কিন্তু জমিরালি দমার পাত্র নয়, সে তার মর্যাদা রক্ষা ক’রে ছাড়বে।
সে আবার হেসে বলে, তুমি হাসান রশিদ না?
হাসান কোনো উত্তর না দিয়ে একটি পায়ের ওপর আরেক পা দিয়ে বসে, এবং পকেট থেকে বের ক’রে একটি সিগারেট ধরায়।
জমিরালি আবার হেসে হেসে বলে, আমার কি ভুল হচ্ছে, আমার কি ভুল হচ্ছে, তুমি হাসান রশিদ না?
হাসান ধুঁয়ো ছাড়তে ছাড়তে বলে, হু, আমি হাসান রশিদ, আর আপনি?
কেঁপে ওঠে জমিরালি, তুমি আমাকে চিনতে পারলে না, তুমি আমাকে চিনতে পারলে না? আমি তোমার শিক্ষক।
হাসান বলে, না, চিনতে পারলাম না। শিক্ষক? ইস্কুলের পর আমার আর কোনো শিক্ষক নেই।
জমিরালি টলতে টলতে অন্য দিকে পা বাড়ায়, মাটিতে প’ড়ে যাবে মনে হয়, তবে দু-তিনটি সালাম পেয়ে আবার সুস্থ বোধ ক’রে ঠিক মতো দাঁড়ায়।
মঞ্চে ছটি চেয়ার; এক সময় অনুরোধ করা হয় সভাপতি, প্রধান অতিথি, প্রাবন্ধিক, ও তিনজন আলোচককে মঞ্চে উঠতে। হাসান, সবচেয়ে তরুণ, সবার শেষে মঞ্চে উঠে। উত্তরতম চেয়ারটিতে বসে। জমিরালি সভাপতি আর প্রধান অতিথির সাথে প্রচুর কথা বলতে চেষ্টা করছে; সে সম্ভবত পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে নি, প্ৰবন্ধ পড়ার আগে সুস্থ হয়ে উঠতে চাচ্ছে, কিন্তু সুস্থ হয়ে উঠতে পারছে না। হয়তো সারাজীবনেও সে আর সুস্থ হবে না, অসুস্থতাটা থেকে যাবে, অন্তত হাসানের কথা মনে পড়লে; কিন্তু হাসান কয়েক বছর পর আজই চমৎকার সুস্থ বোধ করছে, তার মাংস প্রসন্নতা বোধ করছে।
হ্যাঁ, জমিরালি জমিরালির মতোই প্ৰবন্ধ লিখেছে, জমিরালির মতোই পড়ছে।
সময় কাটানোর জন্যে হাসান গুণে দেখতে চেষ্টা করছিলো জমিরালির প্রবন্ধে কটি উদ্ধৃতি আছে, পঁচিশটা গোণার পর ক্লান্ত হয়ে সে দূরের আমগাছের ডালে কয়েকটি ব্যস্ত কাকের কয়েকটি চঞ্চল শালিখের সৌন্দর্য দেখতে থাকে–দেখে মুগ্ধ হয়, চোখ ফিরিয়ে সামনের সারিতে বসা এক প্রচণ্ড উদ্ভিন্ন উল্লসিত চল্লিশোত্তরার দর্শনীয় সম্মুখভাগের পর্বতমালার উচ্চতা, ভর ও ওজন পরিমাপ করতে থাকে, অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে তার বক্ষবন্ধনির রঙ, বিবর্ণিতা, ও আকার নির্ণয় করতে থাকে। জমিরালির প্রবন্ধের থেকে এগুলো অনেক বেশি মননশীল, অনেক বেশি সৃষ্টিশীল; অনেক বেশি মনোযোগ দাবি করে। জমিরালি প্ৰবন্ধ পড়তে থাকে, প্রাবন্ধিক না হয়ে সে ধারাবর্ণনাকারী ও আবৃত্তিকার হ’লেই ভালো হতো; হাসানের মাথার ভেতর দিয়ে তখন ছুটে চলছে কয়েকটি কাক শালিখ, আর রানার, আঠারো বছরের দুঃসহ বয়স, বিদ্রোহ আজ বিপ্লব চারিদিকে, হিমালয় থেকে সুন্দর বন হঠাৎ বাংলাদেশ, সিগারেট, পূর্ণিমা চাঁদ যেনাে ঝলসানাে রুটি, এবং ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। ঝলসে ওঠে হাসান, আসলেই ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়? একটি গরম তাওয়া থেকে উঠে একটা তাপের প্রবাহ বয়ে যায়। তার চামড়ার নিচ দিয়ে।
জমিরালির শেষ হ’লে প্রথমে আলোচনা করার জন্যে ডাকা হয়। হাসানকে।
সে তরুণতম, সবচেয়ে নির্জ্ঞান, তাই শুরু হয় তাকে দিয়েই, এটাই সূত্র; প্রাজ্ঞ মহাজ্ঞানী মহাজনেরা, যাঁরা পাঁচশো পঁচিশ বছর ধ’রে কবিতা পড়েন না, যাদের কাছে কবিতা হচ্ছে ‘চিরসুখী জন ভ্ৰমে কি কখন’, বড়োজের ‘অন্ন চাই, প্ৰাণ চাই, আলো চাই চাই মুক্ত বায়ু’, তাঁরা পরে আলোচনা করবেন, বাণী দেবেন; বৈদিক শাশ্বত শ্লোক যতো পরে উচ্চারিত হয় ততো বেশি প্রাজ্ঞ শাশ্বত শোনায়।
হাসান কাঁপতে কাঁপতে কোনোদিকে না তাকিয়ে মাইক্রোফোনে গিয়ে সরাসরি আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছিলো, হঠাৎ তার মনে পড়ে যে সভাপতি, প্রধান অতিথি প্রমুখ বা ইত্যাদিকে স্মরণ ক’রে দু-চারটি বিশেষণ ব্যবহার করা বিধেয়, তাই সে তাদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে একটি দীর্ঘ বাক্য বলে–বাক্যটি ভেঙে পড়তে পড়তে শুদ্ধ হয়ে ওঠে, যদিও প্রত্যেককে তার মনে হচ্ছিলো স্তূপস্তূপ সম্মানিত পেটমােটা শূন্যগর্ভতা, অসার অপার অপদার্থতা; এবং সে আলোচনা শুরু করে।
হাসান বলে, অধ্যাপক জমিরালি সাহেবকে অশেষ ধন্যবাদ তাঁর ৬১টি উদ্ধৃতির জন্যে; তবে প্রবন্ধটি শোনার সময় তার মনে হচ্ছিলো এটা কোনো মেধাবী স্নাতক শিক্ষার্থীর লেখা, এতে সুকান্তের কবিতার বিষয়, ছন্দ, অলঙ্কার সবই উদাহরণসহ আলোচিত হয়েছে, তাঁর প্রবন্ধ শুনে সুকান্তের কবিতার আবৃত্তি শোনার সুখ পাওয়া গেছে, শুধু সুকান্তের কবিতার মর্ম বোঝা যায় নি। তবে জমিরালি সাহেবকে ধন্যবাদ উদ্ধৃতিগুলোর জন্যে, যদিও ভুল রয়েছে কয়েকটি উদ্ধৃতিতে।
হাসান অনুভব করে শ্রোতাদের মধ্যে বিকট অদ্ভুত উল্লাস আর মঞ্চে অতল অশরীরী আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।
ঘোষক এসে তার হাতে এক টুকরো কাগজ দেয়, তাতে লেখা ‘শ্ৰদ্ধা ও বিনয়ের সাথে আলোচনা করুন; আলোচনা সংক্ষিপ্ত করুন।’
হাসান কিছুক্ষণ ধ’রে কাগজটি পড়ে, তার ইচ্ছে হয়। আর আলোচনা না ক’রে মঞ্চ থেকে নেমে বটগাছের ছায়া পেরিয়ে বিক্রমপুর পার্বতীপুর সাগাইয়া কিশোরগঞ্জের ধানক্ষেতে গিয়ে চাষবাস করতে, পুকুরে পলো বা ঝাঁকিজাল দিয়ে মাছ ধরতে, বাড়ৈখালির বাজারে গিয়ে দোকানে ব’সে ঘোলাটে চা খেতে।
শ্রোতাদের মধ্যে একজন চিৎকার করে ওঠে, আপনে বলেন, হাসান রশিদ সাব, আপনে ঠিক কথাই বলতেছেন, আপনে বলেন, আমরা শোনতে চাই।
