হাসান বলতে থাকে, সুকান্ত বাঙলা ভাষার একমাত্র বিশুদ্ধ মার্ক্সবাদী কবি, তার কবিতা সাম্যবাদী ইশতেহারের কাব্যরূপ। বাঙলার কবিরা সকলের কবি, তাঁরা সাধনা করেন। সকলের কবি হওয়ার, কিন্তু সুকান্ত সকলের কবি হওয়ার দুর্বলতাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন; তিনি সকলের কবি হ’তে চান নি, তিনি হ’তে চেয়েছিলেন একটি শ্রেণীর কবি। সুকান্ত সকলের কবি নন, তিনি একটি শ্রেণীর কবি, তিনি দুর্গত সর্বহারা শ্রেণীর কবি।
হাসান পেছনে উচ্চ ‘না, না, না’ শব্দ শুনতে পায়; তাকিয়ে দেখে সুকান্তের ভাই, প্রধান অতিথি, চিৎকার করছেন, না, না, সুকান্ত ছিলো সকলের কবি। সুকান্ত সকলের কবি, সুকান্ত সকলের কবি।
হাসান বলতে থাকে, সুকান্তের স্পষ্ট পক্ষ ও প্রতিপক্ষ ছিলো; তিনি চাইতেন প্রতিপক্ষকে উৎখাত ক’রে নিজের পক্ষের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে।
হাসান শুনতে পায় পেছনে কে যেনো বলছে, এইটা বলা ঠিক হইতেছে না, সুকান্তকে সকলের কবি বলতেই হবে।
হাসান বলে, সুকান্তের কোনো স্ববিরোধিতা ছিলো না। নজরুলের কথা মনে পড়ছে, নজরুল কয়েক বছর বিদ্রোহী ছিলেন, কিন্তু ছিলেন স্ববিরোধী, কন্ট্রাডিকশনে পরিপূর্ণ, কিন্তু সুকান্তে কোনো কন্ট্রাডিকশন নেই।
পেছনে কে যেনো বলে, নজরুলরে টেনে আনা ঠিক হচ্ছে না, নজরুল সমালোচনার উর্ধ্বে।
হাসান বলে, সুকান্তের একটি পংক্তির সাথেই শুধু আমি দ্বিমত পোষণ করি, আর ওই পংক্তিটি তাঁর দুটি শ্ৰেষ্ঠ পংক্তির একটি; তিনি বলেছিলেন, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়; এটা খুবই স্মরণীয় পংক্তি, কিন্তু কবিতা শাশ্বত, ক্ষুধার রাজ্যেও পৃথিবী কবিতাময়।
সম্মানিত প্রাজ্ঞ আলোচকগণ এর পর আর সুকান্তের কবিতা নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন বোধ করেন না, তারা ঝাল ঝাড়া আলোচনা করেন হাসানকে; তাঁরা সবাই অকপটে নিন্দা জানাতে থাকেন হাসানের বক্তব্যের, তাঁরা বলেন সুকান্ত অবশ্যই সকলের কবি, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী অবশ্যই গদ্যময়; আর তরুণ অর্বাচীন আলোচনা হাসান রশিদ উদ্ধত দুর্বিনীত, সে কবিতা আর সাহিত্য বোঝে না, সে এমন এক পবিত্র সভায় স্থান পাওয়ার অযোগ্য।
শ্ৰোতাদের মধ্যে থেকে দু-তিনজন প্রতিবাদ জানালে আলোচকেরা ভয় পান, তাঁরা সংযত হন; এমনকি সভাপতি হাসানের প্রশংসাও করেন।
হাসান চুপ ক’রে বসে থাকে, মাঝেমাঝে তার মনে হয় লাফিয়ে মাইক্রোফোন কেড়ে সে এসবের প্রতিবাদ করে, আবার মনে মনে সে হেসে ওঠে। সভা শেষ হ’লে আস্তে চুপচাপ নেমে আসে মঞ্চ থেকে, একাডেমির কেউ তার সাথে কথা বলে না। সুকান্তের ভাই তার দিক থেকে ঘেন্নায় মুখ ফিরিয়ে নেন।
কিন্তু মাঠে কয়েকটি তরুণ ও কয়েকটি তরুণ সাংবাদিক তাকে ঘিরে ধরে। এই তাকে প্রথম ঘিরে ধরা, এই প্রথম তার কথা শোনার জন্যে নতুন সময়ের নতুন বিকেলের প্রথম উজ্জ্বল উৎসাহ।
একটি তরুণ বলে, আপনার কথা শুনে আমরা মুগ্ধ হয়েছি, এই নতুন কথা শুনলাম, সুকান্তকে নতুনভাবে বুঝলাম।
আরেক তরুণ বলে, কবিরাও যে গুছিয়ে কথা বলতে পারেন, এই প্রথম দেখলাম। আগেও কয়েকজন কবির বক্তৃতা শুনেছি, তারা আবোলতাবোল বলেন, কিছু পড়েছেন ব’লে মনে হয় না।
হাসান হেসে বলে, তাহলে আমি হয়তো কবি নাই।
একটি তরুণ সাংবাদিক বলে, আমরা আপনার কথাগুলোই রিপোর্ট করবো, বহু দিন এমন বক্তৃতা শুনি নি। মিছে কথা শুনতে শুনতে আমাদের কান প’চে গেছে।
হাসান চঞ্চল হয়ে ওঠে, তার রক্তে কিসের যেনো সুর বাজে। সে গুছিয়ে কথা বলতে পারে তাহলে? নতুন কথা বলতে পারে? সত্য কথা? কবি হয়েও পারে কথা বলতে? কিন্তু সে কি কবি? কোথায় তাৱ কবিতার বই?
এক বুড়ো এগিয়ে আসেন তার দিকে।
বুড়ো বলেন, আপনার কথা শুনে মুগ্ধ হয়েছি, বুড়ো বয়সে সভায় আসি সময় কাটানোর জন্যে, পচা পচা কথা শুনি মিথ্যে কথা শুনি, মনে হয় আমার সময় প্ৰভু কবে কাটাবেন; আজি সুখ পেলাম যে নতুন সত্য কথা বলার লোকও জন্ম নিচ্ছে আমাদের এই মিথ্যেবাদী সমাজে।
হাসান বলে, আপনাকে ধন্যবাদ, কিন্তু দেখলেন তো সবাই আমাকে কেমন বকাবকি করলেন; দেখলেন তো সাহিত্য সমালোচনাও এখানে রাজনীতি।
বুড়ো বলেন, ওরা মিথ্যে বলেন ব’লেই মঞ্চে জায়গা পান। আপনার জন্যে আমার ভয় হচ্ছে, এমন সত্য কথা বলতে থাকলে ভবিষ্যতে আপনি মঞ্চে স্থান পাবেন না, সমাজেও হয়তো স্থান পাবেন না।
আমি শূদ্র হয়েই থাকবো, সমাজের বাইরে নর্দমার পাশের বস্তিতে থাকবো, আমার দিকে তাকাতে সমাজ ঘেন্না বোধ করবে।
সমাজ, হায় রে সমাজ, হায় রে সুন্দর ভাগাড়।
কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ – ০৭
পরদিন ভোরে কয়েকটি বাঙলা দৈনিক দেখে শিউরে ওঠে হাসান। তার কথা দিয়েই সংবাদের শিরোনাম করা হয়েছে, আর তার বক্তৃতারই রয়েছে বিশদ বিবরণ; সভাপতি, প্রধান অতিথির শুধু নাম রয়েছে। হায়, সভাপতি, হায়, প্রধান অতিথি। একটিতে তার ছবিও ছাপা হয়েছে, কিন্তু ছবিটা হাসানের পছন্দ হচ্ছে না, পাশ থেকে ছবিটা না তুলে কি মুখোমুখি তোলা যেতো না? হাসান পত্রিকাগুলোর সংবাদ বারবার পড়ে। এই কথাগুলোই কি সে বলেছে? মনে পড়ে সে বলেছে, তবে অনেক বাক্য ঠিক তার নয়, সাংবাদিকেরা নিজেদের মতো ক’রে লিখেছে। সে কি এমন বাসি বাক্য বলে?
তাহলে আমিও শিরোনামযোগ্য? সংবাদযোগ্য? হো হো ক’রে মনে মনে হাসে সে। আমিও তাহলে হয়ে উঠছি?
