হয়ে উঠেছে, আরো হয়ে উঠবে; তুমি কি জমিরালি হ’তে চাও? হতে চাও ওই সভাপতি, প্রধান অতিথি? এক পাতিল বাসি পচা পুঁটি মাছের সিদলের মতো মঞ্চে মঞ্চে পচা বাসি কথা বলতে চাও তুমি? চাও না? তাহলে তোমার কিছু হবে না। কবিতা লিখে তুমি স্বীকৃতি পাবে? তোমার কবিতা ওরা বুঝবে? তুমি ওদের পেছনে পেছনে না হাঁটলে কখনো ওরা তোমার নাম নেবে? কখনো নেবে না।
আলাউদ্দিন রেহমান ফোন করে, দোস্ত, তোমার অনুষ্ঠানে যাইতে পারি নাই, কিন্তু কাগজে যা পড়লাম তাতে মনে হইতেছে তুমি তুলকালাম কাণ্ড বাধাই দিছো। মনে হইল সুকান্তজয়ন্তী না হইয়া হাসান জয়ন্তী হইয়া গেছে।
হাসান বলে, না, না, হাসানজয়ন্তী নয়, তুমি একটু ভুল করেছে, এর নাম হওয়া উচিত হাসানক্ষয়ন্তী; আমার আর ভবিষ্যৎ নেই।
আলাউদ্দিন রেহমান বলে, কবির আর ভবিষ্যৎ কি, মরার পর অমর হওয়া ছারা। হাসান বলে, তাহলে ওই ঘটনাটি শিগগির ঘটা দরকার।
আলাউদ্দিন রেহমান বলে, দোস্ত, একটা ভাল খবর আছে, তোমার জন্যে, ম্যাডাম মরিয়ম মাঝেমইন্দ্যেই তোমার নাম লয়, বলে তুমি আর আসলা না।
হাসান বলে, কার কথা বলছো, বুঝতে পারছি না তো। আলাউদ্দিন রেহমান বলে, আরো দোস্ত, অই যে একদিন আসছিলা আর তোমারে হুইস্কি ঢাইল্যা খাওয়াইছিলো, সেই ম্যাডাম মরিয়াম; মাঝেমইন্দ্যেই তোমার কথা কয়। মনে হয় দিলে দাগ কাইট্যা গেছো।
হাসান বলে, খুবই চমৎকার মেয়ে ম্যাডাম মরিয়ম, তুমি বেশ ভালোই আছো।
আলাউদ্দিন রেহমান বলে, দোস্ত, ভাল থাকা কি অতই সহজ, মাইয়ালোক লইয়া?এই এরিয়ায় গার্মেন্টস আর প্রিন্সেসে তফাৎ নাই; মাইয়ালোক শুরুতে গোলাপের পাপড়ির মতন পাতলা আর শ্যাষে পাথরের মতন ভারি। দোস্ত, আমি ভাল থাকতে চাই না, মাঝেমইধ্যে আনন্দে থাকতে চাই। আইজ সন্ধ্যায় আমার বাইড়তে আইসো, দোস্ত, একটু খাঅনদাঅনগিলন যাইবো, আনন্দ করন যাইবো।
হাসান বলে, আচ্ছা, অবশ্যই আসবো।
আলাউদ্দিন বলে, আরও দুই চাইরটা কবিরেও বলতেছি, অই দোস্তারা গিলার বেশি চান্স পায় না, কিন্তু গিলতে চায়, অগো গিলাইতে ভালই লাগে, ইম্মরটালগো লগে খাইতে আমার ভালই লাগে, অগো যতই গাইল্লাই অরা কমবেশি ইম্মরটাল এইটা আমি বুঝি। অগো নাম থাকবো, আমার নাম থাকবো না।
হাসান বলে, তুমি গার্মেন্টস, নও তুমি অ্যাড নও, তোমার ভেতর সেই কবিটি এখনো আছে, তুমি আবার কবিতা লেখো। তোমার কবিতা আমি পছন্দ করতাম। তোমার ভেতরেও অমর হওয়ার রোগ আছে, আলাউদ্দিন।
আলাউদ্দিন রহমান বলে, আরো দোস্ত, গার্মেন্টস্, আর পয়েট্রি একলগে যায় না, ট্যাকা বানাইতে চাইলে আর ইম্মরটাল হ’অন যায় না। ইম্মরটাল হইতে হইলে সেক্রিফাইস করতে হয়, পাগল হইতে হয়, আয়নায় নিজেরে দেইখ্যা গুডমৰ্নিং বলার প্রতিভা থাকতে হয়, খানকি ট্যাকারে গুডবাই জানাইতে হয়, আমি পয়েট্রিরে গুডবাই জানাইছি, অই বিউটি আমার লগে শুইবো না, তোমাগো লগেই রাইত কাটাইবো। তয় ট্যাকার শরিলটাও শোঅনের মতন।
অনেক দিন পানটান হয় নি, হাসান একটু তৃষ্ণা বোধ করে, আজ সন্ধ্যায় বেশ পান করা যাবে, রক্তনালি ভ’রে নিতে হবে ব্ল্যাক লেবেলে। সন্ধ্যার বেশ পরে, কখন যাবে কখন যাবে ভাবতে ভাবতে একটু দেরি ক’রে, সে উপস্থিত হয় আলাউদ্দিন রেহমানের লালমাটিয়ার বিশাল বাড়ির তেতলার ফ্ল্যাটে।
হাসানকে দেখে হৈ হৈ ক’রে ওঠে আলাউদ্দিন, শ্যাষম্যাষ কবি হাসান রশিদ আসছেন, বেশি দেরি করেন নাই, ঘণ্টা দুই দেরি করছেন, বইস্যা যাও, দোস্ত, খাও, গিলো।
ঢুকেই হাসান দেখে পাঁচ অমর পান ক’রে চলছেন।
আলাউদিনের কাব্যরুচি গার্মেন্টস ইন্ডেন্টিং অ্যাডে নষ্ট হয় নি–এজনোই ওকে আজো কবি মনে হয়, আলাউদ্দিন বেছে বেছেই গিলতে ডেকেছে হাসানের ভালোই লাগে। মাঝখানের দুটি সোফায় বসে আছেন কবি কামর আবদিন ও কথাশিল্পী করিম আহমেদ; এ-পাশের বড়ো সোফাটিতে বসেছে কবি শাহেদ আলতাফ ও কবি রাকিব সুলতান, ওপাশের আরেকটি বড়ো সোফায় একলা বসে আছে কবি সালেহ ফরিদউদ্দিন।
কথাশিল্পী করিম আহমেদটি সবার বড়ো, দু-খানা বই লিখে সাতখানা পুরস্কার পেয়ে তিনি সব সময় গাল ফুলিয়ে এবং সব কিছুর ওপর নিরন্তর বিরক্ত হয়ে থাকেন, সহজে কাউকে দেখতে পান না, তার চোখ দুটি যে-কাউকে দেখার জন্যে নয়; হাসানের মতো সামান্যতাকে তিনি দেখতে পেয়েছেন বলে মনে হলো না। তিনি পান ক’রে চলছেন, পানিপাত্রে হয়তো তার নায়িকাদের নগ্ন সাঁতার কাটতে দেখছেন, চমৎকারভাবে কাঁপছেন, কারো দিকে তাকাচ্ছেন না, মনে মনে তিনি দস্তয়োভস্কির বা হেমিংওয়ের সাথে হয়তো কথা বলে চলছেন।
কবিদের মাঝে এই গদ্য কেনো? হাসান নিজেকে জিজ্ঞেস করে।
ওহ! কবি কামর আবদিন আবার এঁকে ছাড়া কোথাও যান না, তাঁরা দুজন দুজনকে প্রশংসা ক’রে ক’রে পুরস্কার পাচ্ছেন ও বুড়ো হচ্ছেন।
তাঁরা দেশকে একদিন দুটি অতুলনীয় বুড়ো উপহার দেবেন।
হাসান মনে মনে অনেকক্ষণ ধ’রে হাসে।
কবি কামর আবদিন এখন খুব সাড়া জাগাচ্ছেন, এবং তিনি আপাদমস্তক অকবিসুলভ ভদ্রজন, বুড়ো হ’লে লোকটি হয়তো এতো ভদ্র হবেন যে সব কিছু ঘিনঘিনে ক’রে তুলবেন; তার চুল ঢেউ খেলানো, মুখখানি সুন্দর–এটা তার বড়ো সম্পদ, এটা ভেঙে তিনি খেয়ে যাবেন আরো তিরিশ বছর, এবং তিনি কথা বলার সময় মৃদুমধুর তোতলান, সব সময়ই মধুর কথা বলেন।
