পাতার আড়াল হতে বিকালের আলোটুকু এসে আরো কিছুখন ধ’রে ঝালুক তোমার কালো কেশে।
কবিতা, মানসী, তুই প্রাসাদের উপাসক, জানি। কিন্তু বল, যখন প্রদোষকালে, হিমেল বাতাসে, নির্বোদে, নীহারপুঞ্জে জানুয়ারি কালো হয়ে আসে–নীলাভ চরণে তোর তাপ দিবি, আছে তো জ্বালানি?
আনরিয়েল সিটি, আন্ডার দি ব্ৰাউন ফগ অফ এ উইন্টার ডন, এ ক্রাউড ফ্লোউড ওভার লন্ডন ব্রিজ, সো মেনি, আই হ্যাড নট থট ডেথ হ্যাড অন ডান সো মেনি।
সারারাত চিতাবাঘিনীর হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে নক্ষত্রহীন, মেহগনির মতো অন্ধকারে সুন্দরীর বন থেকে অর্জুনের বনে ঘুরে ঘুরে সুন্দর বাদামী হরিণ এই ভোরের জন্যে অপেক্ষা করছিল।
থিংজ ফল অ্যাপার্ট; দি সেন্টার ক্যানট হৌল্ড; মেয়ার অ্যানার্কি ইজ লুজ্ড্ আপন দি ওয়ার্ল্ড’ দি বেস্ট ল্যাক অল কনভিকশন, হোয়াইল দি ওয়স্ট আর ফুল অফ প্যাশোনেট ইন্টেনসিটি।
একটি কথার দ্বিধাথরথর চূড়ে ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী; একটি নিমেষ দাঁড়াল সরণী জুড়ে, থামিল কালের চিরাচঞ্চল গতি।
আই হ্যাভ সাং উইমেন ইন থ্রি সিটিজ ৷ বাট ইট ইজ অল ওয়ান। আই উইল সিং অফ দি সান।
অ্যামং টুয়েন্টি স্নোয়ি মাউন্টেন্স দি অনলি মুভিং থিং ওয়াজ দি আই অফ দি ব্ল্যাকবার্ড।
তুমি ভ’রে তুলবে, তাই শূন্যতা। তুমি আসবে উষ্ণতা, তাই শীত।
আই হ্যাভ মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ।
এই সব অবিস্মরণীয় জলের মতো ঘুরে ঘুরে বুকের ভেতর কথা বলা পংক্তির ভেতর থেকে আবার জেগে ওঠে নিজের পংক্তিমালা, এগুলোর পাশে তারগুলোকে কি খুব করুণ গরিব দেখাচ্ছে? নিজের পংক্তিমালার উদ্দেশে সে বলতে থাকে :
আমার করুণ গরিব বিপন্ন রুগ্ন পংক্তিমালা
তোমরা জেগেছো তোমরা জন্মেছো আমার ভেতর থেকে
আমি সামান্য, তোমাদের আমি অমরত্ব দিতে পারি নি
ক’রে তুলতে পারি নি অবিস্মরণীয়
তোমরা হয়তো কবিতাও হয়ে ওঠে নি
তোমরা হয়তো কারো হৃদয়েই ঢুকতে পারবে না
ঢুকতে পারবে না। কারো রক্তে
কিন্তু তোমরা নতুন তোমরা এই ভয়ঙ্কর সময়ের
তাই তোমরা হতে পারো কাব্যগ্রন্থ।
তোমরা সূচনা, একদিন দেখা দেবে তারা
যারা বেঁচে থাকবে, হবে অবিস্মরণীয়।
কয়েক দিনের মধ্যে দুটি ঘটনা ঘটে যায়; হাসান দেখে তার ভেতর একটি অন্য হাসান জ্বলছিলো। সে-আগুন হঠাৎ বের হয়ে ঝলসে দেয় প্রথাগত ভাবনার মুখমণ্ডল। নিজের এ-রূপ দেখে সে বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়, আর অন্যরা তাকে ভয় পেতে থাকে, যদিও সে মনে করে সে ভীতিকর নয় একটুও।
গাড়লদের একটি ভাঙাচোরা দুর্গ আছে, ওই পদ্মলোচনের নাম অ্যাকাডেমি; কিন্তু ওটা একটা গোশালা একটা ছাগশালা।
সেখানে পালিত হবে সুকান্তজয়ন্তী;–দেশটি স্বাধীন হওয়ার পর গরু গাধা মোষ খচ্চর সিংহ সবাই সমাজতান্ত্রিক হয়ে উঠছে; ওই দুর্গের একজনের সাথে একদিন দেখা হয়ে যায় হাসানের, যে পছন্দ করে হাসানকে। হাসান ওই অনুষ্ঠানে স্থান পায় আলোচক হিশেবে। একরাশ বাজেকথা, ভজভজে বাজেকথা, হবে বটগাছের নিচে, হাসান জানে, যেমন হয়ে আসছে। বছরের পর বছর; কোনো পদস্থ মুর্খ সুকান্তের কবিতা থেকে একশো চল্লিশটা উদ্ধৃতি দিয়ে একটা চল্লিশ মিনিটের প্রবন্ধ পড়বে, তারপর আলোচকেরা প্রবন্ধের কথা ভুলে বিশ্বজগত ভুলে অনর্গল আবোলতাবোল বকবে প্যাচাল পাড়বে। বড়ো গৌরবের কথা, সে আলোচক হয়ে উঠছে। এবার একটি বিশেষ আকর্ষণও আছে, কলকাতা থেকে প্রধান অতিথি হয়ে আসছেন সুকান্তের ভাই। ভেতরে একটা কাঁপনও লাগে, সে মঞ্চে কথা বলতে পারবে তো, পা কেঁপে উঠবে না তো, গলা শুকিয়ে যাবে না তো, চোখে অন্ধকার দেখবে না তো? সে যখন জানতে পারে প্রবন্ধ পড়বে অধ্যাপক জমিরালি পিউবিক হ্যায়ার ড্রেসার, সে হো হো ক’রে ভেতরে ভেতরে হাসে, সুকান্তের সমস্ত কবিতাই হয়তো জমিরালি সাহেব উদ্ধৃত করবে প্রবন্ধে। সে আলোচনা করবে জমিরালির প্রবন্ধ? একবার ইচ্ছে হয় গিয়ে ব’লে আসে সে আলোচনায় অংশ নিতে পারবে না, জমিরালির প্রবন্ধে আলোচনার যোগ্য কিছু থাকবে। না। জমিরালির মুখোমুখি হ’তে হবে তাকে? বিশ্ববিদ্যালয়ে জমিরালি তার শিক্ষক ছিলো, কিন্তু জমিরালির কাছে থেকে সে কিছু শেখে নি, যেমন কিছুই শেখে নি কদম আলি মনু মিয়া তোরাব উদ্দিন সোরাব চাকলাদারের কাছে; এবং সে তো জমিরালি ও অনেককেই ঘৃণা করে। জীবনে কখনাে তাদের মুখ যে সে দেখতে চায় না। জমিরালি যে তার শিক্ষক ছিলো এটাও সে আর স্বীকার করতে চায় না বা স্বীকার করলে সব কিছু নিরর্থক হয়ে ওঠে। শিক্ষক শিক্ষক শিক্ষক, কাকে বলে শিক্ষক? সে নিজেকে বলে, এটা এক আকস্মিক দুর্ঘটনা কে কখন কোথায় কোন অবস্থায় থাকে, ক্লাশকক্ষে কে শিক্ষক হিশেবে ঢোকে কে ঢোকে ছাত্র হিশেবে।
অনুষ্ঠানের বিকেলে হাসান গিয়ে দেখে লোকজন আসতে শুরু করেছে।
বটগাছের সামনে সারিসারি চেয়ার পাতা, সে একজন আলোচক ব’লে বেশ বিনয়ের সাথে এক কর্মকর্তা তাকে সামনের সারির একটি চেয়ারে বসান। খুবই বিব্রত বোধ করে হাসান। সে আলোচক? তার কাছে হাস্যকর মনে হয় এটা। ইচ্ছে করে বেরিয়ে যেতে। কিন্তু সে চুপচাপ বসে থাকে, এমন সময় অধ্যাপক জমিরালি বেশ হাসিখুশি মুখে তাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়। জমিরালি মনে করেছিলো হাসান উঠে তাকে সালাম দেবে, কিন্তু হাসান সে-সব কিছুই করে না। জমিরালির হাসিটা কালো হয়ে ওঠে। তার কালো হাসিটা দেখে বেশ সুখ পায় হাসান।
